“সুলতান সব শিবিরেই গুপ্তচর থাকে। এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। আর আমাদেরও কি চর নেই শহরের ভেতরে।”
“তারা সবাই ঘোড়ার লাদি পরিষ্কার করছে।”
“আরও অনেক কিছুই করবে, যখন করার সময় হবে। গত পাঁচমাস আমরা শহরটা অবরোধ করে রেখেছি। আমাদের পানি আর রসদের কোনো ঘাটতি নেই কিন্তু শহরের ভেতরের অবস্থা ঠিক উল্টো। শীঘ্রই তারা বাধ্য হবে খাবারের অন্বেষণে লোক পাঠাতে। আমাদের গুপ্তচরদের এখন কেবল সতর্ক থেকে তাদের গোপনে বের হবার রাস্তাটা চিনে নিতে হবে। শক্তি দিয়ে যা কাবু করা যায় না ছলনায় সেটা সহজেই পরাভূত হয়।”
হতাশায় বাবর অব্যক্ত স্বরে গুঙিয়ে উঠে। বিজ্ঞ আর ঠাণ্ডা বিচক্ষণ ওয়াজির খান যে লোক যুদ্ধ বিষয়ক কলাকৌশলে অজ্ঞ বাবরকে নিজ হাতে সবকিছু শিখিয়েছেন তিনি তাকে ভালো করে মনে করিয়ে দেন তার আরও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে। বিগত মাসগুলো তাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে, সে জেনেছে যেখানে ঘাস আশেপাশের থেকে বেশি লম্বা আর সবুজ, বুঝতে হবে সেখানে লুকান পানির ধারা অবশ্যই আছে। সে শিখেছে যুদ্ধের সম্ভাবনা পিছিয়ে গেলে কিভাবে কুচকাওয়াজ আর শরীরচর্চার মাধ্যমে সৈন্যদের প্রস্তুত আর মনোবল চাঙ্গা রাখতে হবে। সে তাদের আদেশ দিয়েছে সমরকন্দের উঁচু দেয়ালের বাড়াবাড়ি ধরণের কাছে গিয়ে পোলো খেলতে এবং শহরের শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজদের হেলায় মোকাবেলা করতে বলে সে ঘোড়ার খুরে মত্ত মাদলের বোল তুলে ছুটে গিয়ে ভেড়ার মাথার বলে তার ম্যালেট দিয়ে আঘাত করেছে যা তারা তাদের খেলা শেষ হলে- ইচ্ছাকৃতভাবে শহর রক্ষাকারী প্রাকারের উপর দিয়ে চরম অবজ্ঞায় ভেতরে ছুঁড়ে দিয়েছে।
বাবর, অন্ধকারে কিভাবে নিরবে দলবল নিয়ে এগিয়ে যেতে হয় এবং কিভাবে লম্বা মই স্থাপন করতে হয় উঁচু দেয়ালের সাথে, যার শীর্ষভাগ ভেড়ার চামড়া মোড়ান রয়েছে কৌতূহল উদ্রেককারী শব্দ রোধ করতে, আয়ত্ব করেছে। মই বেয়ে সে। তাদের সাথে উপরে উঠতে গিয়ে প্রস্তরখন্ড, তীরের ঝাপটা আর বালতি ভর্তি গরম জ্বলন্ত আলকাতরার সামনে পড়েছে এবং পিছিয়ে এসেছে। সে তার লোকদের খোঁড়া অন্ধকার, বালুময় সুড়ঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে দেয়ালের দিকে আশা করেছে নিচে দিয়ে যেতে পারবে কিন্তু ফারগানার পাহাড়ের মত অনড় ভিতের মুখোমুখি হয়েছে।
বাবর দিনের বেলায় আক্রমণ করেছে, তার লোকেরা ঘামে ভিজে অতিকায় অবরোধ অনুষঙ্গ টেনে এনেছে বিশাল প্রস্তরখণ্ড ছুঁড়ে মারতে। কিন্তু সমরকন্দের লোহা দিয়ে বাধান গেট আর পুরু দেয়াল এসব ঝাপটা আর মাথায় লোহার পাত দেয়া বড় ভারী কাঠের লাঠির আঘাত অনায়াসে সামলে নিয়েছে।
“আমি বুঝতে পারছি না। আমার চাচা সমরকন্দের সুলতান ছিল। আমি তৈমূরের সাক্ষাৎ বংশধর। আমি আশ্বস্ত করেছি যে শহরে কোনো অরাজকতা সৃষ্টি হবে না। লোকজন নিজের গরজে দরজা খুলে আমাকে প্রবেশ করার জন্য অনুরোধ করছে না কেন? সুদখোর উজিরের ভিতরে তারা কি পেল?”
ওয়াজির খানের হাসি হাসি মুখ দেখে বাবর বুঝতে পারে সে আবার বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে। “এমন হতে পারে সে তাদের ভয় দেখিয়ে বশে রেখেছে। একটা কথা মনে রাখবেন সাধারণ মানুষ আপনাকে চেনে না। তৈমূর মারা যাবার পর থেকে অগণিত সুলতান আর গোত্রপতির দল নিজেকে মহান যোদ্ধার আত্মীয় দাবি করে সমরকন্দ অবরোধ করেছে স্বর্ণ আর সৌভাগ্যের প্রত্যাশায়। আপনার আপন। চাচাও বাহুবলে শহরটা অবরোধ করেছিলেন। শহরবাসীরা উপদ্ৰবকারীর প্রতি কেন সদয় হবে? হাম্বলদস্তা উজিরকে অন্তত তারা চেনে।”
পেঁচার ডাক শুনে তারা আকাশের দিকে তাকায়, সেখানে ইতিমধ্যেই রাতের তারারা বিদায় নিতে শুরু করেছে।
“সুলতান, এবার আমাদের ফেরা উচিত।” ওয়াজির খান কয়লা ভর্তি ঝুড়িটা লাথি মেরে উল্টে দিয়ে জ্বলন্ত কয়লাগুলি পা দিয়ে মাটি চাপা দেয়।
বাবর কেঁপে উঠে, কিন্তু সেটার কারণ কেবল উষ্ণতার সমাপ্তির ভিতরে নিহিত ছিল না। “ওয়াজির খান আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আমরা যদি শীঘ্রই শহরটা দখল না করি তবে শীতকাল এসে আবার আমার সৈন্যবাহিনীর দফারফা করে দেবে। আমি বিজয় অর্জন না করেই দ্বিতীয়বারের মত ফারগানায় ফিরে যেতে বাধ্য হব। তখন আমার লোকেরা কি ভাববে আমাকে?”
ওয়াজির খান তার বাহুতে হাত রাখে। “আমাদের হাতে সময় আছে। সূর্য এখনই ক্রান্তিকালে আসেনি। আল্লাহতা’লা সহায় থাকলে, সমরকন্দের পতন হবেই।” বাবর ভাবে, তার কথাই ঠিক। তার মরহুম আব্বাজান অনেক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন কিন্তু তাই বলে কখনও হতাশ হননি। তিনি যেন কি একটা কথা বলতেন? “তোমার সৈন্যরা যদি তোমাকে দ্বিধাগ্রস্থ দেখে তবে সব শেষ। তারা তোমার প্রতি নেতৃত্ব আর নিয়মানুবর্তিতার জন্য তাকিয়ে রয়েছে।” হ্যাঁ, সুলতানের কাজ হচ্ছে শক্ত থাকা। তাকে অবশ্যই এটা মনে রাখতে হবে।
তারা ঘোড়ায় চড়ে ছাউনির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। ছাউনির কাছাকাছি পৌঁছালে ঘোড়ার খুরের বোল ছাপিয়ে একটা লোকের ক্রুদ্ধ কণ্ঠ বাবরের কানে ভেসে আসে। দূর্বিনীত বদমাশগুলো কি নিজেদের ভিতরে আবার ঝামেলা বাধিয়েছে, যারা তার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় অংশ? বাতাসে শোরগোলের আওয়াজ আরও জোরাল হতে এবং শপথ আর প্রতিজ্ঞার ঝড় বইতে থাকলে, সে ক্লান্ত মনে ভাবে।
