গোত্রপতির দৃষ্টি বাবর, ওয়াজির খান আর প্রহরীদের হাতে ধৃত দুই লুণ্ঠনকারীর চোখের মরিয়া-দৃষ্টির ভিতরে ঘোরাফেরা করে। বাবর তার চোখে আর অভিপ্রায়ে মৃত্যুর শাণিত সঙ্কেত অনুভব করে। কিন্তু অস্ফুট কসম আউরে গোত্রপতি তরবারির বাট থেকে হাত সরিয়ে নেয় এবং তার পরিষ্কার কামান মাথা আনুগত্য প্রদর্শনের অভিপ্রায়ে নত করে।
দশ মিনিট পরে, অভিযুক্ত দুজনের চারপাশে একটা নিরব বৃত্ত তৈরি করে তাদের ক্ষুদ্র গোত্রের সব সদস্য এসে জড়ো হয়। বাবর ইশারায় অনুমতি দিলে সে কেশে গলা পরিষ্কার করে এবং বন্দিদের উদ্দেশ্যে বলে: “আমি যে আইন রক্ষা করব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তোমরা সেটা ভঙ্গ করেছে। আমি, গোত্রপতি হবার কারণে, বিচারের জন্য তোমাদের সোপর্দ করলাম। তোমাদের দেহ টুকরো করে হায়না আর শকুনের খোরাক হিসাবে ফেলে রাখা হবে। এখানে উপস্থিত সবাই আরেকটা কথা শুনে রাখো, আমার আদেশে এটা সংঘটিত হবে। দণ্ড কার্যকর যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কোনো প্রতিশোধমূলক মনোভাব পোষণ করবে না।”
ওয়াজির খান তার প্রহরীদলকে সামনে এগোবার ইঙ্গিত দেয়। কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে তারা কাঁপতে থাকা বন্দির দিকে এগিয়ে যায় এবং তাদের হাঁটু ভেঙে দাঁড়াতে বাধ্য করে। ঝকঝকে তরবারির ফলা মৃত্যু মুখে নিয়ে তাদের ঘাড়ের উপরে নেমে আসতে সকালের তাজা শীতল বাতাসে লোকগুলোর শেষ আর্তনাদ পুকুরে ঢিল পড়ার মত ভেসে উঠে ডুবে যায়।
বাবরের পেটের খাবার মোচড় খেয়ে উঠে আসতে চায় এবং গভীর শ্বাস নিয়ে সে নিজেকে শান্ত রাখে। এটাই আইন। শৃঙ্খলা আর শ্রদ্ধা বজায় রাখতে কোনো নেতা যা করতো সে কেবল সেটাই করেছে। আর্তনাদ প্রশমিত হয়ে শকুনের দল আশু ভোজের সম্ভাবনায় কোলাহল শুরু না করা পর্যন্ত বাবর নিজেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়া থেকে বিরত রাখে।
“তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও আর এটা ধরো।” বাবর রৌপ্য মুদ্রা ভর্তি উটের চামড়ায় তৈরি একটা থলে হতভম্ব কৃষকের দিকে বাড়িয়ে ধরতে সে কয়েক মুহূর্ত সেটার দিকে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তারপরে সেটা হাতে নেয়। বাবর পিঠ ঘুরিয়ে নিয়ে রওয়ানা দেবে এমন সময় লোকটা গলা পরিষ্কার করে ইতস্তত ভঙ্গিতে কিছু একটা বলতে চায়।
“আর কিছু বলবে?” চর্মসার আর দুর্দশাগ্রস্থ কৃষকটা- বাবরের মনে বিরক্ত আর ক্লান্ত একটা অনুভূতির জন্ম দেয়। আজ এখানে যা কিছু ঘটেছে তাতে এই লোকটার কোনো হাত নেই, কিন্তু লুটেরার দল যখন তার গ্রামে হানা দিয়েছিলো তখন সেই সত্যিকারের মানুষের মত তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিল…বাবর ভাবনাটা অবান্তর বলে সেখানেই থামিয়ে দেয়। এই লোকটা যোদ্ধা না, সে একজন পরিশ্রমী মানুষ এবং সে সাহস করে তার শিবিরে এসেছিল ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায়।
“সুলতান…একটা ব্যাপার যা আপনার বোধহয় জানা উচিত…তিন দিন আগে পূর্ণিমার সময়ে যা আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
“কি দেখেছো?…বলো।”
“আমি দেখেছি কিছু লোক…সম্ভবত, গুপ্তচর– শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমি তখন ভেড়া চরাতে গিয়েছিলাম, গাছের আড়ালে লুকিয়ে আমি তাদের বের হতে দেখি, এবং বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে তাদের ফিরেও আসতে দেখেছি। সুইপ্রস্তুতকারকদের ফটকের পাশে দিয়ে একটা গলিপথ সমরকন্দের দিকে চলে গেছে। সুলতান চাইলে আমি সেটা দেখাতে পারি।”
বাবরের হৃৎস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে যায়। “তুমি যদি সত্যি কথা বলে থাকো তবে ঐ রৌপ্যমুদ্রার কয়েকগুণ বেশি আমি তোমার ওজনের সমান সোনার মোহর তোমাকে দেব।”
***
“সুলতান, এটা স্রেফ পাগলামি।”
“হয়ত।” বাবর টের পায় তার নিজের ভেতরে উত্তেজনার রাশ আলগা হচ্ছে। আর কয়ের ঘণ্টা পরে সে সমরকন্দের ভেতরে থাকবে।
“অন্তত আমাকে আপনার সাথে যাবার অনুমতি দেন।”
“না, ওয়াজির খান। ছিন্ন বস্ত্র পরিহিত একটা কিশোরকে কে ভাল করে খেয়াল করতে যাবে? কিন্তু সমরকন্দের অনেকেই তোমায় চেনে। আমি একলাই বরং নিরাপদে থাকব।”
ওয়াজির খানকে অন্তত একবার হলেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেখায়। তার অন্ধ চোখের উপরের আড়াআড়ি ক্ষতচিহ্ন স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে কুঞ্চিত হয়ে উঠে। “কিন্তু আপনি আমাদের সুলতান,” সে একগুয়ে কণ্ঠে বলে। “ফারগানার কি হবে যদি আপনি আর ফিরে না আসেন?”
“আমি ফিরে আসছি। এখন আমাকে যেতে দাও।”
বাবর তার নিজের পছন্দ করা নির্ভরযোগ্য, শক্তপোক্ত দেখতে কালো টাটু ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে এবং পেছন দিকে একবারও না তাকিয়ে রাতের আঁধারে অজানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।
চাঁদের আলোয় পশ্চিমদিকে বয়ে যাওয়া নহরের সমান্তরালে এগিয়ে যাওয়া। এবড়োখেবড়ো পথটা আলোকিত হয়ে আছে, যা আগের রাতে সে নিজে ওয়াজির খান আর সেই কৃষকটার সাথে এসে দেখে গিয়েছিল। তার মস্তিষ্কে পথটার প্রতিটা নুড়িপাথর যেন গাঁথা হয়ে রয়েছে। সে এখন খান উর্তি তৃণভূমির উপর দিয়ে ঘোড়া দাবড়ে চলেছে- তার মরহুম আব্বাজান তাকে প্রায়ই এর কথা বলতো- গ্রীষ্মকালে তৈমূর একবার এখানে অবকাশযাপনের উদ্দেশ্যে ছাউনি ফেলেছিল। রেশমের ছাউনির নিচে শুয়ে পানির ধারা বয়ে যাবার শব্দ শুনবে বলে, যা ছিল বেহেশতের উদ্যানে প্রবাহিত জলধারার ন্যায় শীতল আর বিশুদ্ধ। এখন সেই একই জলধারার চঞ্চল শব্দ যেন মহান তৈমূরের কণ্ঠস্বর হয়ে বয়ে চলেছে, তাকে বলছে: “এগিয়ে যাও। সব কিছু তুচ্ছ করে।”
