“সুলতানের মহানুভবতার তুলনা হয় না। রোক্সানা এবার তার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠে। “আপনার ভাইও আপনাকে তার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।”
সভাই, বাবর ভাবে, এবং মোটেই হাসির উত্তর দেয় না। সে তাকে এখনও দেখেনি। ছেলেটা কোনো কারণে জ্বরে আক্রান্ত সন্দেহ নেই মশার বা আটুলির কামড়ের ফল। খুতলাঘ নিগার তাকে এবিষয়ে কিছুই বলেনি। “আপনার সন্তান শীঘ্রই সুস্থ হয়ে উঠুক, বাবর বলে। সৌজন্যমূলক বাক্য কিন্তু বাবর জানে বাক্যটায় শীতল একটা অনুভূতি রয়েছে। সেটা বাবরের ইচ্ছাকৃত। গোড়ালির উপরে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাবর দ্রুত বের হয়ে যায়, তার মন ইতিমধ্যেই আসন্ন অভিযানের উত্তেজনায় ব্যপৃত হয়ে পড়েছে।
***
চোখে প্রচ্ছন্ন গর্ব নিয়ে বাবর তার অশ্বারোহী বাহিনীকে পশ্চিমের চারণভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে দেখে, সে ভাবে এবারের অভিযানের জন্য আট হাজার লোক আমার আহবানে সাড়া দিয়েছে। অশ্বারোহী বাহিনীর ঠিক পেছনেই জমিদারদের বরকন্দাজ আর তাদের লোকেরা। তারপরে আছে গাট্টাগোট্টা চেহারার গোত্রপতির দল, বুনো চকরাখের মত, যারা কাশগড় আর ফারগানার মধ্যবর্তী উঁচু পাহাড়ী এলাকায় বাস করে তাদের ঘোড়া, ভেড়া আর লোমশ ইয়াকের পাল নিয়ে। মালবাহী গরুর গাড়িগুলো যাতে লম্বা তীক্ষ্ণ শিংএর বলদ জোতা হয়েছে মালের ভারে সেগুলোর চাকা তীব্র শব্দে প্রতিবাদ জানায়। এইবার ভাগ্যের উপরে সে কিছুই ছেড়ে দেয়নি। তার যুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণাসভায় সে লম্বা অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু বারবার পর্যালোচনা করেছে, অবরোধী অনুষঙ্গ থেকে সমরকন্দের দেয়াল টপকাবার সিঁড়ি, এত লোকের খাবারের বন্দোবস্ত, তাদের শান্ত রেখে বিজয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে গানবাজনার ব্যবস্থা সবকিছুর দিকেই লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
শীতের অলস মাসগুলোতে ওয়াজির খান আর বাবর, তাদের অনুপস্থিতিকালীন সময়ে ফারগানার নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করা যায় সেটাও বিবেচনা করেছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার উজির কাশিম, যার আনুগত্য আর দক্ষতা প্রশ্নাতীত, তাকেই রাজপ্রতিভূ হিসাবে রেখে যাওয়া হবে। উজবেক অনুপ্রবেশের কোনো সংবাদ এখনও পাওয়া যায়নি, এবং কোনো ধরণের বিপদ হলে কাশিম সাথে সাথে তাকে সংবাদ পাঠাবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সমরকন্দের শত্রুর মনোভাব আঁচ করা, সে কি করতে পারে। বাবর জানে যে প্রধান উজির এবারও- এখন প্রকাশ্যে নিজেকে সমরকন্দের সুলতান হিসাবে অভিহিত করেন-তার অভিযানের খবর আগেই পাবে। শহরের শস্যাগারে গত বসন্তের ফসল এখনও মজুদ করা আছে এবং শহরের দেয়াল সুরক্ষিত রাখার জন্য সৈন্যদের বিশ্বস্ততা কেনার মত স্বর্ণখণ্ড কোষাগারে মজুদ রয়েছে।
নাগাড়ে দশদিন পথ চলার পরে কোলবা টিলা তাদের দৃশ্যপটে ভেসে উঠে। বাবর ওয়াজির খানের পাঠান রেকীদলের ফেরত আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করে না। সে তার ধূসর স্ট্যালিয়নটা পান্নার মত সবুজ ঘাস, যা গত শীতের তুষারপাতের আর্দ্রতায় এখন ও সিক্ত আর মাঝে মাঝে হলুদ, গোলাপী আর সাদা বসন্তের ফুলের নকশায় শোভিত, উপর দিয়ে দাবড়ে নিয়ে যায়। তার ঘোড়ার আগুয়ান গতিতে একটা লম্বা লেজবিশিষ্ট পাখি, শান্তি বিঘ্নিত হতে শূন্যে ডানা ঝাঁপটে ত্রাহি রব তুলে বাতাসের রবাভয়ে নিজেকে উঠিয়ে নেয়। দিগন্তের বুকে আকাশের প্রেক্ষাপটে সমরকন্দের গম্বুজ আর মিনারের দৃশ্যপট সামনে ভেসে উঠলে বাবর টের পায় তার নাড়ীর স্পন্দনে মাদলের বোল উঠছে। পুরো শহরটা ঘিরে আছে একটা শক্তিশালী দেয়ালের ব্যুহ এবং তার ভিতরে বাবরের চোখ খুঁজে নেয় আরেকটা বেষ্টনীর প্রাকার, শহরের ভেতরের নিরাপদতম স্থান তৈমূর যা নিজের সর্বোচ্চ অট্টালিকা কোক সরাই এর চারপাশে নির্মাণ করেছিলো। তার মৃত্যুর পর থেকে জায়গাটার একটা বদনাম ছড়িয়ে পড়েছে। বাবর ছোটবেলা থেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী শাহজাদাদের নির্যাতন, হত্যা আর অন্ধ করে দেয়ার গল্প এবং প্রাসাদে নিমন্ত্রিত হয়ে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া অমাত্যদের কাহিনী শুনে এসেছে।
বাবর তার আজদাহাটাকে এক জায়গায় স্থির করে দাঁড় করায়। এত দূর থেকেও বাবর টের পায় একটা অতিকায় দানবের মত শহরটা সতর্ক আর উদগ্রীব হয়ে আছে এবং অপেক্ষা করছে। অসংখ্য চোখ বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, অনুমান করতে চেষ্টা করছে কখন আর কোনো দিক থেকে বাবর এসে উপস্থিত হবে এবং তার সাথে লোকবল কত থাকবে। ফারগানা থেকে পশ্চিমে তাদের তিনশ মাইল যাত্রাপথের পুরোটাই গুপ্তচরের নজরদারির ভিতরে ছিল।
এইবার অবশ্য আশেপাশে অন্যকোন অস্থায়ী ছাউনি দেখা যায় না। নিজের বিরহকাতর ভাই মাহমুদের কথা ভেবে বাবর আনমনেই হেসে উঠে। কোনো সন্দেহ নেই নিজের প্রজ্জ্বলিত নিম্নাঞ্চল নির্বাপিত করতে সে ইতিমধ্যেই আরেকজন রমণীকে খুঁজে নিয়েছে। কিন্তু তারপরেও যদি সে তাকে বেগম করতে চায়, বাবর শপথ নেয় উজিরের কন্যা তারই হবে। ভেট হিসাবে বাবর তাকে পাঠিয়ে দেবে।
***
“সুলতান, আপনাকে ধৈৰ্য্যশীল হতে হবে,” ওয়াজির খান গত পাঁচমাস ধরে যা বলে আসছে সে কথারই পুনরাবৃত্তি করে। অস্থায়ী শিবিরের সদাসতর্ক চোখ কানের ব্যাপ্তি এড়িয়ে, একটা ফলবাগানের ভিতরে তারা বসে আছে। ওয়াজির খান শীতের প্রকোপ কমাবার জন্য এক ঝুড়ি জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে এসেছিল যার দিকে এখন ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে। এই উষ্ণতাটুকু তাদের প্রয়োজন ছিল। শরৎকাল আসছে। বাতাসে এখনই হাড় কাঁপিয়ে দেয়ার মত কনকনে হিম। “আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি আমাদের ভেতরেই বিভীষণ আছে। আমরা নিকুচি শের যখনই শহরের কোনো অংশের দেয়াল আক্রমণ করতে যাই বা নিচে সুড়ঙ্গ বানাই সেখানেই তারা আগে এসে বসে থাকে। খবর পায় কি করে।” বাবর জ্বলন্ত কয়লায় ভিতরে খঞ্জরের অগ্রভাগটা দিয়ে একটা গুতো দেয়।
