“কি?” আফিমের নেশায় বুদ, সে বাবুরীর কথা প্রথমে বুঝতে পারে না।
“আমরা পানির ভিতরে আটকে পড়েছি। পুরো নদী একটা হ্রদের রূপ নিয়েছে। আমাদের দ্রুত এই এলাকা ত্যাগ করতে হবে।”
আলমগীর তুলে নিয়ে সেটা কোমরে বাঁধতে বাঁধতে বাবর তাঁবুর বাইরে বের হয়ে আসে এবং চোখের সামনে যা দেখে তার সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়: পুরো শিবির ইতিমধ্যে এক ফিট ঘোলা পানিতে তলিয়ে গিয়েছে। চারদিক থেকে তার সেনাপতিরা পানি ভেঙে অনেক কষ্ট করে তার তাঁবুর দিকে এগিয়ে আসছে, আদেশের জন্য তাকিয়ে রয়েছে।
তার আফিমের নেশা এক লহমায় ছুটে যায়। “তাঁবু পরিত্যাগ করো এবং ভারী জিনিসপত্রও নেবার দরকার নেই। ঘোড়া আর মানুষদের উচ্চভূমিতে সরে যেতে বলো।” বৃষ্টির অঝোর ধারার মাঝে এত জোরে বৃষ্টি পড়ছে যে সূচের মত বিদ্ধ করে- সে তাদের পেছনে অবস্থিত নিচু টিলা দেখতে পায়। “তোমরা যতোগুলো সম্ভব মাস্কেটের বাক্স আর বারুদের থলি সাথে নিয়ে যাও। কামানগুলো নিয়ে ব্যস্ত হবার দরকার নেই- পানি তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। মালবাহী পশুগুলোর বাঁধন খুলে দাও। তারা নিজেরা বাঁচার পথ খুঁজে নেবে, ছাউনির সবাইকে এই একই কথা বলে দাও…আমাদের হাতে সময় খুব অল্প।”
বাবর অঝোর বৃষ্টির ভিতরে তার পরিচারকদের বলে তার আর বাবুরীর ঘোড়া নিয়ে আসতে। ক্রমশ বাড়তে থাকা পানির ভিতর দিয়ে তারা একসাথে ঘোড়া চালিয়ে যায়। লোকদের উৎসাহ দেয় সাধ্যমত যা কিছু পারে বাঁচাতে। কিন্তু তারপরে পানি ততোক্ষণে রেকাব স্পর্শ করেছে। তারা টিলার দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে। তাদের ভীতসন্ত্রস্ত ঘোড়া দু’টি, পানিতে প্রথমে আধা সাঁতারের ভঙ্গিতে ছটফট করে। বাবর আর বাবুরী তাদের কাঁধের উপরে ঝুঁকে এসে আলতো করে চাপড় দিয়ে কানে ফিসফিস করে সাহস জোগায়। শিবির থেকে ভেসে আসা নানা জিনিস তাদের চারপাশে ভাসতে থাকে-রান্নার পাত্র, ঘোড়ায় চড়ার জুতা, মৃত ভেড়া আর মুরগী। তারা অবশেষে যখন উঁচু জায়গায় পৌঁছে দেখে তার অধিকাংশ অশ্বারোহী আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছে। তাদের কেউ কেউ আবার নিজেদের সাথে অন্যদেরও নিয়ে এসেছে- নারী আর শিশুর দল গাছের নিচে পানিতে ভিজে চুপচুপে অবস্থায় তারা বসে আছে।
সকাল নাগাদ বৃষ্টি থেমে যায় এবং কয়েক ঘণ্টার ভিতরে বাণের জলও নেমে যায়। বাবর চোখ বন্ধ করে, শোকরানা জানায়। তার পুরো সেনাবাহিনীই বলা যায় অক্ষত রয়েছে। পানি নেমে যাওয়া মাত্র তারা শিবিরে ফিরে গিয়ে ফেলে আসা যা কিছু উদ্ধার করা যায় তার চেষ্টা করবে- কামানগুলো, তাদের বর্ম, অস্ত্রশস্ত্র, তাঁবুগুলো আর যা কিছু খাবার যোগ্য আছে। তারপরে মালবাহী পশুগুলোকে তাড়িয়ে আনতে হবে। হিন্দুস্তান বিজয় সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আফিম আর না। তার রোদে পোড়া গলায় একটা মশা গুনগুন করতে করতে এসে বসলে বাবর বিরক্ত হয় এবং এক চাপড়ে সেটা থেবড়ে দিলে রক্তের দাগ গলায় লেগে থাকে তার নিজের রক্ত। কিন্তু শীঘ্রই অন্যদের রক্তপাত শুরু হবে। শাহী জ্যোতিষের সাহায্য লাগবে না সেটা বোঝার জন্য। প্রথমে ফিরোজ খান তারপরে তাকে দিল্লী যেতে যারা বাধা দিতে চায়, তাদের সবাইকে রক্ত দিয়ে মূল্য শোধ করতে হবে। তার সামনে কেউ বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।
৪.৩ পানিপথ
২২. পানিপথ
দিল্লীর উত্তর-পশ্চিমের সমভূমিতে পানিপথের ছোট গ্রামটার কাছে বাবর তার বাহিনী নিয়ে দুদিন আগে শিবির স্থাপন করার সময়ে তার লোকেরা শিবিরের ঠিক মাঝখানে তার বিশাল লাল রঙের নিয়ন্ত্রক তাঁবুটা স্থাপন করেছে। বাবর আর তার চারপাশে সমবেত সামরিক পর্ষদের সদস্যদের এপ্রিল মাসের তীব্র দাবদাহের হাত থেকে তাবুটা সামান্যই স্বস্তি দান করতে পারছে। তাবুর পর্দা টেনে দেয়া হলে ভেতরের পরিবেশ নিমেষেই শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠে। চামড়ার দড়ি দিয়ে বেঁধে পর্দা সরিয়ে দেয়া হলে তীব্র বাতাসের সাথে বয়ে আসা ধূলিকণা চোখে খোঁচা দিয়ে নাকে গুতো মেরে নিমেষেই অস্থির করে তোলে। বাতাসের গতি রোধ করতে তাবু থেকে কয়েক গজ দূরে স্থাপিত মোটা খয়েরী চাদরের বেড়া দিয়ে পরিবেশের সামান্যই উন্নতি হয়।
বাতাসের দিকে পিঠ দিয়ে বাবর তার নির্ধারিত সোনার গিল্টি করা আসনে উপবিষ্ট। স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন লেবুর সাথে পানি এবং পাহাড় থেকে নামবার সময়ে যত্নের সাথে সংরক্ষণ করে নিয়ে আসা বরফের বেঁচে থাকা অংশের কিছুটা মিশিয়ে তৈরি শরবতে চুমুক দেয়। বাবুরী বাবরের বামপাশে আসনপিড়ি হয়ে শরবতের পেয়ালা হাতে বসে আছে এবং প্রতিবার চুমুক দেবার আগে ধূলোর হাত থেকে বাঁচতে মুখের নিম্নাংশে সে যে পাতলা হলুদ কাপড়ের গালপাট্টা বেঁধে রেখেছে সেটা সাবধানে তুলে ধরে।
আঠারতম জন্মদিন পালনের মাত্র একমাস পরে হুমায়ূন তার বাবার ডানপাশে বসবার জন্য একটা টুল পেয়েছে। পাতলা তুলো দিয়ে তৈরি সুতির সবুজ রঙের কাপড়ে তৈরি একটা জোব্বা আর একই কাপড়ের তৈরি ঢোলা চোগা তার পরনে। তাঁবুতে উপস্থিত আরো অনেক সেনাপতিদের মতো তার মাথার উপরেও ময়ূরের পালকের তৈরি একটা বিশাল টানা পাখা, কোমর পর্যন্ত নগ্ন। কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে টানতে থাকা পরিচারকের দল, অনবরত বাতাস করছে। “বাবুরী, আমাদের গুপ্তদূতেরা সুলতান ইবরাহিমের সেনাবাহিনীর অগ্রসর হবার কি খবর নিয়ে এসেছে?”
