হাম্মামখানার তাবুর কাছ থেকে গোলমালের শব্দ আসছে। সে আর ওয়াজির খান আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতে, বাবর দেখে তার একজন ভাড়াটে সেনাপতি বনাঞ্চলে বিচরণ করা যাযাবর-নিজের কয়েকজন মার্কামারা সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে দুটো বস্তার জিনিসপত্র তল্লাশি করছে। আরেকজন লোক, পোশাক-আশাক দেখে মনে হয় আশেপাশের গ্রামের কৃষক, দাঁড়িয়ে দেখছে। “আমার কাছ থেকে এভাবে কেড়ে নেবার কোনো অধিকার তোমার নেই। তোমরা যদি সবই এভাবে রেখে দাও-আমার শস্য এমনকি আমার ভেড়াগুলোও বাদ দাওনি, তাহলে এই শীতে আমি আমার পরিবারকে কি খেতে দেব।” লোকটা ইশারায় কাছেই জড়োসড়ো হয়ে থাকা আলুথালু বাদামী রঙের ভেড়ার দিকে ইশারা করে। ক্রোধে লোকটার চোখে পানি টলটল করছে।
এই গোবেচারা, হাল্কা পাতলা, বিপর্যস্ত চেহারার কৃষিজীবি লোকটা ক্রোধে হতাশায় যেসব যোদ্ধাদের সামনে দাপাদাপি করছে তারা হাতের ঝটকায় তাকে জানে মেরে ফেলতে পারে, কিন্তু তার স্পর্ধা চোখে পড়ার মত, কিছু একটা আছে লোকটার ভিতরে, বাবর ভাবে।
“জানে বেঁচে গেলে বলে কপালকে ধন্যবাদ দিতে দিতে তোমার আস্তাকুড়ে ফিরে যাও। আর তোমার স্ত্রীর সাথে দেখা হলে তাকে আমার তরফ থেকে একটা চুমো দিয়ে বোলো, তার সঙ্গ আমি উপভোগ করেছি, যোদ্ধাদের একজন খিকখিক করে হাসতে হাসতে লোকটার পোদে একটা লাথি বসিয়ে দিলে বেচারা দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ে। লোকটা উঠতে চেষ্টা করলে আরেকটা লাথি কষিয়ে দেয়।
“এখানে কি হচ্ছে?”
চমকে উঠে বোকা বোকা চোখে লোকগুলো বাবরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
“মহামান্য সুলতানের প্রশ্নের উত্তর দাও,” ওয়াজির খান বাঘের ঝাপটা নিয়ে বলে। কিন্তু তবুও কেউ উত্তর দেয় না।
“উঠে দাঁড়াও,” বাবর মাটিতে পড়ে থাকা কৃষককে ইঙ্গিত করতে, সে ধীরে, পেটে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, তার বলিরেখা পূর্ণ মুখে আশঙ্কার আঁকাজোকা। সে যদি সৈন্যদের ঘৃণা করে বোঝাই যায় তাদের সুলতানের প্রতিও তার কোনো আস্থা নেই। সে কারুকার্যময় লাগাম সজ্জিত ঘোড়ায় উপবিষ্ট কর্তৃত্বব্যঞ্জক বালকের কাছ থেকে দূরে সরে আসে।
“যেখানে আছে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।” বাবর ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে জীবন্ত চিত্রপটের দিকে তাকিয়ে দেখে। তার সামনে দুটো পাটের তৈরি বস্তা অসহায়ের মত উল্টে পড়ে ভেতরের সব মামুলি জিনিসপত্র ছত্রাকারে ছিটিয়ে রয়েছে। বাবর তার হাতের চামড়ার দাস্তানা খুলে ফেলে, একটা বস্তায় হাত ঢুকায় এবং ভেতর থেকে মলিন কাপড়চোপড়, একটা কাঠের পাত্র এবং কয়েকটা কাপড়ের ব্যাগ বের করে আনে। কাপড়ের ব্যাগগুলো খুলে সে ভেতরে ইঁদুরের কালো বিষ্ঠার সাথে মিশ্রিত ছাতা ধরা শস্যদানা দেখতে পায়। অন্য থলেটা ভারী প্রতিয়মান হয়। ভেতরে ছয়টা হাড্ডিসার মুরগী, যাদের সদ্য মাথা মোচড়ানো হয়েছে, এবং একটা। পনিরের পিণ্ড আর বস্তার আস্তরে মুরগীর পালক আর রক্তে দলা পাকিয়ে রয়েছে। দেখা যায়।
বাবর বস্তাটা একপাশে ঠেলে সরিয়ে দেয়ার সময় লক্ষ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষক তার যথাসর্বস্ব ধনের মত সেটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এগুলো কোথা থেকে এসেছে?” বাবর জানতে চায়। নিরবতা। “আমি জানতে চাইছি এসব কোথা থেকে এসেছে?” দ্বিতীয়বার সে সরাসরি কৃষকের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করে। ‘সুলতান, জাফরশান নদীর ওপারে আমার গ্রাম থেকে এসেছে।”
“আর এসব তোমার কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেয়া হয়েছে?”
“হ্যাঁ, সুলতান।”
“জোর করে?”
“হ্যাঁ, সুলতান। এই দুইজন কেড়ে নিয়েছে।”
লোকটা লজ্জায় মাথা নিচু করে।
বাবর তার সেনাপতির দিকে তাকায়। “আমি পরিষ্কার আদেশ দিয়েছিলোম গ্রাম থেকে কোনো কিছু লুঠ করা হবে না, আমরা সব কিছু দাম দিয়ে কিনে নেবো। তৈমূরের উত্তরসূরী গরীব লোকদের নিপীড়ন করতে তাদের রক্তে ধরণী সিক্ত করতে এখানে আসেনি।”
যাযাবর লোকগুলো তার দিকে গনগনে চোখে তাকায়। “আমরা এখানে কয়েক। সপ্তাহ যাবৎ আছি। আমরা কিছুই জোর করে নেইনি। লুঠ করার মত কোনো মালই নেই। আমার লোকেরা বিরক্ত হয়ে পড়েছে। তাদের আমোদ দরকার। আর কি এমন নিয়েছে কৃষক নামের এই লার্ভাকীটের কাছ থেকে মামুলি কিছু সামগ্রী।”
“আর তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে।”
“তারা তো বললো সেই মহিলা খুব একটা অনিচ্ছুক ছিল না।” দলপতি খিকখিক করে হাসতে তার চওড়া কোদালের মত দাঁতের মধ্যেখানের ফাঁক উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
ক্রোধের একটা ঝাপটা বাবরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তার ইচ্ছে হয় তাদের এখনই এখানেই তরবারির আঘাতে দ্বিখণ্ডিত করে হতভাগাদের দেহবিহীন মুণ্ড গোবরের ঢিপিতে লাথি মেরে ফেলে দেয়। “ওয়াজির খান এই দুই লুটেরাকে এখনই গ্রেফতার করেন। তারা লুঠতরাজ আর ধর্ষণের অভিযোগে দোষী। তারা জানে এর কি শাস্তি। তাদের গোত্রের অন্য সদস্যদের উপস্থিতিতে আমি চাই এই মুহূর্তে তাদের সাজা কার্যকর করার ব্যবস্থা নেয়া হোক।”
ওয়াজির খান হাত উঁচু করে ইশারা করতেই প্রহরীরা এসে দু’জনকে বন্দি করে যারা কোনো প্রকারের বাধা দেবার পরিবর্তে আহাম্মকের মত দাঁড়িয়ে চোখ পিটপিট করে যেন আশেপাশে যা ঘটছে সেটা তাদের জ্ঞানগম্যির বাইরে।
“আর তোমাকে বলছি,” বাবর গোত্রপতির দিকে এবার তাকায় যার মুখের আমুদে হাসি অনেক আগেই উবে গেছে। বাবর খেয়াল করে তার আঙ্গুল কোমরে খয়েরী রঙের উলের তেলতেলে মসৃণ কাপড়ে জড়ান খঞ্জরের বাটের আশেপাশে চঞ্চল ভঙ্গিতে নড়াচড়া করছে এবং দেহ টানটান হয়ে আছে, মূর্খটার মাথায় কোনো ধরণের দূর্মতি ভর করলে সেটা মোকাবেলার জন্য সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। “এই অভিযানে তুমি আমার আইন মেনে চলবে অথবা তার পরিণতি ভোগ করবে এই শপথ নিয়েই তুমি আমার সাথে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। ভবিষ্যতেও যদি তুমি তোমার লোকদের সামলে রাখতে ব্যর্থ হও তাহলে জেনো তোমারও একই পরিণতি হবে।” বাবরের কণ্ঠে হুমকির প্রচণ্ডতা। “তুমি সবার সামনে ঘোষণা করবে এটা ন্যায়বিচার-শাহী ন্যায়বিচার। আমি আমার শিবিরে কোনো ধরণের রক্তপাত চাই না। এখনই তোমার সব লোকদের এখানে ডেকে পাঠাও!”
