নদীর অপর পাড়ে পৌঁছানো মাত্র, বাবর একটা ছোট তাবু স্থাপন করার আদেশ দেয়। সে তাঁবুর ভেতরে একলা প্রবেশ করে এবং পর্দা টেনে বেঁধে দেয়। তারপরে সে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে এবং মাটিতে সেজদার ভঙ্গিতে অনেকক্ষণ মাথা ঠেকিয়ে রাখে। “আমি একবার তোমার আনুগত্য দাবি করেছিলাম এবং আমি আরো একবার সেই দাবি নিয়ে এসেছি।” সে ফিসফিস করে বলে। “আমি তৈমূরের দিব্যি, আমার আর আমার বংশধরদের দিব্যি দিয়ে বলছি এই মাটি আমি চাই।” সে গলায় চেনের সাথে ঝোলানো একটা আকিক পাথরের তাবিজ হাতে নিয়ে সেটার মুখটা খুলে এবং কোমর থেকে খঞ্জরটা বের করে সেটার ডগা দিয়ে খুব সাবধানে সামান্য পরিমাণ মাটি তুলে নিয়ে ভেতরে রাখে। তারপরে তাবিজের মুখটা ভালো করে বন্ধ করে সে আবার তার জোব্বার ভিতরে বুকের কাছে ঝুলিয়ে রাখে।
*
ফেব্রুয়ারি মাসের কোনো একদিন সন্ধ্যাবেলা, বাবরের স্থাপিত ছাউনির পাশ দিয়ে হলুদাভ একটা আভার জন্ম দিয়ে শতদ্রু নদী বয়ে চলে। হিন্দুস্তানের উত্তর-পশ্চিম অংশের সমভূমি আর সুলতান ইবরাহিম লোদির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর দিল্লীর মাঝে এটাই শেষ বড় নদী। বাবর ভাবে, এই পর্যন্ত তারা দ্রুতই অগ্রসর হয়েছে বলতে হবে। সিন্ধু নদ অতিক্রমের পরে, শীতের সেই ঝিরঝির বৃষ্টি তাদের কিছু দিন ভালোই ভুগিয়েছে। নরম মাটিতে ঘোড়া আর মালবাহী পশুগুলোর বিশেষ করে কামান বহনকারী ষাঁড়গুলোর বেশ কষ্ট হয়েছে সামনে এগিয়ে যেতে। কিন্তু তারপরে একটা সময়ে বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়েছে এবং তারাও সিন্ধুর বিভিন্ন শাখানদী অতিক্রম করে সাবলীল ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে গিয়েছে।
এতোদিন পর্যন্ত কেবল বন্য, আইন অমান্যকারী উপজাতির সাথেই তাদের সংঘর্ষ হয়েছে। একটা উপজাতি- গুজর- পাহাড়ের উপর থেকে নেমে এসে বাবরের লোকদের আক্রমণ করেছিলো যখন তারা একটা সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রমে ব্যস্ত সেই সময়ে। কিন্তু তার পশ্চাতে অবস্থিত প্রহরীর দল তাদের একেবারে দাঁতভাঙা জবার দিয়েছে। গুজরদের কর্তিত মাথার একটা বেশ দর্শনীয় স্তূপ কার্যকরী প্রতিষেধকের কাজ করেছে এবং অন্য কোনো উপজাতি ভুলেও আর এদিকে নাক গলাতে আসেনি। একবার শত অতিক্রম করলে, পুরো ব্যাপারটা তখন একটা ভিন্ন মাত্রা গ্রহণ করবে। তারা তখন ইবরাহিম লোদীর শক্তিশালী সামন্ত রাজাদের অঞ্চলে প্রবেশ করবে। কয়েকদিন আগে সে নদীর অপর পাড়ে তাদেরই একজনকে ফিরোজ খান- দূতের হাতে চরমপত্র দিয়ে পাঠিয়েছিলো। দিল্লী যেতে হলে তার ভূখণ্ডের উপর দিয়েই যেতে হবে: “আপনার এলাকা এক সময়ে তৈমূরের সাম্রাজ্যের অংশ ছিলো এবং আমি আমার জন্মগত, ন্যায়সঙ্গত অধিকার দাবি করছি। আত্মসমর্পণ করে আমার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। আপনি তাহলে আমার অধীনস্ত সামন্ত রাজা হিসাবে নিজের শাসন বজায় রাখতে পারেন এবং আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি কোনো ক্ষয়ক্ষতির শিকার আপনার রাজ্য হবে না।”
রাজাটা এর উত্তরে তাকে একটা ধূসর বাদামী রঙের মর্দা ঘোড়া আর সাথে একটা বার্তা পাঠায়: “আপনার দাবি কৃত্রিম। আমি দিল্লীর সুলতান ইবরাহিম লোদীর অনুগত, যিনি হিন্দুস্তানের ন্যায়সঙ্গত সম্রাট। নিজের ভূখণ্ড ছেড়ে এতোদূর ভ্রমণ করার কারণে বোধহয় আপনার ঘোড়া দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমার পাঠানো এই ঘোড়াটা আপনাকে দ্রুত কাবুলে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।” বাবর লোকটার ঔদ্ধত্য দেখে কেবল হেসেছে আর ঘোড়াটা বাবুরীকে দিয়ে দিয়েছে।
বাবর তার সেনাপতির তাঁবুর দিকে হেঁটে যাবার সময়ে ভাবে, ফিরোজ শাহ নিজের অবিমৃষ্যকারীতার জন্য পস্তাবে। ফিরোজ খানের শক্তঘাঁটির উদ্দেশ্যে মূল বাহিনী এগিয়ে যাবার আগে শতদ্রর ওপাড়ের এলাকাটা গোপনে রেকী করার জন্য হুমায়ূন তার বদখশান যাযাবর বাহিনীর একটা ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে যেতে চাইলে বাবর অনুমতি দেয়। আল্লাহ সহায় থাকলে, শীঘ্রই নদী অতিক্রম করার পরে ছেলের সাথে তার দেখা হবে এবং ফিরোজ খানকে এমন কিছু অস্ত্র দেখাবে যা সে তার জীবনেও দেখেনি… সে নিজের তাঁবুতে অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করতে থাকে। সে ভালো করেই জানে তার বহু প্রতিক্ষিত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভাগ্য খুব শীঘ্রই নিষ্পত্তি হবে। মাঝরাতের দিকে, সে তার পরিচারককে আফিম মেশানো সুরা নিয়ে আসতে বলে। এটা তার অস্থিরতা প্রশমিত করবে। এমনকি সে একটু ঘুমিয়েও নিতে পারে- যা। কিছু দিন যাবত তার কাছে অধরা হয়ে উঠেছে।
কড়া পানীয়টা তার ক্রিয়া শুরু করে এবং বাবরের মতো প্রশান্তির রাজ্যে বিচরণ করতে থাকে…সে বলতে পারবে না কতক্ষণ সময় সে ঘোরের ভিতরে ছিলো। যখন সহসা তার স্বপ্নে বজ্রপাতের ধ্বনি এসে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিতে চায়। দিনটা বেশ গরম আর স্যাঁতস্যাঁতে। বৃষ্টি হলেই সম্ভবত এই গুমোট ভাবটা কাটবে। শীঘ্রই ভারী বৃষ্টি তার তাঁবুর ছাদে ঢাক বাজাতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পরে, চামড়ার মাঝের সেলাই দিয়ে চুঁইয়ে পানি পড়তে থাকে। সে গুনতে শুরু করে- এক, দুই, তিন, ঝপাস…এই, দুই, তিন, ঝপাস… তার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসতে চায়। এমন সময় বাবুরীর কণ্ঠস্বর সে শুনতে পায় এবং টের পায় কেউ তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে জাগাতে চাইছে। “নদীর তীর পানিতে উপচে পড়ছে! পুরো শিবির পানিতে সয়লাব হয়ে গিয়েছে।”
