“বুড়া মিয়া, শান্ত হও, তোমার বসন্তের দাগঅলা স্ত্রী আর মেয়ের চেয়ে ঐ ছাগলটা অনেক বেশি যৌনাবেদনময়,” আরেক লোক ফোড়ন কাটে।
নিজের বিবি-বেটীদের আব্রু রক্ষায়, পেঁয়াজ বিক্রেতা ক্রুদ্ধ কণ্ঠে সাফাই দিতে শুরু করতে বাবর আলগোছে সেই চত্বর থেকে সরে আসে এবং একটা গলি ধরে হাঁটতে শুরু করে। সব জায়গাতেই একই দৃশ্য। চোখে মুখে অনাহারের নির্মম ছাপ পড়া, ক্ষুধার্ত মানুষের দল ছায়ামূর্তির মত ধীরপায়ে হেঁটে চলেছে, যেন তাদের দেহের শেষ বিন্দু জীবনীশক্তি নিংড়ে নেয়া হয়েছে। সে দাঁতহীন মাড়ি দেখিয়ে এক বৃদ্ধাকে হাসতে দেখে, যে শিশুর মত মমতায় একটা মৃত বিড়ালের নির্জীব দেহ কোলে করে রেখেছে। ইঁদারার ধারে গতরাতে ঘুমন্ত কুকুরগুলো যে এতদিন বেঁচে রয়েছে সেটা ভেবে সে বেশ অবাক হয়।
ম্লান কমলা রঙের উদীয়মান সূর্যের কাক্ষিত দৃশ্যপট- যা তাকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করবে। বাবর জানে যে সূর্যের দিকে পিঠ করে হাঁটলে তৈমূরের সুরক্ষিত আস্তানার দেয়ালের কাছে তার পৌঁছে যাওয়া উচিত। আপাতভাবে মনে হয় তার ধারণাই ঠিক। সে দ্রুত এগিয়ে যেতে শুরু করে, খেয়াল করে রাস্তাগুলো ক্রমশ চওড়া হয়ে উঠেছে আর দুপাশের ভবনগুলো এখন অনেক বেশি অভিজাত দর্শন। সে সুদৃশ্য ফুল লতাপাতা আর জ্যামিতিক নকশার প্রাণবন্ত টাইলসে সজ্জিত হাম্মামখানা, গম্বুজযুক্ত মসজিদ আর অপরূপ সুন্দরভাবে তৈরি করা মাদ্রাসা দেখতে পায়, যেখানে বিদ্যার্থীর দল নামাজ আদায় করে আর অধ্যয়ন করে।
তার পূর্বপুরুষেরা এত সুন্দর একটা শহর তৈরি করেছে এমন বালকসুলভ একটা গর্ববোধ তার ভিতরে জন্ম নেয়। সে যখন সমরকন্দের সুলতান হবে, শহরের আশেপাশের বাগান আর ক্ষেত থেকে সজি এবং ফল এসে আবার বাজার বোঝাই করে ফেলবে। রুটিঘর আর রন্ধনশালা- যা এখন শূন্য আর পরিত্যক্ত থেকে আবারও বাতাসে সুবাস ছড়াবে। সমৃদ্ধশালী আর সুখী নাগরিকের দল, তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠবে। এবং, তৈমূরের সময়ের মত, প্রতিভাবান মানুষের দল- কবি, চিত্রকর, পণ্ডিত- সভ্য দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে এখানে এসে মিলিত হবে। পুরো বিষয়টার তাৎপর্য অনুধাবন করতে পেরে, বাবর চোখ বন্ধ করে ফেলে। “বাছা, আমাদের পথ থেকে সরে দাঁড়াও।”
বাবরের পিঠের নাজুক অংশে শক্ত কিছু একটা আঘাত করে। সহজাত প্রবৃত্তির বশে, সে কোমরে অস্ত্রের জন্য হাত দিয়ে দেখে সেখানে কিছু নেই। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে, সমরকন্দের রাজকীয় পান্না সবুজ রঙের পরিকর পরিহিত দুজন সৈন্য। তাদের যাবার মত পাশে যথেষ্ট জায়গা রয়েছে কিন্তু তারপরেও তাদের একজন তার হাতের বল্লমের বাঁট দিয়ে বাবরকে আবার আঘাত করে, এবার পাঁজরে খোঁচাটা লাগে এবং সে ঘুরতে ঘুরতে দেয়ালে গিয়ে আঘাত করে। সেঁতো হাসি দিয়ে, লোক দুটো সদম্ভে সামনে এগিয়ে যায়।
বাবর, মার্জারের-মত অপলক দৃষ্টিতে পেছন থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু তারা পেছনে ফিরেও তাকায় না। সৈন্য দু’জন বাঁক ঘুরতে সে তাদের পিছু নেয়। তারা যেদিকে এগিয়ে চলেছে, তাতে সে নিশ্চিত দু’জন কোক সরাইয়ের দিকেই যাচ্ছে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে, অনুসরণ শুরু করতে সে আরো বেশি সৈন্যের দেখা পেতে থাকে, তাদের কেউ কেউ শহরের সুনসান, আতঙ্কিত নগরের রাস্তায় টহল দিচ্ছে, কেউবা শহর রক্ষাকারী প্রাচীর থেকে ফিরে আসা প্রতিহারী, সেনা। পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে, কেউ এগিয়ে আসছে বুঝতে পারলে সে। জঞ্জালের আড়ালে কিংবা চৌকাঠের পেছনে লুকিয়ে পড়ে চেষ্টা করে তাদের চোখে আড়ালে থাকতে।
আর তারপরে, একটা সময়ে সে উপরের দিকে তাকালে তৈমূরের দেয়াল পরিবেষ্টিত আস্তানা দেখতে পায় এবং এর ঠিক কেন্দ্রে তৈমূরের সুউচ্চ দূর্গপ্রাসাদ, অতিকায় কোক সরাই। দূর্গের প্রাকার-বেষ্টিত চিহ্নিত স্থান থেকে সবুজ রেশমের নিশান বাতাসে পতপত করে উড়ছে। বাবর ভাবে, ওটা আমার প্রাসাদ। অবচেতন মনে সে তৈমূরের আংটিটা স্পর্শ করে এবং সেটা মুঠোর ভিতরে আঁকড়ে ধরে।
পাথর দিয়ে বাঁধান পথে সৈন্যদের কুচকাওয়াজের শব্দে তার দিবা স্বপ্নের চটকা ভাঙে। একটা দল আস্তানায় ফিরে আসছে। তাদের অনেক পেছনে থেকে বাবর তীক্ষ্ণ চোখে সৈন্যদলটা আর তাদের অস্ত্রশস্ত্র খুঁটিয়ে দেখে। দীর্ঘকায়, মজবুত শরীরের মানুষ, তাদের অবয়বে অপুষ্টির বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। আর প্রত্যেকের হাবেভাবে যোদ্ধার অভিব্যক্তি: এদের পরণেও সমরকন্দের উজ্জ্বল সবুজ পরিকর। জোর করে জুড়ে বসা উজির তাদের আনুগত্যের জন্য কত মোহর দিয়েছেন?
সহসা পেছন থেকে কেউ একজন তার কাঁধে হাত দেয় এবং আতঙ্কিত বাবর, সব কিছু অগ্রাহ্য করে দৌড় দেবার জন্য প্রস্তুত হয়, কিন্তু হাতটা ইস্পাতের মত কঠিন। অসহায় বাবর ঘুরে দাঁড়ায় তার আক্রমণকারীর মুখোমুখি হতে।
“শুভেচ্ছা নেবেন। আমি আশা করিনি এত শীঘ্রই আপনাকে সমরকন্দে দেখবো। অবরোধ এখনও শেষ হয়নি।”
বাবর ঢোক গিলে। “বাইসিনগার!” তৈমূরের রক্ত রঞ্জিত আংটি ফারগানায় কাছে পৌঁছে দেবার সময়েই তার সাথে বাবরের শেষ দেখা হয়েছিলো।
“আপনি অনর্থক ঝুঁকি নিয়েছেন। গত ত্রিশ মিনিট ধরে আমি আপনাকে অনুসরণ করছি।”
