“আমাদের অগ্রসর হবার গতির সাথে তাল রাখতে গিয়ে তাদের লড়াই করার জন্য বাড়তি শক্তি থাকবে না।” বাবর মন্তব্য করে।
সবুজ পানির বহমান ধারা তার মনকে কলহপ্রিয় উপজাতির থেকে ভাটিতে হিন্দুস্তানের পানে ধাবিত করে এবং খুশিতে ভরিয়ে তোলে। শীঘ্রই সে আফিম মিশ্রিম ভাঙ দিয়ে যেতে বলে। বাস্তবতা থেকে পলায়নের একটা উপায় হিসাবে সে একসময়ে এটা ব্যবহার করতে। কিন্তু এখন এটা বর্তমানকে আনন্দে ভরিয়ে তুলে আর ভবিষ্যতকে আশাব্যঞ্জক করে। প্রতিবার সে এটা গ্রহণ করলে, তারা যে নিরস পাথুরে দৃশ্যপটের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে, সেটাকে সোনালী আলোয় যেনো উদ্ভাসিত করে তোলে এবং এর প্রতিটা অনুষঙ্গ- প্রতিটা বৃক্ষ, প্রতিটা ফুল, নধর ভেড়ার পালের প্রতিটা ভেড়া- তাজা, মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে ভরে উঠে। সে যখন চোখ বন্ধ করে, তখন অন্য সব অবয়ব তার মানসপটে ভিড় করে তার লোকেরা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু সেনার ভূপাতিত মৃতদেহের ভিতর দিয়ে উৎফুল্ল ভঙ্গিতে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে। তাদের ধাবমান ঘোড়ার পা যেনো মাটি স্পর্শই করে না, অনন্ত আকাশের নিচে সে একটা সোনার সিংহাসনে উপবিষ্ট এবং মাথায় একটা হীরা পান্নাখচিত সোনার মুকুট চকচক করছে…
“কি পাগলের মতো মিটমিট করে হাসছেন?” বাবুরী জানতে চায়।
“আমি ভাবছি আগামী, আমাদের কপালে কি আছে। আজ থেকে এক বছর পরে আমরা কোথায় থাকবো।”
“আমি আশা করছি দিল্লীতে…”
“আর হুমায়ূন তোমার কি মনে হয় আমরা কোথায় থাকবো?”
“আব্বাজান আমি ঠিক জানি না…কিন্তু আল্লাহতা’লা চাইলে আমরা আপনার শত্রুদের পরাস্ত করে একটা সাম্রাজ্যের অধিকারী হবো।”
তার অকপট মন্তব্য শুনে বাবর আর বাবুরী নিজেদের মধ্যে উৎফুল্ল দৃষ্টি বিনিময় করে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তারা তাদের চেহারা স্বাভাবিক করে তুলে। একজন তরুণের জন্য হতে পারে শব্দগুলো বেশ গালভরা, কিন্তু তাদের মনেও কি একই আবেগ খেলা করছে না?
*
“সুলতান, গুপ্তদূতের দল ফিরে এসেছে। তারা সিন্ধু নদ অতিক্রমের একটা উপযুক্ত জায়গার খবর নিয়ে এসেছে।”
বাবরের বুকটা ধক করে উঠে। কাবুল নদী ত্যাগ করার পরে থেকেই, খাঁ খাঁ নুড়ীপাথরে পূর্ণ খাইবার গিরিপথের ভিতর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্বদিকে তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করে সে এই খবরটা শোনার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। সে আর বাবুরী শিকারে যাবে বলে প্রস্তুত হয়েছিলো- পাশ্ববর্তী গ্রামের লোকেরা পাঁচ মাইল দূরে ওক বনের পরস্পর সংবদ্ধ ডালপালার মাঝে দুটো গণ্ডার চড়ে বেড়াচ্ছে। বলে খবর নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু আপাতত তারা আরো কিছুদিন নিরূপদ্রবে ঘাস খেতে পারবে।
“আমার সাথে এসো!” বাবুরীকে অনুসরণ করতে বলে সে তার অভিযানের সময়ের লাল তাঁবুর বাইরে যেখানে গুপ্তদূতেরা অপেক্ষা করছে সেদিকে ঘোড়া হাঁকিয়ে এগিয়ে যায়।
“সুলতান, এখান থেকে একদিনের দূরত্বে একটা স্থান আছে। যেখানে ভেলা বানিয়ে আমরা ভারী জিনিসপত্র ভাসিয়ে ওপারে নিয়ে যেতে পারবো।” গুপ্তদূতদের দলপতি তাদের নিয়ে আসা খবর বয়ান করে।
“সেখানে স্রোত কিরকম?”
“নদীর একটা তীক্ষ্ণ বাঁকের পরে অতিক্রমের জন্য নির্ধারিত স্থানটা অবস্থিত। ফলে স্রোতের গতিবেগ এখানে অপেক্ষাকৃত কম- আমরা তিনটা মালবাহী খচ্চর পানিতে
নামিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছি। তারা বেশ ভালোমতোই ওপারে গিয়ে পৌঁছেছে। আর নদীর তীরের এই অঞ্চলটায় কোনো লোকবসতিও নেই। আমরা কোনো ধরণের বিঘ্ন ছাড়াই নদী অতিক্রম করতে পারবো।”
পরের দিন, বাবর আর বাবুরী তৃতীয়বারেরমতো সিন্ধু নদের দেখা পায়।
“দোহাই আপনার, আপনি নিশ্চয়ই এবারও সাঁতরে নদী অতিক্রমের মতলব ভাঁজছেন না?” কণ্ঠে কৃত্রিম উৎকণ্ঠা ফুটিয়ে বাবুরী জিজ্ঞেস করে। কারণ এবার আমি আর আপনার পেছনে লেজের মতো পানিতে লাফ দিচ্ছি না…”।
“আমি সাম্রাজ্য না পাওয়া পর্যন্ত সাঁতার কাটা বন্ধ। আমাদের কপাল ভালো আমরা শেষবার যেমন দেখে গিয়েছিলাম নদীতে পানির স্তর, এখন তার চেয়ে অনেক কম।” বাবর ঝুঁকে একটা শুকনো ডাল তুলে নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। “গুপ্তদূতেরা ঠিক খবরই নিয়ে এসেছে। নদীর এই বাঁকটা আসলেই স্রোতের বেগ অনেক কমিয়ে দিয়েছে- ডালটা দেখো কেমন ধীরে সুস্থে ভেসে যাচ্ছে…”
“আপনার কণ্ঠস্বর কেমন হতাশ শোনাচ্ছে। আপনি কি রূপকাশ্রয়ী কোনো সংগ্রাম। আশা করছিলেন নদী অতিক্রম করবার সময়ে?”
“আমি চাইনি কিন্তু আশা করেছিলাম। আমরা এখানে ছাউনি স্থাপন করবো আর ছুতোরের দল পর্যাপ্ত ভেলা তৈরি করার পরে আমরা নদী অতিক্রম করবো।”
ভেলা বানাতে- গাছ কেটে, চিরে তক্তা করে, দড়ি দিয়ে বেঁধে এবং চামড়ার অতিরিক্ত তাঁবু কেটে উপরিভাগ আচ্ছাদিত করতে তিনদিন সময় লাগে। চতুর্থ দিন তারা নদী অতিক্রম করে। যদিও ঝিরঝির হিম বৃষ্টির একটা পাতলা চাদরে চারপাশ আবৃত থাকায়, নদীর তীরের মাটি চিটচিটে কাদায় রূপান্তরিত হয়েছিলো এবং ভেলার উপরিভাগ পিচ্ছিল করে তুলেছিলো তবুও বিপুল সংখ্যক মানুষ আর ভারবাহী পশুর পাল অন্যপাড়ে নিয়ে যেতে ভোরের আলো ফোঁটার পর থেকে দুপুর পর্যন্ত সময় লাগে। প্রথমে নদী অতিক্রম করে অগ্রগামী প্রহরীর দল, তারপরে ঘোড়া, মহিষ, উট আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কামান এবং মাস্কেটের বাক্সগুলো। এরপরে পদাতিক বাহিনীর সদস্যদের। সওদাগর আর অস্থায়ী শিবিরের মালপত্র ওপাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেনাবাহিনীকে অনুসরণ করতে থাকা লোকগুলোকে নিজেদের বন্দোবস্ত নিজেদেরই করতে হয়। পুরো বহরটা পার করতে গিয়ে কেবল তিনটা মালবাহী উট তারা হারায়। ভেলায় ভালোমতো বেঁধে না রাখার কারণে বেচারারা ভেলা নিয়ে উল্টে স্রোতের সাথে ভেসে যায়।
