“বিজয় অর্জিত হওয়ামাত্রই আমি তোমাকে নিয়ে যাবার জন্য লোক পাঠিয়ে দেবো।”
তারপরে সে বিদায় নেয়, দ্রুত জেনানামহলের দিকে ফিরে যায়। যেখানে বাবর জানে যে আগামী মাসগুলোতে নিজের দুশ্চিন্তা গোপন করে- সে সবাইকে আগলে রাখবে, সাহস যোগাবে। এবারের অভিযানে হুমায়ূন তার সাথে যাবে। আর সেজন্য কামরানকে সে কাবুলের রাজপ্রতিভূ নিয়োগ করেছে। বাইসানগার আর কাশিমের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তি, এবারের অভিযানে তারা অংশ নিচ্ছে না। দরবারে থাকবেন তাকে পরামর্শ দেবার জন্য। কিন্তু বাবর জানে তার অনুপস্থিতিতে কাবুলের নিরাপত্তা আর সুশাসনের নিশ্চয়তা, অনেকটাই খানজাদার বিজ্ঞ পরামর্শের উপর নির্ভর করবে। সে আরও জানে তার স্ত্রীদের ভিতরে ঈর্ষাজনিত কারণে উদ্ভূত নানা জটিলতা, এসান দৌলত বেঁচে থাকলে যেভাবে সামলে নিতেন, খানজাদাও ঠিক সেভাবে তাদের সাথে কথা বলে, সান্ত্বনা দিয়ে, আপোষ করিয়ে, সামলে নেবে।
অন্ধকার থেকে ভেসে আসা তূর্যধ্বনি আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দূর্গপ্রাসাদের নিচের তৃণভূমিতে দশ হাজার অশ্বারোহী অভিযান শুরু করার জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে। অচিরেই তারা তাদের অস্ত্র আর সমরসজ্জা শেষবারেরমতো পরখ করে নিয়ে ঘোড়াগুলোকে যাত্রার জন্য প্রস্তুত করবে। নিশান-বাহকের দল বাবরের মনোনীত সবুজ আর হলুদ ডোরা কাটা- হলুদ রঙ তার জন্মভূমি ফারগানার, আর সবুজ তৈমূরের রাজধানী সমরকন্দের স্মারক- পটভূমিতে তিনটা জ্বলজ্বল করতে থাকা বৃত্ত, যা তৈমূর নিজের জন্মের সময়ে গ্রহসমূহের নিখুঁত অবস্থান প্রকাশ করার জন্য অংকন করতেন, সম্বলিত নিশানের ভাঁজ খুলে।
কঠোর আর নিবিড় প্রশিক্ষণের ফলে দক্ষ হয়ে ওঠা গোলন্দাজ আর ম্যাচলকধারীরাও, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। কামান, মাস্কেট, বারুদের থলি, আর কামানের গোলা ইতিমধ্যে গাড়িতে তোলা শেষ হয়েছে। অস্থায়ী ছাউনি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী- চামড়ার তৈরি ভারী তাঁবু, তবু স্থাপনের খুঁটি, বিশালাকৃতি রান্নার পাত্র- সবকিছুই মালবাহী গাড়িতে তোলা হয়েছে।
আকাশের ভোরের আলো ফোঁটার সাথে সাথে ষড়গুলো গাড়ির জোয়ালের সাথে বাধা হবে। মালবাহী পশুর বিশাল সারি- দুই কুজ বিশিষ্ট উট, গাধা আর খচ্চর খাদ্য শস্যের বস্তা, শুকনো মাংস, আর অন্যান্য রসদ সামগ্রী বহন করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বাবরের সেনাবাহিনীকে অনুসরণ করবে বলে মনোনীত বণিকের দল যারা ছাউনিতে অস্থায়ী বাজার বসাবে তারাও তাদের মালপত্র আর তা বহনকারী পশুর পাল প্রস্তুত করে দীর্ঘ আর সফল অভিযান মানে বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা। তাদের পেছন পেছন যাবে সেনা ছাউনি অনুসরণকারী সাধারণ মানুষের দল- দিনমজুর, মেথর, পানির্বাহক, শিশু সন্তান কোলে নিয়ে উদ্বিগ্ন স্ত্রী, যে তার অভিযানে অংশ নেয়া স্বামীর কাছাকাছি থাকতে আগ্রহী, বারবণিতার দল, দড়াবাজ, বাঈজি আর বাদ্যযন্ত্রীর দল যারা জানে সৈন্যদের মন যুদ্ধের ভাবনা থেকে সরিয়ে রাখতে পারলে বিপুল বখশিশ পাওয়া যাবে। একটা পুরো শহরই যেনো ভ্রমণ করছে সৈন্যবাহিনীর সাথে।
কয়েক ঘণ্টা পরে, দুপুরের ঠিক আগে আগে, শীতের সূর্য দৃশ্যপটের উপরে অকাতরে রূপালি আলো বিকিরিত করার মাঝে, বাবর আঙ্গুলে তৈমূরের সোনার অঙ্গুরীয়, কোমরে কোষবদ্ধ আলমগীর, আর উদ্দাম তূর্যনাদের মাঝে কাবুলের দূর্গপ্রাসাদ থেকে ঘোড়ায় উপবিষ্ট অবস্থায় বেরিয়ে আসে। শহরের উঁচু দেয়ালের বাইরে বের হয়ে আসার সময়ে তার পেটের ভেতরে কেমন দলা পাকিয়ে উঠে। আশঙ্কা, উত্তেজনা নাকি পূর্বাভাষ? তার বহু পরিচিত, বহুবার অনুভব করা অনুভূতি। কিন্তু এবারের ব্যাপারটা আলাদা। প্রচণ্ড একটা ঐকান্তিকতা তাকে আপুত করে রাখে। সত্যি সত্যি ভাগ্যদেবী এবার তার প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন…তাকে কেবল সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে, আগে যা কিছু হয়েছে- ফারগানার সিংহাসনের দাবিতে তার লড়াই, উজবেকদের পরাস্ত করে সমরকন্দ দখলে রাখার প্রয়াস। তার কাবুল শাসন- সবই তার নিজের অপার ভাগ্য এবং তার ভাবী সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর বলে পরিগণিত হবে…
*
“জ্যোতিষ ঠিকই বলেছিলো। ভাগ্য আমাদের সহায়।” বাবর চঞ্চল বেগে বহমান কাবুল নদীর উপরে বিশাল ভেলায় চামড়ার চাদোয়ার নিচে বিছিয়ে দেয়া গালিচার উপরে তার দু’পাশে বসে থাকা বাবুরী আর হুমায়ূনকে লক্ষ্য করে বলে। দাড়ির দল দাঁড় বেয়ে ভেলাটা পরিচালনা করছে। তাদের চারপাশে বিশাল সব নৌকার একটা বহর। কামানগুলো আর ভারী মালপত্রের অধিকাংশ বহন করছে। সেনাবাহিনীর মূল অংশ নদীর তীর ধরে এগিয়ে চলেছে।
“হুমায়ূন, উত্তরের যাযাবরদের মাঝ থেকে বিশাল একটা বাহিনী গড়ে তুলে তুমি দারুণ একটা কাজ করেছে। বাবর তার মূল বাহিনী নিয়ে কাবুল ত্যাগ করার দশ দিন পরে হুমায়ুন বখশানের বনভূমি এলাকা থেকে সংগৃহীত দু’হাজারের বেশি সৈন্যের একটা বাহিনী নিয়ে তার সাথে এসে যোগ দিয়েছে।
“আব্বাজান–আপনি আমাদের সাথে তাদের দেবার জন্য যতো স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়েছিলেন, সেটার কথা বিবেচনা করলে, ব্যাপারটা মোটেই কঠিন ছিলো না।” “বদখশানীরা ভাল যোদ্ধা, অবশ্য নিজেদের ভেতরে বা অন্যের সাথে ঝগড়া বাধাবার ব্যাপারেও তাদের দক্ষতা প্রশ্নাতীত।” পানির উপর দিয়ে প্রবাহিত শীতল বাতাসের হাত থেকে বাঁচতে পরনের নীল আলখাল্লাটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বাবুরী বলে।
