এক ঘণ্টা নিরবিচ্ছিন্নভাবে পথ চলার পরে স্রোতধারা বিভক্ত হতে বাবর বামদিকের স্রোত অনুসরণ করে সেটা সমরকন্দের বিশাল সবুজাভ-নীল তোরণের আধমাইল দক্ষিণ দিয়ে বয়ে গেছে। তাকে খুব সতর্ক থাকতে হবে। দূর্গ প্রকারের পেছন থেকে তাকিয়ে থাকা সতর্ক দৃষ্টি নিঃসঙ্গ অশ্বারোহীকেও সন্দেহের চোখে দেখবে যদি সে খুব কাছে এগিয়ে যায়। সে স্রোতধারার দূরবর্তী পাড় দিয়ে এগিয়ে যায়, যেখানে সে পাড়ে জন্মানো উইলো গাছের ছায়ায় মিশে গিয়ে সবার দৃষ্টি এড়িয়ে অশরীরির মত এগিয়ে যেতে পারবে।
ওয়াজির খান অবশ্য ঠিকই বলেছিল। পুরো ব্যাপারটাই পাগলামির চুড়ান্ত। এতগুলো মাস শহর অবরোধ করে রাখার পরে এখন যদি শহরের রক্ষাব্যুহের দুর্বল স্থান আর তার অধিবাসীদের মনোভাব জানবার শখ বাবরের হয়ে থাকে তবে সে নিজে একলা না এসে তার অধীনস্থ কোনো গুপ্তচরকে সুড়ঙ্গ পথে পাঠাতে পারতো। কৃষকটার ইতস্তত ভঙ্গিতে উচ্চারিত সেই কয়েকটা বাক্য শোনবার মুহূর্ত থেকে বাবর জানে নিয়তির অমোঘ হাত তাকে সামনে টেনে নিয়ে চলেছে।
মাথার উপরে ঝুঁকে থাকা উইলোর শাখার ভেতর দিয়ে রাতের মেঘহীন পরিষ্কার আকাশ দেখা যায়। স্রোতস্বিনীর অপর পাড়ে সে শহরের আবছা অবয়ব দেখতে পায়। আর কয়েক মিনিট আর তারপরেই অন্ধকারের ভেতর থেকে দৈত্যের মত সবুজাভ-নীল তোরণদ্বার প্রকটিত হবে। শীঘ্রই একদিন, বাবর নিজেকে কথা দেয়, রাতের আঁধারে চোরের মত নিজের শহরে প্রবেশের বদলে, সে এই তোরণদ্বারের নীচ দিয়ে নিজের বাহিনী নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে।
একটা ক্ষুদ্র জন্তু- ইঁদুর, খুব সম্ভবত নদীর তীরে বসবাসকারী ইঁদুর- তার টাটুর খুরের নীচ দিয়ে দৌড়ে গেলে আতঙ্কে হেষাধ্বনি তুলে বেচারা চঞ্চল ভঙ্গিতে পাশে সরে যায়। বাবর নুয়ে পড়ে তার টাটুর নরম, ঝাকড়া গলায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করে। এখান থেকে পায়ে হেঁটে এগিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বাবর ঘোড়ার সাজ খুলে নেয় এবং পিঠ থেকে ভাঁজ করা কম্বলটা নামায় যার উপরে সে এতক্ষণ বসে ছিল তারপরে ওয়াজির খানের সাথে তার যেমন কথা হয়েছিলো, টাট্ট ঘোড়াটা ছেড়ে দেয় যাতে সেটা পথ খুঁজে ছাউনিতে ফিরে যেতে পারে। আগামীকাল ঠিক এই সময়ে ওয়াজির খান এখানেই আরেকটা নতুন ঘোড়া নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করবে।
কোমল অন্ধকারের ভিতর দিয়ে দক্ষিণে আরও আটশ গজ এগিয়ে যাবার পরে সে সুইপ্রস্তুতকারকদের তোরণদ্বারের উভয়পার্শ্বে জ্বলন্ত মশালের বিরক্তিকর লালবিন্দু সে দেখতে পায়। লম্বা আর সংকীর্ণ, সমরকন্দের ছয়টা প্রবেশদ্বারের ভিতরে, এটা সবচেয়ে সেটা আর নিরাভরণ। এই তোরণদ্বার সাধারণত কৃষক আর ব্যবসায়ীরা সচরাচর ব্যবহার করে থাকে। তৈমূর কদাচিত এটা ব্যবহার করেছেন। অতিকায় লোহার তোরণদ্বার আর নীল টাইলে সজ্জিত সবুজাভ-নীল তোরণদ্বার তিনি সাধারণত ব্যবহার করতেন যার প্রবেশ পথের খিলানাকৃতি তোরণের উপরের কামরায় অবস্থানরত নকীবের দল কাড়াকাড়া আর কর্কশ-সুরের তূর্যনাদের মাধ্যমে তার আগমন ঘোষণা করতো।
সময় হয়েছে এবার স্রোতস্বিনী অতিক্রম করার, যা এখানে অনেক গভীর প্রায় নদীর দ্যোতনায় প্রবাহিত হচ্ছে। বাবর প্রায় তার কাঁধ ছাপিয়ে বয়ে যাওয়া পানিতে ধীরে ধীরে নেমে আসে। প্রায় তীরের কাছে পৌঁছে সে তলদেশের আলগা পাথরে হোঁচট খায় আর ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। শীতল পানির স্রোত মাথার উপরে বয়ে গিয়ে তার শ্বাসরোধ করে ফেলে সে টের পায় পানির টানে সে ভেসে যাচ্ছে। ডুবন্ত। মানুষের মত অকুলান হয়ে সে কোনমতে একহাত পানির উপরে তুলে আর সেটা গাছের ডালের মত কিছু একটার সাথে ধাক্কা খেতে সে ব্যাথায় কুচকে যায়। আরেকবারের চেষ্টায় সে একটা ডাল কোনমতে ধরে আর এবার দু’হাত ব্যবহার করে নিজেকে তীরে তুলে নিয়ে আসে।
হাঁপাতে হাঁপাতে, সে চোখের উপর থেকে চুল সরিয়ে চারপাশে ভাল করে তাকায়। অন্ততপক্ষে সে নহরের অপর পারে এসে পৌঁছেছে। সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে তার। তৈমূরের আংটি খোঁজে, যা তার গলায় একটা চামড়ার পাতলা দড়ির সাহায্যে ঝুলে আছে। তার আঙ্গুল ভারী, মোটা ধাতব অস্তিত্ব টের পেতে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সে নিরবে গুটিসুটি মেরে কাঁপতে কাঁপতে কান খাড়া করে। কিছুই না। না কোনো ফেঁকড়ি ভাঙার আওয়াজ না বাদুরের নরম ডানার ঝাপটানি। সে এবার সামনে সুইপ্রস্তুতকারকদের আবছাভাবে দৃশ্যমান তোরণদ্বারের দিকে তাকায়। গুঁড়ি মেরে নিঃশব্দে সামনে এগিয়ে সে একটা পুরান বাগানের ধ্বসে পড়া দেয়ালের কাছে। এসে পৌঁছে, যেখানে ডালিম গাছের মাঝে মরা ডালপালার স্তূপের নিচে গোপন সুড়ঙ্গে প্রবেশের মুখটা ঢাকা রয়েছে।
গতরাতে পাহারা দেবার জন্য কোনো প্রহরী ছিল না। বাবর কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করে আজও যেন সেরকমই থাকে। আর তাছাড়া সুড়ঙ্গের ভেতরেও সে কারো মুখোমুখি হতে চায় না। তাকে দ্রুত করতে হবে- আর সেই সাথে সতর্কও থাকতে হবে। খোলা স্থানের দিকে দৌড়ে যাবার প্রবণতা গলা টিপে মেরে সে একটা বুড়ো গাছের কোটরে গা-ঢাকা দেবার স্থান খুঁজে বের করে এবং সেখানে চুপ করে বসে কান খাড়া করে চারপাশে লক্ষ্য রাখে। তোমার নামের অর্থ বাঘ, বাবর নিজের মনে বলে, আজ রাতে তাই সেরকমই আচরণ করো। খোলা জায়গা এড়িয়ে গিয়ে তাই আঁধারের আলিঙ্গনে নিজেকে আবৃত করো আর নিজের অসহিষ্ণুতা দমন করতে শেখো।
