“আমার আব্বাজান আর চাচাজান পরস্পরকে এত ঘৃণা করতো কেন? তারা রক্তসম্পর্কের ভাই।”
“সৎ-ভাই, ভিন্ন মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া এবং যে মুহূর্ত থেকে তারা বুঝতে পারে যে দু’জনেই একই জিনিস কামনা করে-তৈমূরের শহর, তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়। আপনার চাচাজান ছিলেন চার বছরের বড়। তিনি সমরকন্দ দখল করেন আর বাকি জীবনটা সেজন্য আপনার আব্বাজানকে বিব্রত করতে ব্যয় করেছেন। কিন্তু আপনার আব্বাজান এমন কিছু অর্জন করেছিলেন যেটা তিনি পারেননি। তার অসংখ্য স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও, এবং হেকিমের ভেষজ আর মালিশ ব্যবহার করেও তিনি একজন উত্তরাধিকারীর জন্ম দিতে ব্যর্থ হন যে তার অবর্তমানে মসনদে অধিষ্ঠিত হবে। অন্য কোনো কারণে না, কেবল এ জন্যই তিনি আপনার আব্বাজানকে ক্ষমা করতে পারেননি। এজন্যই তিনি আপনার কাছ থেকে ফারগানা ছিনিয়ে নেবার পায়তারা করেছিলেন। সম্ভবত আপনাকে জানে শেষ করে দেবারও অভিপ্রায় তার ছিল।”
বাবর মানসপটে চাচাজানের অগ্রসর হবার সংবাদে তার বিহ্বল আম্মিজানকে তীব্র যন্ত্রণায় কাঁদতে দেখে। চাচাজানের শত্রুতার আসল কারণ তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর সময়ে তার চাচাজান ভুল বুঝতে পারেন এবং তৈমূরের আংটি তাকে দিয়ে যান। এটা নিয়তির কারসাজি ছাড়া আর কি? সমরকন্দ শাসন করাই তার নিয়তি, এবং তার আব্বাজানের মত সারা জীবন নিজেকে হতাশার জালে জড়িয়ে রাখতে হবে না।
“সুলতান, ফিরে চলুন।”
বাবর বুনো উন্মত্ততায় ঘোড়া দাবড়ে গিয়ে এসব অনাহুত আগন্তুকদের মুখোমুখি হয়ে তার স্বপ্নে বাগড়া দেয়ার জন্য তাদের একটা চরম শিক্ষা দেয়ার অভিপ্রায় অনেক কষ্টে দমন করে। বিষণ্ণ চিত্তে সে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং কোলবা টিলার উপর থেকে বাড়ন্ত ঘাসের ঢিবির মধ্যে দিয়ে ওয়াজির খানকে অনুসরণ করে নিচে নেমে আসে।
শীঘ্রই তাবু টাঙানো হয় কিন্তু ধোঁয়ার গন্ধে সমতলে ছাউনি ফেলা লোকগুলো টের পেয়ে যাবে ভেবে গরম খাবারের বন্দোবস্ত করা হয় না। তাপমাত্রা হ্রাস পেতে বাবর কয়েক পরত ভারী ঝাঝালো গন্ধের ভেড়ার চামড়া গায়ে চাপিয়েও শীতে কাঁপতে থাকে। অবশেষে নিজের অজান্তে কখন যেন সে ঘুমিয়ে পড়ে তাকে ঝাঁকি দিয়ে কেউ তার তন্দ্রা ভাঙালে তার মনে হয় কয়েক মিনিট অতিক্রান্ত হয়েছে। “সুলতান, আমার কাছে সংবাদ আছে।” ওয়াজির খান তার পাশে হাঁটু ভেঙে বসে আছে। তার মুখের অভিব্যক্তিও অনেকটাই স্বাভাবিক। এমনকি সেখানে সামান্য হাসির আভাসও সে যেন দেখতে পায়। “আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে আমরা হৃদয় বিনিময়ের কোনো ঘটনায় বাগড়া দিয়েছি।”
“আপনি কি বোঝাতে চাইছেন?”
“পাঁচদিন আগে, কুনদুজের শাহজাদা, আপনার জ্ঞাতি ভাই মাহমুদ এখানে উপস্থিত হন। পুরো শহর না কেবল একটা মেয়েকে এখান নিয়ে যাবার অভিপ্রায় তার ছিল। সমরকন্দের বিশৃঙ্খলার ভিতরে সে ভেবেছিল নিঃশব্দে ভেতরে প্রবেশ করে তাকে খুঁজে বের করবে। মেয়েটা আর কেউ না প্রধান উজিরের কন্যা।”
“সে বসে আছে কেন?” বাবরের নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তার আম্মিজানের প্রিয় বোনের ছেলে মাহমুদকে শেষবার যখন দেখেছে তখন সে ছিল উচ্ছল, দুরন্ত একটা ছেলে, যার মুখে তখনও দাড়ি গজায়নি আর বাঁদরামির কারণে, যাকে প্রায়ই ঝামেলায় পড়তে হত। বাবর অন্ধের মত তার পেছনে ঘুরে বেড়াত। সেই মাহমুদ একটা মেয়ের জন্য বিরহে কাতর হয়ে মনোকষ্টে ভুগছে এই ধারণাটাই তার কাছে হাস্যকর মনে হয়।
ওয়াজির খানের মুখে আবার চিরাচরিত গম্ভীর অভিব্যক্তি ফিরে এসেছে। “আপনার ভাই শহরের প্রবেশ দ্বার রুদ্ধ দেখতে পেয়েছেন। প্রধান উজির নিজেকে সমরকন্দের সুলতান বলে ঘোষণা করেছে- শহর আর আশেপাশের পুরো এলাকার।
“সে এই অধিকার কিভাবে লাভ করলো?”
“কোনভাবেই না। তৈমূরের সাথে তার কোনো রক্তের সম্বন্ধ নেই। কিন্তু সে ক্ষমতাবান। কোষাগার তার নিয়ন্ত্রণে সে ইচ্ছা করলে যে কাউকে ঘুষ দিয়ে বশ করতে পারে।”
“কিন্তু তিনি যখন শুনবেন প্রয়াত সুলতানের ভাস্তে আমি এখানে এসেছি তিনি নিশ্চয়ই তার দাবি ত্যাগ করবেন। তিনি তার চারপাশের লোকদের উদ্দেশ্যে যতই মোহর বর্ষণ করুক আমার দাবি তার চেয়ে অনেক জোরাল।”
বাবরের কণ্ঠের বালকসুলভ ক্রোধ টের পেয়ে ওয়াজির খান আবার হেসে উঠে। “তিনি সংবাদ পেয়েছেন যে আপনি আসছেন কিন্তু তিনি ঘোষণা দিয়ে বসেছেন যে কোনো অনভিজ্ঞ কিশোরের হাতে তিনি মসনদ ছেড়ে দেবেন না। আর শাহজাদা মাহমুদের সাথেও নিজের মেয়ে বিয়ে দেবেন না। তিনি মনে মনে পরিকল্পনা করেছেন আপনার আরেক জ্ঞাতি ভাই- কাবুলের শাহজাদার সাথে তার মেয়ের বিয়ে দেবেন।”
“আমরা তাকে বিয়ে দেওয়াচ্ছি।” বাবর লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতে তার গায়ের ভেড়ার চামড়ার কম্বল ছিটকে যায়। “আমার ঘোড়া নিয়ে আসতে বলেন, আমি আমার ভাইয়ের শিবিরে যাব।”
আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে এমন সময় বাবর তার দেহরক্ষীদের সাথে নিয়ে, মাহমুদের ছাউনির দিকে এগিয়ে যায়, একটা কালো আলখাল্লায় তার আপাদমস্তক আবৃত।
“হুঁশিয়ার।” নির্জীব ধূসর আলোর পেছন থেকে এক সৈনিকের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। “নিজের পরিচয় দেন।”
