কিন্তু সমরকন্দের অভিমুখে তার অসমাপ্ত অভিযান শুরু করার পূর্বে আম্মিজানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসতে হবে সে দ্রুতপায়ে তার কামরার দিকে এগিয়ে যায়। এইবার, খুতলাঘ নিগারের পিতলের বার্ণিশ করা আয়নায় সে তার ভিন্ন। চেহারা দেখে যার সাথে আব্বাজানের মারা যাবার রাতের সেই অনিশ্চিত অন্ধকার সময়ের চেহারার কোনো মিল নেই। কয়েক সপ্তাহ আগে বাবর তার ত্রয়োদশ জন্মদিন উদযাপন করেছে। তার গালে হাল্কা শত্রু দেখা দিয়েছে আর আগের চেয়ে সে অনেকটাই লম্বা আর চওড়া হয়েছে। কণ্ঠস্বরে ভাঙন এসেছে আর তৈমূরের অঙ্গুরীয় এখন আর আঙ্গুলে মোটেই ঢিলে হয় না।
“বাছা, তুমি দ্রুত যুবকে পরিণত হচ্ছো।” আম্মিজান তাকে বিদায় চুম্বন দিতে তার কণ্ঠে গর্বের প্রচ্ছন্ন ছোঁয়া টের পাওয়া যায়। এমন কি সন্তুষ্ট-আর সেই কঠোর বুড়িকে প্রীত করা কোনো মামুলি বিষয় না, কুচকে যাওয়া কিশমিশের মতই যার মুখের ত্বক কিন্তু তার ক্ষুরধার চোখে কিছুই এড়িয়ে যাবার জো নেই।
“শহরটা আমার দখলে আসবার পরে আমি তোমাদের সবাইকে নিয়ে যাবার জন্য লোক পাঠাব।”
“তুমি ওয়াদা করছো?” খানজাদা নিমেষে চিবুক উঁচু করে জানতে চায়। “ওয়াদা করছি।” সে নিচু হয় বোনকে চুমো দেয়ার জন্য যে এখন বাবরকে প্রীত করে, লম্বায় তার চেয়ে ইঞ্চি ছয়েক খাটো।
হারেমের ভিতর দিয়ে ফিরে আসার সময়ে সে একটা খোলা দরজা অতিক্রম করে। জানালাবিহীন কক্ষটায় তেলের প্রদীপের মৃদু আলোয় এক লম্বা তরুণী কেবল কাচুলী আর গোলাপী ফুলের ছোপ তোলা ঘাঘড়া পরিহিত অবস্থায় সামনে ঝুঁকে বসে চুল আচড়াচ্ছে। বাবর নিচু চৌকাঠ অতিক্রম করে।
সে তাকে দেখা মাত্র হাঁটু ভেঙে বসে কপাল মাটিতে ঠেকায় আর তার মাথার চুল চকচকে পানির মত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। “ফারগানার সুলতান, বাবরকে আমার অভিনন্দন। আল্লাহতালা আপনার উপর প্রসন্ন হোন।” তার কণ্ঠস্বর চাপা কিন্তু পরিষ্কার উত্তরের পাহাড়ী মানুষের টান তাতে স্পষ্ট।
“আপনি দাঁড়াতে পারেন।”
মার্জিত ভঙ্গিতে সে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখ পটলচেরা, দেহবল্লরী তন্বী এবং মধুর রঙের মত ত্বক। বাবর খেয়াল করে তার কামরার এককোণে রাখা পুরান দুটো কাঠের সিন্দুক থেকে কাপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
“আমি ভ্রমণ করে ক্লান্ত। আমার পরিচারকদের বলেছি আমাকে একটু একা থাকতে…” সে কথা শেষ না করেই থেমে যায় এবং বাবর তার চেহারায় অনিশ্চয়তা ভর করতে দেখে যেন সে কিছু একটা ভোলা করে দেখছে। সে ঘুরে দাঁড়ায় বেরিয়ে আসার জন্য। সৈন্যবহর যাত্রা শুরু করার আগে আরো অনেক কিছু তদারকি করা বাকি।
আমাকে এখানে নিয়ে আসবার জন্য “সুলতানকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই।” সে তার দিকে একপা এগিয়ে আসলে বাবরের নাকে মৃগনাভীর গন্ধ ভেসে আসে। “আমার বাবার রক্ষিতারা, অবশ্যই, আমার দূর্গে সাদরে আমন্ত্রিত।”
“আর সেই রক্ষিতার গর্ভে তার ঔরসজাত সন্তান?”
একটা বিরক্তিবোধ ক্ষণিকের জন্য বাবরকে আপুত করে। “অবশ্যই।” এই রোক্সানার সামান্য গোত্রপতির কন্যার কোনো অধিকার নেই তাকে এই প্রশ্ন করার। তার অস্তিত্বের কথা সে কেবল কয়েক সপ্তাহ আগে জানতে পেরেছে। কোনো দুর্বোধ্য কারণে তার মরহুম আব্বাজান তাকে দূর্গে নিয়ে না এসে তার নিজের লোকদের মাঝেই তাকে রেখেছিলেন। শিকারে গেলেই কেবল তিনি তার সাথে দেখা করতেন। রোক্সানার কথা তিনি কাউকে বলেননি। একথাও কখনও বলেননি, যে আট বছর আগে যখন তার বয়স চৌদ্দ বছরের বেশি কোনভাবেই না, তখন রোক্সানা তাকে একটি পুত্রসন্তান উপহার দিয়েছে, জাহাঙ্গীর।
তুষারপাত শেষ হবার ঠিক পরপরই, যখন রোক্সানার বাবা দূর্গে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন তখন কেউই অবিন্যস্ত দাড়িশোভিত মলিন গোত্রপতিকে ভালো করে লক্ষ্যই করেনি। সে তখন ভেড়ার চামড়ার কোটের ভেতরের পকেট থেকে বাবরের বাবার নিজের হাতে লেখা একটা চিঠি বের করে যেখানে তিনি রোক্সানাকে তার রক্ষিতা আর ছেলেকে নিজের বংশধর বলে স্বীকার করেছেন। সেখানে আরও লেখা আছে তার অকালমৃত্যু ঘটলে রোক্সানাকে যেন শাহী হারেমের নিরাপত্তায় নিয়ে আসা হয়।
খুতলাঘ নিগার কোনো উচ্চবাচ্য করে ব্যাপারটা মেনে নেন। তার স্বামীর অধিকার আছে যত ইচ্ছা রক্ষিতা রাখার আর বস্তুত তার স্ত্রীর সংখ্যা তিনজন। খুতলাঘ নিগার নিজে তো জানেন তিনিই ছিলেন তার ভালোবাসা, প্রতিদিনের সহচরী, তার উত্তরাধিকারী সন্তানের মাতা। পৃথিবীর আর কোনো দম্পতি তাদের শারীরিক আর মানসিক বন্ধনের জুড়ি হতে পারবে না। তাদের মিলনের আত্মিক অভিরূপ এমনই যে তাদের কেবল দুটি সন্তান বেঁচে আছে। রোক্সানা আর বাবরের সভাইয়ের অপ্রত্যাশিত আবির্ভাব তাকে মোটেই বিচলিত করেনি। আর তাই আম্মিজান যখন বাবরকে অনুরোধ করেন, সে অন্যসব অল্পবয়সী ছেলের মতই নিজের বাবা-মা’র প্রেমের বিষয়ে আলাপ করতে অস্বস্তি বোধ করে, আলোচনাটা সংক্ষিপ্ত করতে চায়। তাকে তার সন্তানকে নিয়ে আসতে দাও,” তিনি অবশেষে শীতল কণ্ঠে আলোচনা শেষ করেন। বাবর পরে খেয়াল করে দেখেছে যে খুতলাঘ নিগারের কামরার পাশেই রোক্সানার জন্য কামরা বরাদ্দ করা হয়েছে। অচেনা লোকদের মাঝে এসে উপস্থিত হওয়া নারীর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন? মোটেই না। তিনি তাকে কাছে রেখেছেন যেন তার উপরে লক্ষ্য রাখতে পারেন।
