“তারা এখনও আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে কিন্তু বড় গদাইলস্করী চালে। একদিন অন্তর তারা তাঁবু গুটিয়ে নেয় কিন্তু তারপরেই পাঁচ কি ছয় মাইল পরে আবার শিবির স্থাপন করে। যার একটা কারণ হতে পারে তাদের মালপত্রের বিপুল পরিমাণ। কিন্তু আমার মনে হয় তারা আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করতে খুব একটা ইচ্ছুক না। তাদের ইচ্ছা আমরা আমাদের রসদপত্র সব শেষ করে ফেলি কিংবা অস্থির হয়ে উঠে নিজেরাই তাদের আগে আক্রমণ করার নির্বুদ্ধিতা দেখাই।”
“আমি আশা করি সেরকম কোনো সম্ভাবনা নেই। আমরা তাদের প্রথমে আক্রমণ করতে প্ররোচিত করবো, যাতে কামান আর মাস্কেট দিয়ে সুরক্ষিত অবস্থান থেকে তাদের উপরে পাল্টা আক্রমণ করা যায়। আর তাদের সংখ্যাধিকের সুবিধা যতোটা সম্ভব হ্রাস করা যায়। আচ্ছা আলোচনা যখন হচ্ছে, তাদের সর্বশেষ লোকবলের পরিমান কত?” বাবর শরবতের গ্লাস নামিয়ে রেখে জানতে চায়।
“প্রায় এক লক্ষ- সত্তর হাজার অশ্বারোহী আর বাকি পদাতিক। পদাতিক সৈন্যরা যতোটা না লুটপাটে আগ্রহী, যুদ্ধ করতে ততোটা নয়। আর তাদের রণহস্তির কথা ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের চরেরা বলেছে প্রায় এক হাজার হবে তাদের সংখ্যা, একেকটা পাহাড়ের মতো পাকাঁপোক্ত। সবগুলোই যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত আর বর্ম দ্বারা আবৃত। এদের নিয়েই আসল দুশ্চিন্তা। আমরা রক্ষণাত্মক অবস্থানে থাকলেও, আমাদের কাছাকাছি আসবার আগেই তাদের হামলা আমাদের প্রতিহত করতে হবে। অন্যথায়, তারা যদি আমাদের ভিতরে একবার এসে উপস্থিত হতে পারে, তাদের সামলে রাখাই তখন আমাদের লোকদের মুশকিল হয়ে পড়বে। আমাদের বেশিরভাগ লোকই জীবনে কখনও হাতি কি জিনিস দেখেনি, তার সাথে লড়াই করা তো দূরের কথা-”।
“আমরা কামানের সাহায্য নেবো, হুমায়ূন কথার মাঝে বলে উঠে।
“হ্যাঁ, কিন্তু আমরা যদি গোলাবর্ষণের পরে তাদের পুনরায় প্রস্তুত করতে চাইলে আর যুদ্ধক্ষেত্রে এর প্রভাব ফেলতে চাইলে কামানগুলোকেও আমাদের আগলে রাখতে হবে। কয়েক পশলা গোলা বর্ষণের পরেই যেনো সেগুলো বেহাত হয়ে না যায়।”
“নিরাপত্তার জন্য আমাদের ছাউনির ঠিক মাঝখানে, যেমন এই তাঁবুটা স্থাপন করা হয়েছে আমরা কামানগুলোকেও তেমনিভাবে আমাদের সমরসজ্জার একেবারে কেন্দ্রস্থলে স্থাপিত করতে পারি।” হুমায়ূন বলতে চেষ্টা করে।
“কিন্তু গোলা বর্ষণের জন্য পরিষ্কার নিশানা পথ প্রয়োজন…” বাবুরীও বলতে থাকে।
“আমার কথা শোনো।” বাবর বাবুরী আর হুমায়ূনকে ইঙ্গিতে চুপ করতে বলে। “বাবুরী তোমার সেই বৃদ্ধার কথা মনে আছে- রেহানা- বহু বছর আগে আমাদের কি বলেছিলো, যখন আমাদের বয়স হুমায়ুনের এখনকার বয়সের মতোই ছিলো, তৈমূরের দিল্লী বিজয়ের কৌশল সম্পর্কে? গত রাতে আমি আমাদের যুদ্ধ পরিকল্পনা আর আমার মহান পূর্বপুরুষ এমন পরিস্থিতিতে কি করতেন ভাবতে গিয়ে আমার রেহানার কথা মনে পড়ে এবং আমার সৌভাগ্য বলতে হবে আমি তার ভাষ্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলাম এবং আজও আমি যেখানে গুরুত্বপূর্ণ শাহী দস্তাবেজসমূহ আর আমার রোজনামচা রাখি সেই সিন্দুকে রাখা আছে…।
“সেটা আবার পড়তে গিয়ে আমি সেখানে হাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল কৌশল খুঁজে পেয়েছি। তৈমূর পরিখা খনন করেছিলেন এবং সেই মাটি দিয়ে তার সৈন্যবাহিনীর সামনে মাটির গড় নির্মাণ করেছিলেন। তারপরে তিনি গাড়ি টানার বলদগুলোকে দড়ি দিয়ে বেঁধে আরেকপ্রস্থ নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ করেন। আমি ভেবেছি আমরাও পরিখা খনন করে সেই মাটি দিয়ে বেষ্টনী তৈরি করবো। কিন্তু গাড়ি টানার বলদগুলোকে না বেঁধে মালবহনের গাড়িগুলোকে দড়ি দিয়ে পরস্পরের সাথে বেঁধে দেবো। তবে মাঝে মাঝে ফাঁক থাকবে যেখানে দিয়ে আমাদের কামানগুলো তোমার পরামর্শ অনুযায়ী স্থাপন করা হবে, আমাদের অবস্থানের কেন্দ্রে গোলাবর্ষণ করতে পারবে। আর আমাদের অশ্বারোহী বাহিনীও প্রয়োজনের সময়ে হামলা করতে পারবে। এই মালবাহী গাড়ির মধ্যবর্তী শূন্যস্থানগুলো রক্ষা করার জন্য আমরা আমাদের কিছু মাস্কেটধারী সৈন্য আর অশ্বারোহী তীরন্দাজদের মোতায়েন করবো। ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে তারা তীর আর গুলিবর্ষণ করবে।”
সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় কিন্তু বাবুরী সন্তুষ্ট হয় না। “সবই বুঝলাম, কিন্তু আপনি কিভাবে নিশ্চিত হবেন যে ব্যাটারা আমাদের আক্রমণ করবেই। আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে আমাদের পিছু হটতে বাধ্য করার পরিবর্তে।”
“আমরা একবার আমাদের অবস্থান সুসংহত করি। তারপরে কয়েকদিন অপেক্ষা করার পরে তারা যদি আক্রমণ না করে তবে তখন আমরা তাদের প্ররোচিত করবো। আমরা দু’পাশ থেকে তাদের শিবির বা সেখানের কোষাগার লক্ষ্য করে আপাত ভঙ্গিতে অগ্রসর হবো- তারচেয়েও ভালো হয়- সীমিত পরিসরে আক্রমণ করে তারপরে পিছিয়ে আসবার ভান করলে। আমরা তাদের ভাবতে বাধ্য করবো যে তারা আমাদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে এবং এখন পাল্টা আক্রমণ করলে তারা অনায়াসে বিজয়ী হবে…”
*
পরবর্তী কয়েকটা দিন। বাবরের সৈন্যরা, ভোরের শীতল পরিবেশে কাজ আরম্ভ করে, দিনের উষ্ণতম অংশটায় এক নাগাড়ে কাজ করতে থাকে। যখন দাবদাহের কারণে দিগন্তে ঢেউ খেলে যায়। যততক্ষণ না সন্ধ্যা নেমে আসে, শুকনো মাটি কুপিয়ে পরিখার আদল তৈরি করে। আর সেই মাটি দিয়ে গড় নির্মাণ করে। মন্থর এবং পরিশ্রান্ত করে তোলা একটা কাজ। কেউ কেউ সূর্যের প্রকোপ সহ্য করতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অনেকেই প্রলাপ বকতে শুরু করে- জিহ্বা জড়িয়ে আসে, চোখ উল্টে যায়- যেখান থেকে তারা আর কখনও সুস্থ হবে না।
