কিছুক্ষণ পরে, একটা বাচ্চা শেয়াল তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। বাবরের গায়ের গন্ধ সে ঠিকই টের পায়, কিন্তু সেটা অগ্রাহ্য করে সামনে এগিয়ে যায়। শেয়ালের আচরণ দেখে বাবর নিশ্চিত হয় আশেপাশে কোনো দ্বিপদী প্রাণী নেই। আর সে তার লুকিয়ে থাকার স্থান থেকে এবার তাই বেরিয়ে আসে। তার পরণের মোটা কাপড়ের তৈরি আলখাল্লা আর ভেড়ার চামড়ার আঁটসাট জ্যাকেট- গরীব কৃষকের লেবাস- এখনও ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে আর তার ত্বকে শীতল অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে। পানিতে ভেজা কুকুরের মত সে নিজেকে ঝাঁকায়, তারপরে নিজেকে ভাল করে রগড়ে নেয়।
কম্পিত বুকে, সে সুড়ঙ্গের মুখের দিকে এগিয়ে যায় এবং মুখ থেকে ডালপালা সরিয়ে দেয়। তারপরে বুকে ভর দিয়ে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে এগিয়ে যাবার আগে নিজের পেছনে পুনরায় ডালপালাগুলো আবার জায়গামত রেখে দেয়। হাত বাড়িয়ে সে সুড়ঙ্গের মুখ আটকে রাখা ঝুলদরজার প্রান্ত খুঁজে। এই তো পেয়েছি! দরজাটার হাতল আঁকড়ে ধরতে একটা ছোট পোকা- সম্ভবত পিঁপড়ে বা পেটের নিচে চিমটেওয়ালা ক্ষুদে পোকা- তার আঙ্গুলের উপর দিয়ে হেঁটে যায়। বাবর সাবধানে দরজাটা খুলে এবং ভেতরে উঁকি দেয়। খনিকূপের মত সরু পথটা ইটের তৈরি আর দু’পাশে কাঠের ডাসা লাগান রয়েছে। সে দু’পাশের ডাসায় পা দিয়ে নামতে শুরু করে আর মাথার উপরে ঝুলদরজাটা টেনে যথারীতি বন্ধ করে দেয়।
তার চারপাশে এখন সূচীভেদ্য অন্ধকার এবং কেমন একটা অস্বাস্থ্যকর, স্যাঁতাস্যাঁতে, মাটি মাটি গন্ধ তার নাকে ভেসে আসে যেন কোনকিছু- বা কেউ একজন- এখানে মারা গিয়েছে, যা সম্ভবত এখানেই থেকে গিয়েছে। সমরকন্দের একটা গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে, সত্যি কিন্তু সেই সাথে সেটা সংঘাতময়ও বটে। এই সুড়ঙ্গটা প্ৰথমকে খুঁড়েছিল? সে কল্পনা করতে চেষ্টা করে। তারা কি ভয়ঙ্কর ভবিতব্য এড়াতে নাকি ভেতরে প্রবেশের জন্য এই গর্তটা খুড়েছিল?
সতর্কতার সাথে, বাবর খনিকূপ সদৃশ সুড়ঙ্গটার তলদেশে নিজেকে নামিয়ে নিয়ে আনে, আগের রাতের অভিযানের অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে সুড়ঙ্গটা মাত্র দশ ফিট গভীর। কিন্তু প্রশ্ন হল সুড়ঙ্গটা এখান থেকে কোথায় গিয়েছে? সে দুহাত দিয়ে দু’পাশে শক্ত করে ধরে পা টিপে টিপে সামনে এগিয়ে যায়। তার পায়ের নিচের মাটিতে প্যাঁচপ্যাঁচে শব্দ সৃষ্টি হয় এবং মনে হয় ক্রমশ ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। পিছলে গিয়ে টলতে টলতে সে সামনে এগিয়ে যায় এবং কয়েক কদম পরে পায়ের নিচে শক্ত পাথরের অস্তিত্ব অনুভব করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
মাথার উপরের ছাদ নিচু হয়ে আসতে বাবর ঝুঁকে অন্ধকারের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যায়। এখন কোনো শত্রুর মুখোমুখি হলেই হয়েছে, আর দেখতে হবে না। সোজা হয়ে সে দাঁড়াতেই পারছে না, শত্রুর মোকাবেলা করবে কিভাবে। আর তরবারি চালাবার কোনো প্রশ্নই উঠে না। সে সাথে করে তার মরহুম আব্বাজানের ঈগলের মাথার বাটযুক্ত তরবারি নিয়ে আসেনি। কপাল খারাপ হলে সে যদি ধরা পড়ে তখন। তার মত একজন কৃষকের সন্তানের কাছে সেটা কিভাবে এল তা নিয়ে অনেক প্রশ্নের উদ্রেক হবে। কিন্তু মুশকিল হল তরবারিটা ছাড়া তার নিজেকে অরক্ষিত মনে হয়।
স্যাঁতস্যাঁতে, পাতিগন্ধময় বাতাসে সে যেভাবে কুঁজো হয়ে রয়েছে, তাতে শ্বাস নেয়া রীতিমত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। পায়ের ধাপ গুনতে গুনতে, সে দ্রুত এগিয়ে যায়- দশ, বিশ, ত্রিশ। সে আগে হিসেব করে রেখেছে যে ছয়শো ধাপ তাকে শহরের দেয়ালের কাছে যাবে। কিন্তু তার কোনো ধারণা নেই সুড়ঙ্গটা আসলে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সে গোনার চেষ্টা চালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। নব্বই, একশ। কপালের ঘাম গড়িয়ে মুখে একটা নোনতা স্বাদ ছড়িয়ে যায়। অসহিষ্ণুচিত্তে সে জিহ্বা দিয়ে লবণাক্ত ঘামের ফোঁটা ঘন ঘন টুসকি দিয়ে ঝেড়ে ফেলতে চেষ্টা করে। একশ পঞ্চাশ…সুড়ঙ্গটা এখন বেশ প্রশস্ত হয়ে উঠেছে, দু’জন অনায়াসে হেঁটে যেতে পারবে। বাবরের গতিবেগ দ্রুততর হয়ে উঠে। সে এখন প্রায় দৌড়াচ্ছে। চারশ….
তারপরে সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। কিসের শব্দ? পুরুষ কণ্ঠের হৈচৈ আর কর্কশ অট্টহাসি সে নিশ্চিতভাবেই শুনতে পায়। সহসা তাকে চমকে দিয়ে সামনে থেকে কমলা আলোর আভা ভেসে আসে। বাবর এবার অস্পষ্ট দেয়াল দেখতে পায় এবং সেটা বাম দিকে তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়েছে। বদ্ধস্থানে গলার স্বর গমগম করে প্রতিধ্বনি তুলছে। মুহূর্তের ভিতরেই কণ্ঠস্বর যাদের তারা বাঁক ঘুরবে আর তাকে দেখতে পাবে। বাবর পাগলের মত ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্ধকার কোণায় ছুটে যায়। হতাশায় প্রায় ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে দৌড়াতে থাকে এবং সুড়ঙ্গের একটা ভাজের মাঝে নিজেকে আপ্রাণ চেষ্টা করে মিলিয়ে দিতে। কিন্তু কণ্ঠস্বরগুলো এখন আবার মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। লোকগুলোকে যদি সুড়ঙ্গটা পাহারা দেবার জন্য পাঠান হয়ে থাকে তবে বলতেই হবে তারা তাদের দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেনি। একটা মলিন হাসি তার মুখে ফুটে উঠে। ওয়াজির খানের লোক হলে এতক্ষণে কাজে গাফিলতির জন্য। তাদের চামড়া জীবন্ত খালিয়ে নেয়া হত।
বাবর অপেক্ষা করে। পুনরায় অন্ধকার আর নিরবতা নেমে এসেছে। বেশ কয়েকবার গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে, কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে সে আবার সামনে এগোতে শুরু করে। বাবর তার পায়ের ধাপের গণনা গুলিয়ে ফেলেছে কিন্তু সে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে সে শহরে দেয়ালের কাছে নিশ্চিতভাবে পৌঁছে গেছে। সে এবার বাম দিকের তীক্ষ্ণ বাঁকটা ঘুরে এবং সামনে এগিয়ে যায়। আরও পাঁচ মিনিট নাগাড়ে হাঁটবার পরে সে তার সামনে আবছা আলোর আভাস বুঝতে পারে যা জ্বলন্ত মশালের কমলা রঙের আভা না বরং চাঁদের আর রাতের তারার একটা শীতল বিকিরণ।
