হাতের উল্টোপিঠ সে তার কপালের ঘাম মোছে এবং দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে নিজেকে যতটা সম্ভব অন্ধকারে মিশিয়ে দিতে চেষ্টা করে যেন দূরবর্তী প্রান্তে ধনুকে তীরে জুড়ে তৈরি থাকা সতর্ক প্রহরী তাকে সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে না পারে। কিন্তু সামনে কেবল নিরবতা বিরাজ করছে। পুরো শহর এখন বোধহয় ঘুমে বিভোর। সে তার বিবর্ণ মাটির দাগ লাগা পোষাক আর হাত সুড়ঙ্গের ভিতরের আলোতে কোনমতে দেখতে পায়। তাকে তৈমূরের বংশের রাজপুত্র বলে কেউ চিনতে পারবে সে ভয় এখন আর নেই। শহরের ভিতরে সে অনায়াসে ভীড়ের মাঝে মিশে যেতে পারবে, গতকালের বাসি রুটির সন্ধানে আরেকজন হতভাগ্য কিশোর এসেছে।
সুড়ঙ্গটা এসে দূষিত পানিতে পূর্ন একটা বৃত্তাকার গর্তে এসে শেষ হয়েছে, বাবর ভাবে, সম্ভবত কোনো অব্যবহৃত ইঁদারার খাড়া ফাঁকা স্থান। উঁকি দিয়ে সে রাতের তারকাখচিত আকাশের চাঁদোয়া দেখতে পায়। নিরবে সন্তর্পনে সে খাঁড়া দেয়ালে গাঁথা ধাতব কীলক বেয়ে উপরে উঠতে আরম্ভ করে। এমন সুড়ঙ্গ এই শহরে আর কতগুলো আছে? কোনো সন্দেহ নেই শত্রুরা তার প্রতিটা পরিকল্পনা সম্পর্কে আগেই অবহিত হয়েছে। তার ছাউনি দূষিত করতে দলে দলে গুপ্তচরের দল ইঁদুরের মত হাজির হয়ে তার গোপন তথ্য জেনে নিয়ে ঘরে ফিরে এসেছে। কিন্তু এখন, বাবর ভাবে, ইঁদুর হবার পালা এবার আমার।
দেয়ালের উপরে পাথরের গোলাকার রক্ষামূলক বেষ্টনীর উপর দিয়ে বাবর নিজেকে টেনে তুলে এবং ছায়ার ভিতরে আলতো করে নেমে আসে। চাঁদের আলোতে বাবর দেখে সে একটা আঙ্গিনার মত জায়গায় উপস্থিত হয়েছে যেখানে কেবল দুটো হাড্ডিসার নেড়ী কুত্তা ঘুমিয়ে রয়েছে। বাবর তাদের পাঁজরের হাড় ছন্দোবদ্ধ ভঙ্গিতে উঠানামা করতে দেখে এবং তাদের মৃদু কেঁউ কেউ স্বরে ফোঁপানি শুনতে পায়। পরাক্রমশালী সমরকন্দে তৈমূরের উত্তরাধিকারীর আগমনের কি অনবদ্য তরীকা কেবল নেড়ী কুকুরের সহচর্যে গায়ের গন্ধে ভূত পালাবে আর করণে ছেঁড়া ফাটা কাপড়।
এখন প্রশ্ন হল সে ঠিক কোথায় আছে? বাবর জানতে পারলে বর্তে যেত। এখন সে কেবল লোকজন উঠে চলাচল শুরু করা পর্যন্ত লুকিয়ে থাকতে পারে। লোকের আড়াল তার প্রয়োজন। শীতে কাঁপতে কাঁপতে সে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে রাখা একটা কাপড়ের স্তূপ খুঁজে পায়। এতেই কাজ চলবে। সে কাপড়ের নিচে আলতো করে ঢুকে আসে এবং সে মাথার উপরে টেনে দিয়ে নিজেকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে। সে ভাবে, সমরকন্দ। সমরকন্দ! তারপরে কিছু বুঝে উঠবার আগেই ঘুম জোয়ারের মত দুচোখ ছাপিয়ে এসে তার ক্লান্ত শরীরের দখল বুঝে নেয়।
“এটা আমার জায়গা! তোমার পঁচা গাজর নিয়ে অন্য কোথাও যাও।”
বাবর ঘুম ভেঙে চমকে উঠে এবং কাপড়ের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়। কয়েক ঘণ্টা আগে যে জায়গাটা জনমাবনহীন ছিল এখন লোকজনে গমগম করছে। ভোরের আবছা আলোতে, তার মনে হয় লোকগুলো একটা বাজার বসাতে চাইছে। যার কণ্ঠস্বরে তার ঘুম ভেঙেছে সে তাকিয়ে কালো, ধূলি ধূসরিত আলখাল্লা পরিহিত এক লম্বা, শীর্ণকায় বৃদ্ধলোকের। নিজের পছন্দসই স্থানের দখল বুঝে নিয়ে, সে আসনপিড়ি হয়ে বসে এবং জোব্বার পকেট থেকে কয়েকটা ছাতা-পড়া পেঁয়াজ বের করে।
সতর্কতার সাথে, বাবর তার লুকানর স্থান থেকে বের হয়ে আসে। রুক্ষ দর্শন, ছিন্ন বস্ত্র পরিহিত লোকের দল ততোধিক কুঞ্চিত আনাজপাতির সামান্য পরিমাণ কাপড়ের উপরে সাজিয়ে রাখছে- গাজর রঙ বিগড়ে গিয়েছে এবং অঙ্কুরিত হয়েছে আর কুচকে যাওয়া মুলা। আরেক বৃদ্ধা যার কুঞ্চিত মুখ থেকে নেকাব খসে পড়েছে। বেপড়োয়া অনটনে, সমাধিস্থ করার জন্য যেভাবে মৃতদেহ পবিত্র করা হয় ঠিক একই যত্নে একটা মৃত ইঁদুর সাজিয়ে রাখছে। অন্যেরা, বোঝাই যায় যাদের কাছে বিক্রি করার মত কিছু নেই আর কেনার সামর্থ্যের প্রশ্নই উঠে না, তারা চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে ক্ষুধার্ত চোখে তাকিয়ে রয়েছে।
বাবর বিস্মিত হয়ে ভাবে, এই লোকগুলো উপবাস করছে। অবরোধ অনেক মাস হল বজায় আছে এবং সে আশা করেনি যে রসদের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, কিন্তু তাই বলে…এক শিশুর কান্নায় তার চিন্তার জাল ছিঁড়ে যায়। এক তরুণী মাতা যার স্তনের দুগ্ধধারা শুকিয়ে গেছে এবং যার চোখের তারা ভর করেছে অসহায়তা। নেকাবের একটা কোণা পানিতে ভিজিয়ে নিয়ে সেটাই নিজের সন্তানের বুভুক্ষ ঠোঁটে গুঁজে দেয়।
“নিজেদের ঘাঁটিতে ব্যাটারা ভালই আছে,” বৃদ্ধলোকটা বলে, তারপরে এমন ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে থুতু ফেলে যে আরেকটু হলে কফের দলা তার নিজের সাতটা পেঁয়াজের স্তূপে গিয়ে পড়ত। “তারা আমাদের কাছ থেকে সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। তারা বছরের পর বছর টিকে থাকতে পারবে, রেশমের আলখাল্লার নিচের ভূড়ি আমাদের খাবার দিয়ে পূর্ণ করবে। ন্যায়বিচার বলে কি কিছু নেই?”
“বুড়া মিয়া, চুপ করো, মুখে লাগাম দাও, তোমার কারণে আমরা সবাই বিপদে পড়বো। শীতকাল আসলে গতবারের মত এবারও আক্রমণকারীরা দেশে ফিরে যাবে।”
“আর তারপরে কি ঘোড়ার ডিম হবে? কৃতজ্ঞতায় উজিরকে আরো বেশি করে তখন খাজনা দিতে হবে! বেশ্যার বেটার বড্ড বাড় বেড়েছে! আর সবাই বলছে আমাদের বিবি, বেটীদের সে নাকি ভীষণ পছন্দ করে। মরহুম সুলতান, আল্লাহ তাকে বেহেশত নসীব করুন, তার চেয়েও নাকি দ্বিগুণ বড় আমাদের উজিরের হারেম। আমি শুনেছি একরাতে সে তিনজন নারীর সাথে সহবাস করে।”
