“কিন্তু আজ সেই প্রস্তুতির সূচনা হয়েছে, তাই না?”
*
পরবর্তী সপ্তাহগুলো বাবরকে তার যুদ্ধাস্ত্র আর যুদ্ধ কৌশল শানিয়ে নেবার আরো সুযোগ দান করে। বিজিত আর নতজানু বাজাউর থেকে বাবর তার সেনাবাহিনী নিয়ে দক্ষিণ-পূর্বদিকে হিন্দুস্তানের সীমান্ত বরাবর বুনো, পাহাড়ি এলাকার দিকে এগিয়ে যায়। এবারও প্রতিপক্ষ তার কামানের হুঙ্কার কিংবা মাস্কেটের গর্জনের সামনে দাঁড়াতেই পারে না।
বস্তুতপক্ষে, বাবরের আগমনের সংবাদ পেতে, ভীতসন্ত্রস্ত গোত্রপতিরা নধর ভেড়া, মটকা ভর্তি শস্যদানা, তেজী ঘোড়া কিংবা সুন্দরী রমণীর সাথে তোষামদপূর্ণ আনুগত্যের বার্তা পাঠিয়ে নিজেদের বশংবদ প্রমাণের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে। তাকে তুষ্ট করে পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত নিজেদের গ্রাম আর মাটির দূর্গসমূহ রক্ষা করতে তাদের আগ্রহ দেখে বাবরের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠে। কেউ কেউ এমনকি মুখে ঘাস নিয়ে তার সামনে উপস্থিত হয়- বাবর তার তরুণ বয়সে অন্যসব বুনো উপজাতির ভিতরে আত্মসমর্পণের এই অভিব্যক্তি লক্ষ্য করেছিলো।
কিন্তু এই সব তুচ্ছ সর্দারদের বশ মানাবার আকাঙ্ক্ষা তার মাঝে ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে। রাতের বেলা সে ঘুমাবার চেষ্টা করলে নানা দৃশ্যকল্প তার স্বপ্নে এসে হানা দেয়। এক বিজেতার চেহারা-”মোমবাতির মতো চোখ যেখানে কোনো উজ্জ্বলতা নেই”- তার আর তার উদ্দেশ্যের মাঝ দিয়ে বহমান সিন্ধু নদী পর্যবেক্ষণ করছে। মানুষকে পরাস্ত করতে তৈমূর সিদ্ধহস্ত ছিলেন। কখনও কোনো পার্থিব বাঁধা তার সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি কোনো পাহাড় বা নদী তাকে কখনও হতোদ্যম করতে পারেনি। বাবরও ঠিক তেমনই হবে। পনের বছর আগে, গ্রীস্মের প্রচণ্ড দাবদাহে, সে আর বাবুরী সিন্ধুর দিকে তাকিয়ে ছিলো। চমকে উঠে ঘুম ভেঙে গেলে সে আবারও নিজের ভেতরে সেই একই কাজ করার একটা উদগ্র বাসনা অনুভব করে। যা সে পরে কখনও ঠিকমতো ব্যাখ্যা করতে পারেনি- না বাবুরীর কাছে, না নিজের কাছে…কিন্তু বাসনাটা দিন দিন তার ভেতরে কেবল বেড়েই চলে। ভবিষ্যত অভিযানের ভাবনা মন থেকে সরিয়ে রেখে, বাবর তার সেনাবাহিনীকে পূর্বদিকে ঘুরিয়ে নেয় এবং মার্চ মাসের এক শীতের সকালে, প্রশস্ত, দ্রুত বহমান একটা নদীর দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে উঠে। নিজের লোকদের অনুসরণের জন্য অপেক্ষা না করে সে ঠাণ্ডা, কঠিন জমির উপর দিয়ে তুড়গ বেগে ঘোড়া দাবড়ে যায়। তীরের কাছে পৌঁছে, সে তার ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নামে, পরণের কাপড় টেনে খুলে এবং বরফগলা নদীর পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে যা সুদূর তিব্বতের কোনো পাহাড়ের চূড়া থেকে বয়ে আসছে।
পানি প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হওয়াতে আগ্রহের প্রথম ঝাপটা তার নিমেষে কেটে যায় এবং বরফশীতল পানি কয়েক ঢোক গিলে ফেলতে তার মনে হয় গলায় বুঝি বরফ জমে গিয়েছে। তীব্র স্রোত তাকে ইতিমধ্যে অনেকদূর ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে এবং তীরে দাঁড়িয়ে থাকা তার লোকেরা আতঙ্কে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। আরেকবার গভীর শ্বাস নিয়ে এবার সে মুখ পানির অনেক উপরে রাখে- সে তাকে ভাসিয়ে। নিতে চাওয়া প্রাকৃতিক শক্তি নাকচ করে দেহের পুরো শক্তি দিয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করে। ভেসে যাওয়া থেমে গিয়ে পেছনের দিকে এগিয়ে যাওয়া শুরু হতে সে উফুল্ল হয়ে উঠে। সে বিজয়ী হয়েছে। কিছু একটা পানিতে আছড়ে পড়ে এবং বাবুরীর মাথা পানির নিচে থেকে তার পাশে ভেসে উঠে।
“মূর্খের বাদশা, এসব আপনি কি শুরু করেছেন?” বাবুরীর মুখ ঠাণ্ডায় প্রায় নীল হয়ে উঠেছে। “আর পাগলের মত হাসছেন কেন?”
“আমার সাথে সাঁতরে অপর পাড়ে চলো, সেখানে গিয়ে আমি তোমাকে খুলে বলবো।”
জলাবর্ত আর তীব্র স্রোতের ভিতর দিয়ে তারা একসাথে এগিয়ে যায় যতোক্ষণ না অপর পাড়ে গিয়ে পৌঁছে এবং রুক্ষ্ম, অনুজ্জ্বল ধুসর-হরিৎ বর্ণের ঘাসের গোছ দু’হাতে আঁকড়ে ধরে নিজেদের পানি থেকে টেনে তুলে। বাবর মাটিতে শুয়ে পড়ে, তখনও খিকখিক শব্দে হাসছে। যদিও তার পুরো দেহ শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। এবং তার শীতল ত্বক কাটা কাঁটা হয়ে উঠেছে।
“এবার বলেন এসবের মানে কি?” মাথা ঝাঁকিয়ে চোখের উপর থেকে চুল সরিয়ে, বাবুরী ঘাড় নিচু করে তার দিকে তাকায় এবং দু’হাতে নিজেকে চাপড় মেরে উষ্ণ রাখতে চেষ্টা করে।
“গতরাতে আমি ভালো করে ঘুমাতে পারিনি। সিন্ধুর এতো কাছে রয়েছি এই ভাবনাটাই আমার কানে নদীর স্রোতের মতো রক্তের গর্জন সৃষ্টি করে। আমি একটা মানত করেছিলাম, আল্লাহতালা যদি হিন্দুস্তানে আমাকে বিজয়ী করেন তবে আমার নতুন সাম্রাজ্যের প্রতিটা নদী আমি সাঁতরে অতিক্রম করবো।”
“আপনি এতো তাড়াতাড়ি সাঁতার শুরু না করলেও পারতেন…কোনো কিছু জয় করা থেকে আপনি এখনও অনেক দূরে রয়েছেন।”
বাবর উঠে বসে। “আমাকে এটা করতেই হতো। আমি কিভাবে সিন্ধু নদী দেখে সেটা অতিক্রম না করে থাকতে পারি…? অবশ্য আমাদের এবার কাবুলে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু শীঘ্রই আবার আমরা ফিরে আসবো। আমি এবার যখন ফিরে আসবো তখন এই ভূখণ্ড জানবে যে আমি এটা অর্জন করেছি। এই অঞ্চল আমাকে স্বাগত জানাবে…”
“আর তার আগে আমার ধারণা আমাদের বোধহয় আবার সাঁতরে ফিরে যেতে হবে?”
