“অবশ্যই।”
*
বরফশীতল সিন্ধু নদের পানিতে সাঁতার কাটবার আট মাস পরে একদিন ভোরের প্রথম প্রহরে, বাবর মাহামের কক্ষ থেকে বের হয়ে আসে। যেখানে সে শেষবারের মতো তার রেশম কোমল দেহের ভাঁজে আর তার চন্দন সুবাসিত দীঘল কেশের জটলায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চেয়েছে এবং সেখান থেকে একাকী সে নিজের নিভৃত কামরায় ফিরে আসে। কাবুলের দূর্গপ্রাসাদের নিচে অবস্থিত তৃণভূমি থেকে ভেসে আসা রণদামামার গুরুগম্ভীর আওয়াজ সে মনোযোগ দিয়ে শোনে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে ভোরের আধো- আলোতে জ্বলজ্বল করতে থাকা সেনাছাউনির অগ্নিকুণ্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে। গতকাল, এই একই বারান্দা থেকে, বাবুরী পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়, সে তার লোকদের জন্য নিজের মহাপরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলো।
“তৈমূরের হিন্দুস্তান আক্রমণের সময় থেকে তার উত্তরাধিকারীদের জন্য এটা একটা ন্যায়সঙ্গত সম্পত্তি। তার প্রধান উত্তরাধিকারী হিসাবে আমি আগামীকাল যাত্রা আরম্ভ করবো। যারা আমাকে আমার জন্মগত অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছে তাদের কবল থেকে সেটা উদ্ধারের নিমিত্তে। চারমাস আগে আমি হিন্দুস্তানের অধিকাংশ স্থানের স্বঘোষিত শাসকের- দিল্লীর ইবরাহিম লোদীর কাছে একটা বাজপাখি উপহার হিসাবে পাঠিয়েছিলাম। আমি তাকে বলেছিলাম, সে যদি আমাকে তার অধিরাজ হিসাবে স্বীকার করে নেয়, তবে আমার অধীনস্ত করদ রাজ্যের শাসক হিসাবে আমি তাকে মনোনীত করবো। সে বাজপাখিটার মাথা কেটে আমার কাছে ফেরত পাঠিয়েছে। সে এবার কাবুলের সুলতান এবং তৈমূরের বংশধরকে অপমানিত করার জন্য নিজের সিংহাসন খোয়াবে।”
বাবরের প্রজারা তার কণ্ঠের তেজোদীপ্ত স্বরের প্রতি গর্জে উঠে সম্মতি প্রকাশ করে। যদিও সুলতান ইবরাহিম কেবলই একটা তাদের কাছে এবং আগ্রা ও দিল্লীতে তার প্রাসাদ এবং দূর্গ সম্বন্ধে, তার বিপুল বৈভব এবং বিশাল সেনাবাহিনী কিংবা শাসকদের জোট- যাদের কেউ তারই মতো মুসলমান, কেউবা মূর্তি উপাসক- যারা তার অধীনস্ত সামন্তরাজ এসব কিছু সম্বন্ধেই তাদের কোনো ধারণাই নেই। বাবর তার বক্তব্যের প্রতি তাদের এইরকম কিছু ভাবনা চিন্তা না করেই সমর্থন করতে দেখে মনে মনে হাসে। একথা সত্যি যে হিন্দুস্তানের প্রতি তার একটা জন্মগত অধিকার রয়েছে। কিন্তু তার সত্যিকারের জন্মগত অধিকার ছিলো সমরকন্দ। সেখানকার স্মৃতি তাকে আপুত করে তোলে কিন্তু সে এটাও জানে সেখানে সে আর কখনও শাসন করতে পারবে না।
“সুলতান, আপনার বোন কথা বলতে চান আপনার সাথে।” একজন পরিচারক এসে বাবরের কল্পনায় ছেদ টেনে দেয়।
“অবশ্যই। তিনি কি আমাকে তার কাছে যেতে বলেছেন?”
“না, সুলতান। তিনি নিজেই এসেছেন।”
খানজাদা বারান্দা তার পাশে এসে দাঁড়ায়। বাবর আর সে সেখানে একা হওয়া মাত্র, খানজাদা নেকাবের আড়াল অপসারিত করে। দেয়ালের কুলঙ্গিতে রাখা মশালের আলো তার মুখের গড়ন আর ত্বকের বলিরেখা অনেকটাই কোমনীয় করে তোলে। বাবর যে রাতে আকশির দূর্গে ফারগানার সিংহাসনে নিজের অধিকার ঘোষণা ঘোষণা করেছিলো, সেদিন যে মেয়েটা ভাবগম্ভীর ভঙ্গিতে তার মরহুম আব্বাজানের তরবারি আলমগীর এনে তার হাতে তুলে দিয়েছিলো, সেই মেয়েটাকেই যেনো এখন আবার দেখতে পায়।
“আমি জানি তুমি একটু পরে জেনানামহলে আমার আর তোমার স্ত্রীদের কাছ থেকে বিদায় নিতে যাবে। কিন্তু আমি তোমার সাথে কিছুটা সময় একাকী কাটাতে চাইছিলাম। ফারগানায় আমাদের কৈশোরে জীবন যখন অনেক বেশি নিরাপদ আর প্রতিশ্রুতিপূর্ণ ছিলো, সেই সুখী দিনগুলো স্মরণ করতে কেবল আমরা দু’জনই আজ বেঁচে আছি। আমাদের উপর দিয়ে এরপরে অনেক ঝড়ঝাপটা বয়ে গিয়েছে, ভালো মন্দ দু’ধরণের…” সে দম নেবার জন্য থামে। “আমাদের জীবন হয়তো অনেক। সহজ আর ঘটনাহীন হতে পারতো, কিন্তু নিয়তির সেটা কাম্য না। তুমি হিন্দুস্তানে তোমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। যা ইতিহাসের পাতায় আমাদের পরিবারের মর্যাদা নিষ্পন্ন করবে। আমাদের মরহুম। আব্বাজান, আম্মিজান আর নানীজান আজ বেঁচে থাকলে যেমনটা চাইতেন, আমি আশা করি এই অভিযানে তুমি সেসব কিছু অর্জন করো। আমরা যে জন্য বেঁচে আছি- বিজয় আর প্রভুত্ব স্থাপন তাকে ইঙ্গিতপূর্ণ করে তুলবে… কিন্তু আমার আদরের ছোট ভাই নিজের প্রতি যত্ন নিতে ভুলে যেও না। “ খানজাদার কিশমিশের মতো চোখ অনেকটা তাদের নানীজানের মতোই কিন্তু অনেক বেশি গাঢ়- অশ্রুতে টলটল করে।
“আমি, আমার প্রথম টাট্টু ঘোড়াটাকে আচমকা বাঁক নেওয়াতে গিয়ে পড়ে গেলে তুমি যেমন আমাকে বকুনি দিয়েছিলে সাবধান হতে। ঠিক সেভাবে, নিজের খেয়াল রাখবো।” বাবর তাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে। “আমার ভাগ্যে যাই ঘটুক একটা কথা আজ রাতে জেনে রাখো, আমি কেবল আমরা নিয়তি অনুসরণ করছি আর যে কারণে আমার জন্ম হয়েছে সেটা পরিপূর্ণ করতে চাইছি। গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান আমার পক্ষে রয়েছে। শাহী জ্যোতিষবিদ কি ভবিষ্যদ্বাণী করেননি যে নভেম্বরের শেষপ্রান্তে যদি আমি আমার অভিযান শুরু করি। সূর্য যখন ধনুরাশিতে অবস্থান। করছে তাহলে বিজয় আমার নিশ্চিত?”
খানজাদা দু’হাতে বাবরের মুখটা পলকের জন্য ধরে রেখে তার কপালে আলতো করে চুমু খায়। “আবার আমাদের দেখা না হওয়া পর্যন্ত বিদায়, আমার ভাই।”
