“তামবাল, ঠিকই বলেছে। রক্তের তৃষ্ণা নিবারন করে সাইবানি খান তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে এখন উত্তরের দিকে যাচ্ছে, জাল্লারটাস নদীর তীর বরাবর ফারগানা থেকে অনেকদূরে তাদের গন্তব্যস্থল। আমি রেকী করতে লোক পাঠাব। কিন্তু উজবেক নির্মমতা অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও এধরণের অভিযানের জন্য আমাদের সৈন্য সংখ্যা অপ্রতুল। আমাদের মিত্র দরকার, বেতনভোগী- আপনি যাদের বলেন, ভাড়াটে সৈন্য। পার্বত্য গোত্রগুলোকে আমাদের সাথে যোগ দেবার জন্য প্ররোচিত করতে হবে। আমরা যদি বেতন দেই তাহলে তারা আসবে, এবং তারা যদি আসে আমরা তাহলে আল্লাহ সহায় থাকলে নিশ্চয়ই বিজয়ী হব।”
বাবর এমনভাবে ওয়াজির খানের দিকে তাকায় যেন সে আগে কখনও তাকে দেখেনি। “আপনি হবেন আমার সর্বাধিনায়ক। যা প্রয়োজন বিনা দ্বিধায় সেটা সম্পন্ন করেন। আমরা দু’সপ্তাহ পরে রওয়ানা দেব।”
“সুলতান।” ওয়াজির খান মাথা নত করে।
***
শীতল ধরণীর বুকে ঘোড়ার খুর আঘাত করে, তারপরে আবার, যেন তাদের খুরের বোলই একমাত্র বাস্তবতা। বাবর ক্লান্তিতে টলতে থাকলে সে তার ঘোড়ার কেশর আঙ্গুল দিয়ে পেচিয়ে ধরে নিজেকে সামলে নেয়। আকশী দূর্গ ত্যাগ করার পরে, প্রতিদিন সে অগ্রগামী বাহিনীর সাথে রওয়ানা হয়েছে, তাবু, রান্নার সরঞ্জাম আর রসদবাহী, ভারবাহী পশুর দলকে ছেড়ে এবং প্রতিদিন রাতের বেলা আবার পশ্চাদবর্তী তাদের সাথে এসে যোগ দিয়েছে। চারদিন আগে তার পুরো বাহিনী ফারগানা অতিক্রম করে সমরকন্দের ভূমিতে প্রবেশ করেছে কিন্তু নিঃসঙ্গ কয়েকজন পশুপালক ছাড়া আর কারও দেখা তারা পায়নি।
বাবর উপরের দিকে তাকায়। এক ঘণ্টার ভিতরে সূর্য তাদের সামনে অস্ত যাবে কিন্তু তার আগেই পাহাড়ী গিরিপথ আর খরস্রোতা নদী অতিক্রম করে পশ্চিমে তাদের তিনশ মাইল পথ পরিক্রমা শেষ হবার কথা। সমরকন্দের অট্টালিকাসমূহের গম্বুজ নৈবেদ্যের মত তাদের সামনে অবারিত পড়ে রয়েছে। সম্ভবত আজ রাতেই সে তৈমূরের রাজধানী অধিকার করবে। বাবর মানসপটে দেখতে পায় নতুন তৈমূর বংশীয় সুলতান তাদের রক্ষা করতে উপস্থিত হয়েছে দেখতে পেয়ে শহরের কৃতজ্ঞ মানুষ তার চারপাশে এসে জড়ো হয়েছে।
ভাবনাটা মনে উদিত হতেই সে তার ঘোড়র পেটে খোঁচা দেয় এবং ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়া সত্ত্বেও, জন্তুটা ছিটকে সামনে এগোয়, একটা টিলার ঢাল বেয়ে উঠে যায়। সেখান থেকে কিছুটা দূরে জারাফশান নদীর টলটলে পানির ওপারে রোমাঞ্চকর আকাশের গায়ে আবছাভাবে ফুটে আছে সমরকন্দ। বাবর সম্মোহিতের ন্যায় তাকিয়ে থাকে। তার শ্বাস গলায় আটকে আসে। সম্ভবত, এই মুহূর্তের পূর্বে, সে বিশ্বাসই করতো না সমরকন্দ বলে সত্যি কিছু একটার অস্তিত্ব রয়েছে। এখন আর সন্দেহের অবকাশ নেই। কোনো উপকথার গল্প না, কোনো অশরীরি প্রেতাত্মার আনাগোনায় অতিষ্ট না, কেবল রক্ত মাংসের মানুষের বসবাস রয়েছে এখানে, যা সে নিজের বলে দাবি করতে এসেছে।
বাবর তার কণ্ঠ চিরে একটা উল্লসিত চিৎকার বের করতে চায় কিন্তু তার উল্লাস গলাতেই শুকিয়ে আসে। দক্ষিণে শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে সমরকন্দের প্রসিদ্ধ ফলের বাগানের পত্রহীন গাছ যা কয়েক সপ্তাহ আগেই সুগন্ধি আপেল আর ডালিমের ভারে নুয়ে ছিল সেখানে একটা অস্থায়ী ছাউনি দেখা যায়। হিম বাতাসে নিশান উড়তে দেখা যায় আর রান্নার জন্য তৈরি উনুন থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পেঁচিয়ে আকাশে উঠে যাচ্ছে। তাকিয়ে থাকার সময়েই বাবর দেখতে পায় অশ্বারোহী একটা বাহিনী ছাউনিতে দুলকি চালে প্রবেশ করেছে, বিভিন্ন তাবুর ভিতর দিয়ে তারা দক্ষতার সাথে বিচরণ করতে করতে এগিয়ে গেলে ট্রাম্পেটের ধাতব শব্দ তাদের স্বাগত জানায়।
তারমানে, তার সমস্ত ব্যগ্রতা সত্ত্বেও, সমরকন্দে প্রথমে পৌঁছান সম্ভাব্য সুলতানের কাতারে সে পড়ে না। কেউ একজন তার আগেই এসে হাজির হয়েছে। ছুরিকাহতের মত হতাশার একটা অনুভূতি তাকে বিদ্ধ করে।
ওয়াজির খান তার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং সামনের দৃশ্যাবলী দেখে সেও উচ্চস্বরে গাল বকছে। “সুলতান, আমি আমার অগ্রগামী সৈন্যদের পাঠাব।”
“সাইবানি খানের শিবির এটা?”
“আমার মনে হয় না। শিবিরটা যথেষ্ট বড় না। আর মনে হয় না যে শহর কেউ আক্রমণ করেছে বা অবরোধ করেছে, সাইবানি খান এখানে উপস্থিত থাকলে সে চুপ করে বসে থাকতো না।”
“তাহলে কে?”
“আমি জানি না। আমাদের আর সামনে এগোনো ঠিক হবে না। আমরা ঐ পাহাড়ের পাদদেশে ফিরে যাবো, সেখানে বাতাসের আড়ালে ছাউনি ফেলবো, আমাদের অস্তিত্ব কেউ টের পাবে না, আর আগামীকাল আমাদের মূল বাহিনীর এখানে পৌঁছাবার জন্য অপেক্ষা করবো।”
ওয়াজির খান বাবরের অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠা মূর্ত হতাশা ঠিকই বুঝতে পারে। “এই জায়গাটার নাম কোলবা টিলা, আশা আর স্বপ্নের মিলনস্থল। পাঁচ বছর আগে আপনার মরহুম আব্বাজানের সাথে, এখানে, এই স্থানে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম আমাদের পিছনে ছিল ফারগানার সেনাবাহিনী। সুলতান, আপনার মত তিনিও সমরকন্দের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এবং যা দেখেছিলেন সেটা তার হৃদয়ে শ্বাসরুদ্ধকর উচ্চাশা আর কামনার জন্ম দিয়েছিলো।”
“তারপরে কি হয়েছিলো?”
“সমরকন্দের সুলতান পশ্চিমে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলেন। আক্রমণের জন্য সময়টা ছিল নিখুঁত, কিন্তু আল্লাহ্র অভিপ্রায় বোঝা মুশকিল। সেদিন রাতেই আপনার আব্বাজান, যিনি এত তীব্র গতিতে ঘোড়া দাবড়ে এসেছিলেন যে তার শ্রেষ্ঠ ঘোড়াগুলোর একটা ক্লান্তির ধকল সামলাতে পারেনি, এমন ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হন যে হেকিমরা তাকে বাঁচাবার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলো। আমাদের সামনে ফিরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো গত্যন্তর ছিল না। আপনার আব্বাজান কষ্ট পেয়েছিলেন কিন্তু সেটাই ছিল তার নিয়তি।”
