“আর আমার চাচাজান?”
“আক্রমণ আরম্ভ হবার সময়ে তিনি নদীর তীরে তার লাল রঙের তাবুতে অবস্থান করছিলেন। তিনি সেখান থেকে কোনমতে ঘোড়ায় চেপে শত্রুর মোকাবেলা করতে এগিয়ে আসেন কিন্তু কোথা থেকে একটা তীর এসে তার গলা বিদ্ধ করতে তিনি মাটিতে পড়ে গিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন। আমরা তাকে ঘোড়ার খুরের আওতা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসি বটে, কিন্তু হেকিম বৈদ্যদের ডেকে কোনো লাভ হয়নি- হেকিমের কিছুই করার ছিল না। তারা রক্তপাতই বন্ধ করতে পারেনি। কয়েক ঘণ্টার ভিতরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। খবরটা আমাদের লোকদের ভিতরে ছড়িয়ে পড়তে কোনো কোনো গোত্রপতি, অনাগত আশঙ্কায় নিজেদের লোকদের ডেকে নিয়ে গ্রামে ফিরে গেছে।” ক্ষোভে বাইসানগারের কণ্ঠস্বর তিক্ত শোনায়।
“আর তোমরা কেন এখানে এসেছো?”
“আপনার চাচাজানের অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করতে। ফারগানার জন্য লোভ করার কারণেই আল্লাহতালা তাকে শাস্তি দিয়েছে। গলায় জমে থাকা রক্তের বুদবুদের ভিতর দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস নেবার তিনি আপনার কাছে করুণা ভিক্ষা চেয়েছেন যাতে বেহেশতের উদ্যানে প্রশান্তিতে বিশ্রাম নিতে পারেন।”
বাবর ভাবে, আমি যে চাচাজানকে চিনি মোটেই তার মত আচরণ না, কিন্তু হয়ত মৃত্যু সন্নিকটে উপস্থিত বুঝতে পারলে মানুষ বদলে যায়।
“তুমি যা বলছে তার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ তোমার কাছে আছে?” ওয়াজির খানের এক চোখে এখন জ্বলজ্বল করছে সন্দেহ এবং বাবর এবার খেয়াল করে সে তার লোকদের এখনও সরে দাঁড়াবার নির্দেশ দেয়নি। বাইসানগারের দিকে তার তিনজন সৈন্য এখনও ধনুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে।
“এই আমার প্রমাণ।” বাইসানগার তার আঁটসাট চামড়ার জ্যাকেটের গভীরে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট, দাগযুক্ত থলে বের করে। থলেটার গলার কাছের বেণী করা দড়ির ফাঁস আলগা করে সে ভেতর থেকে একটা কাপড়ের টুকরো বের করে আনে। যত্নের সাথে, শ্রদ্ধাবনত চিত্তে, সে কাপড়ের ভাঁজ খুলতে ভেতরের বস্তু দৃশ্যমান হয়: রক্তে রঞ্জিত একটা সোনার বেশ ভারী আংটি।
বাইসানগার আংটিটা বাড়িয়ে ধরলে বাবরের দম আটকে আসতে চায়। “দেখেন,” প্রায় ফিসফিস কণ্ঠে বাইসানগার বলে, “মহান তৈমূরের অঙ্গুরীয়।” হলুদ ধাতুর উপর খোদাই করা ক্রুদ্ধ বাঘটা এখনই বুঝি গর্জে উঠে লেজ ঝাপটাবে।
***
যুদ্ধকালীন মন্ত্রণা পরিষদের মেজাজ এবার একেবারেই আলাদা। বাবর, একপাশে উজির আর অন্যপাশে ওয়াজির খান পরিবেষ্টিত হয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে, ভেতরে অবস্থানরত গোত্রপতিদের ঘটনাবলীর অসাধারণ পরিণতি নিয়ে উচ্চকণ্ঠে আলাপ করতে শোনে।
“সুলতান, নিয়তির লিখন পরিষ্কার।” তামবালের চোখ উত্তেজনায় চকচক করে। “সুলতান আপনাকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে গিয়েছেন তার কোনো পুত্র সন্ত নি ছিল না। অন্যরা সমরকন্দ দখল করতে চাইবে, কিন্তু আমরা যদি একটু তৎপরতা দেখাই তাহলে সেটা আপনার নিজের রাজত্ব হতে পারে।”
বাবর চেষ্টা করেও মুখে বিড়ম্বনার হাসি ফুটে উঠা ঠেকাতে পারে না। আর উজবেকদের কি হবে? কয়েকদিন আগেই আমরা তাদের সম্পর্কে আতঙ্কে ছিলাম। আর তোমাদের কথাই ফলেছে তারা আমার চাচাজানকে বেঘোরে মেরেছে, তার সৈন্যবাহিনী তছনছ করে দিয়েছে, তার রসদের বহর কুক্ষিগত করেছে। এখন তারাও যদি সমরকন্দ দখলের পায়তারা করে?”
“কিন্তু এখন প্রায় শরৎ কাল। মৌসুম আমাদের পরম বান্ধব। প্রতিবছর একই ঘটনা ঘুরে ফিরে ঘটে। প্রতিবার শীতের সময়ে সাইবানি খান উত্তরে তুর্কিস্তানের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যায় আর বরফ না গলা পর্যন্ত সেখানেই থাকে।”
“আলি মজিদ বেগ, আপনার কি অভিমত?” কিন্তু বাবর ইতিমধ্যেই তার উত্তরটা জেনে ফেলেছে। লোকটার পুরো দেহ থেকে ইতিমধ্যে উচ্ছ্বাস এবং আত্মবিশ্বাস চুঁইয়ে পড়তে শুরু করেছে। সম্ভাব্য গৌরব আর গনিমতের মালের কথা চিন্তা করে তার চোখে উজ্জ্বল দীপ্তি ফুটে উঠেছে। সমরকন্দ ধনী সমৃদ্ধ শহর ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা এটা ছিল তৈমূরের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। তৈমূরের বংশোদ্ভূত প্রতিটা শাহজাদা আর অভিজাত ব্যক্তি সেখানে নিজের উপস্থিতি কামনা করে। বাবরও এর ব্যতিক্রম না। বয়স তার এখনও যদিও অল্প কিন্তু নিয়তি তাকে এমন একটা সুযোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে যা হয়ত জীবনে দ্বিতীয়বার সে পাবে না। সে দীর্ঘজীবন কামনা করে না বা রেশমের তাকিয়ায় শুয়ে কি সুযোগ হেলায় হারিয়েছে সেটা ভেবে শান্তিতে মরতেও চায় না। মনে কোনো খেদ নিয়ে সে বেহেশতে যেতে চায় না।
আলি মজিদ বেগ তাকে নিরাশ করে না। “আমি বলি কি শীত আসবার আগেই আমাদের রওয়ানা দেয়া উচিত।”
“আর ওয়াজির খান, আপনি কি বলেন?”
তার সাথে পরিকল্পনা আলোচনার সময় এখন বাবরের হাতে নেই। সে কি তার শরীরে ভীষণভাবে আলোড়ন তোলা উত্তেজনা যা তাকে রীতিমত কাঁপিয়ে তুলেছে তা প্রশমিত করতে কিছু বলবে? ওয়াজির খান তার একমাত্র চোখ দিয়ে বাবরের দিকে ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বাবর ভাবে এই শুরু করলো শীতল যুক্তির বিন্যাস, আমার উত্তেজনা প্রশমিত করার অভিপ্রায়ে। সে আমাকে বলবে আমার বয়স অল্প নিজের রাজত্ব বজায় রাখা এক কথা আর আরেকটা রাজ্য দখল করা একেবারেই আলাদা কথা। সে আমাকে বলবে অপেক্ষা করেন, আমাকে বলবে অভিজ্ঞতাকে অবশ্যই সাহস, ধৈৰ্য্য আর উচ্চাশার সাথে সমন্বিত করতে হবে।
