“বাবর, ফারগানার সুলতান, যিনি তার ভাই কুন্দুজের শাহজাদা মাহমুদের, সাথে দেখা করতে ইচ্ছুক।”
নিরবতা, তারপরে বিড়বিড় আলোচনা, তারপরে একটা জ্বলন্ত মশাল উঁচু করে ধরতে চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠে। সৈন্যরা তার ছোট দলটা ঘিরে রাখতে বাবর হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে। অবশেষে সে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, সে শেষবার যেমন শুনেছিল তার চেয়ে এখন অনেক গম্ভীর হয়েছে কিন্তু আন্তরিকতা সেই আগের মতই আছে। “ভাই, তোমাকে স্বাগতম।” ঘাড় পর্যন্ত লম্বা কালো অবিন্যস্ত চুল, বাম হাতের দাস্তানায় একটা বাজপাখি নিয়ে মাহমুদ এগিয়ে এসে। ডানহাত দিয়ে বাবরের কাঁধ জড়িয়ে ধরে। “অসময়ে এসে ভোর বেলা বাজপাখি দিয়ে শিকারের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি খুশি হয়েছি তোমাকে দেখে।” সে একটা বিশাল বর্গাকার তাবুর দিকে ইশারা করে।
মাটিতে পুরু গালিচা পাতা এবং দেয়াল আর ছাদ কাপড়ের পর্দা দিয়ে আড়াল করা। মাহমুদ তার বাজপাখির চোখে ঠুলি পরিয়ে সোনালী দাঁড়ে বসিয়ে দেয়, আর নিজে মখমলের তাকিয়ার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাবরও তার দেখাদেখি একই কাজ করে। “তোমার আব্বাজানের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি দুঃখ পেয়েছি। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি মানুষ আর মহান যোদ্ধা। তার আত্মা শান্তি লাভ করুক। কুন্দুজে আমরা তার স্মরণে নিশ্চয়ই শোক পালন করেছি।”
“ধন্যবাদ।” বাবর মাথা নামিয়ে বলে।
“আর আমার খুদে ভাইটা এখন তাহলে সুলতান।”
“আপনি যেমন একদিন হবেন।”
মাহমুদ হাসে। “সত্যি।”
“কিন্তু আজ আপনার ভাবনা অন্য খাতে বইছে।”
মাহমুদের হাসি কান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। “বাবর, তুমি যদি তাকে দেখতে। রেশমের মত ত্বক, ধনুকের ছিলার মত টানটান দেহ আর প্রায় আমারই সমান লম্বা। আমি তাকে বেগম করবো। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছি আর সেটা ভঙ্গ করার কোনো অভিপ্রায় আমার নেই।”
“তোমাদের দেখা হয়েছিলো কোথায়?”
“সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা কোরো না- আমি মোটেই মেয়েদের ছদ্মবেশে উজিরের হারেমে গোপনে প্রবেশ করিনি। ব্যাপার হয়েছে কি, গত বছর তার বাবা সমরকন্দ থেকে কুন্দুজ আসছিলো রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নিয়ে তখন সে তার সাথে সফরসঙ্গী হিসাবে ছিলো। তারা আমাদের উত্তরের সীমান্ত দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে দস্যুদের কবলে পড়ে। আমি আমার সৈন্যদের নিয়ে যাচ্ছিলাম তাদের অভ্যর্থনা জানাতে। আক্রমণ যখন হয় আমরা নিকটেই ছিলাম। আমরা শোরগোলের শব্দ শুনে তাদের উদ্ধার করতে ছুটে যাই। আর তখনই আমি তাকে প্রথম দেখি- সে একটা পাথরের পেছন থেকে যার আড়ালে সে লুকিয়ে ছিল বের হয়ে আসে, তার নেকাব আর পরণের কাপড় অর্ধেকই ছেঁড়া…” মাহমুদ চুপ করে যায় সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য আবার কল্পনা করে।
“প্রধান উজিরের উচিত তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা।”
“সে তাই ছিল। কিন্তু কুন্দুজ কাবুলের মত সমৃদ্ধ না।” মাহমুদ কাঁধ ঝাঁকায়। “আর, ভাইটি তুমি কি জন্য এখানে এসেছো?”
“উচ্চাশা নেই এমন লোকের থেকে সাবধান।” বাবরের মনে তার আব্বাজানের এই কথাটা অনাদিষ্টভাবেই চকিতের জন্য উঁকি দেয়। কিন্তু যার উচ্চাশা আছে তার থেকেও কি সতর্ক থাকা উচিত নয়? মাহমুদ কি আসলেই এই সময়ে সমরকন্দ এসেছে কেবলই একটা মেয়ের জন্য, হোক না সে যতই রূপসী?
বাবর ঠিক করে সত্যি কথাই বলবে। “সমরকন্দের সুলতান যদিও আমার আব্বাজানের ভাই ছিলেন কিন্তু তিনি মোটেই ফারগানার মিত্র ছিলেন না আর আমাকে মসনদ চ্যুত করার ব্যবস্থা প্রায় পাকা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু পথে মৃত্যু বরণ করার সময়ে তিনি তার লোকদের আদেশ দিয়ে যায় এটা আমার কাছে পৌঁছে দেবার জন্য।” বাবর তার হাত প্রসারিত করে দেখায়। তার অনামিকায় তৈমূরের অঙ্গুরীয়, এখন আর তাতে রক্তের দাগ লেগে নেই, শোভা পাচ্ছে। আংটিটা তার হাতে সামান্য বড় হলেও সে লাল রেশমের সুতো দিয়ে ব্যাপারটা আপাতত সামলে নিয়েছে। জ্বলন্ত কাঠ কয়লার কুলঙ্গি থেকে ভেসে আসা আলোয় আংটিটা দ্যুতি ছড়ায় আর সে শুনতে পায় মাহমুদ জোরে শ্বাস নেয়।
“তুমি বিশ্বাস কর যে তুমিই তৈমূরের উত্তরাধিকারী?”
“আমার ধমনীতে তার রক্ত বইছে। আমি আমার শহর ঠিকই আদায় করে নেব।”
“আমার ধমনীতেও তার রক্তই বইছে,” মাহমুদ মৃদু কণ্ঠে বলে। তারা পরস্পরের চোখের দিকে তাকায় আর সহসা যেন দুজনের চোখ থেকেই সব বালখিল্যতা উধাও হয়ে যায়। বাবর কৃতজ্ঞ বোধ করে যে তার খঞ্জরটা দামী রত্নখচিত খাপসহ তার কোমরের বেগুনী পরিকরের ভেতরে গোজা রয়েছে বলে।
“দুশ্চিন্তা কোরো না, খুদে ভাইটি- যদিও সম্ভবত তোমাকে আর খুদে বলার অবকাশ নেই। নেকড়ে মায়ের মুখের অনুভূতির মতই কিছু একটা আমি দেখছি যার শাবক সামান্য আগেই আমার হাতে খুন হয়েছে।” মাহমুদ আবার হাসতে শুরু করে। “এটা সত্যি যে আমি সমরকন্দে এসেছিলাম কারণ মনে হয়েছিলো শহরটায় একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। কিন্তু আমার ছাউনি ভালো করে দেখো আমার সাথে একশোর বেশি লোক নেই। শহর অবরোধের কোনো অভিপ্রায় আমার ছিল না, আমি এসেছিলাম আচমকা হামলা চালিয়ে কিছু সম্পদ বাগিয়ে নেয়া আর এখানের আগুন প্রশমিত করতে।” সে একটা ভেংচি কেটে দুপায়ের ফাঁকে উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ভঙ্গিতে হাত বুলায়।
