বাবর আড়চোখে বাবুরীর দিকে একবার তাকালে, সে সাথে সাথে বন্ধুর মনের কথা বুঝতে পেরে, ঢালের আরো কিছুটা সামনে লুকিয়ে রাখা কামান আর গোলন্দাজ বাহিনীর দিকে এগিয়ে যায়। বাবর তাদের কামানগুলোর চারপাশ থেকে লতাপাতার আড়াল সরিয়ে নিয়ে প্রতিটা ব্যারেলের নতি ঠিক করতে দেখে।
তারা তারপরে দ্রুত বারুদের থলে আর পাথরের গোলা ব্যারেলে ঠেসে ঢুকিয়ে দিয়ে স্পর্শ-রন্ধ্রে গোঁজ প্রবিষ্ট করিয়ে ফাটলের চারপাশে আরো কিছু বারুদ ছিটিয়ে দেয়। অবশেষে, গোলন্দাজ বাহিনীর ভিন্ন চারজন তোক সামনে এগিয়ে আসে সলতেতে আগুন ধরাবে বলে- বাবর এতোদূর থেকে কেবল তেলে ভেজানো দড়ির দৈর্ঘের মাথার অংশটুকু দেখতে পায়। বাবুরী এবার তার ফিরে তাকালে সে তরোয়াল মাথার উপরে তুলে বৃত্তাকারে আন্দোলিত করে, আগুন জ্বালাবার আদেশ দেয়। সহসা, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিচিত শব্দ ছাপিয়ে বাজাউরবাসীদের অশ্রুতপূর্ব গমগমে তীক্ষ্ণ একটা আওয়াজ বাতাস চিরে ফালা ফালা করে দেয়।
প্রথম কামানের গোলাটা আগে থেকে নির্ধারিত দূর্গের প্রবেশপথের ডানপাশে দক্ষিণ-পূর্বদিকের বিশ ফিট উঁচু দেয়ালের নিম্নাংশে আছড়ে পড়ে। ভূমি সমতল থেকে প্রায় দশ ফিট উঁচুতে গোলাটা আঘাত হানলে ইটের ভাঙা টুকরো আর ধূলোর মেঘে চারপাশটা অন্ধকার হয়ে যায়। দ্বিতীয় গোলাটা প্রথমটার ঠিক নিচে, তৃতীয় আর চতুর্থটাও একই স্থানে আঘাত করে। ধোয়া আর ধূলোর মেঘ সরে গেলে, দেয়ালের একটা সামান্য অংশকে ভূপাতিত অবস্থায় এবং আশেপাশের দেয়ালে বিশাল সব ফাটলের জন্ম হয়েছে দেখা যায়। বাবরের সেনাবাহিনীর একটা অংশ, এতোক্ষণ যাদের নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিলো, তারা এবার ধ্বংসস্তূপের উপর দিয়ে হুড়মুড় করে দূর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে শুরু করে।
হতভম্ভ প্রতিরোধকারীরা পালাতে শুরু করে। কেউ কেউ তাদের বোধাতীত আয়ুধ যা ইতিমধ্যে দূর্গের দেয়ালের একাংশ গুঁড়িয়ে দিয়েছে তা পুনরায় গর্জে উঠবার আগে, দূর্গের ছাদ থেকে দড়ির সাহায্যে দ্রুত নামতে গিয়ে তাড়াহুড়োর কারণে পিছলে যায় এবং নিচে আছড়ে পড়ে।
বাবরের তীরন্দাজ বাহিনীর নিক্ষেপ করা তীরের আড়াল আচ্ছাদনের মতো ব্যবহার করে ম্যাচলকধারীরা এগিয়ে গিয়ে তাদের অঙ্কুশ স্থাপন করে এবং পলায়নপর যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। বাবর দু’জন বাজাউর যোদ্ধাকে মুখ থুবড়ে পড়তে দেখে। একজনের কপালে মাস্কেটের ধাতব গোলক আঘাত করে তাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে। অন্যজন- হলুদ পাগড়ি পরিহিত এক দানব বুকের কাছটা খামচে ধরে আতঙ্ক আর যন্ত্রণায় ঝটফট করতে করতে চিৎকার করছে। তার কুঁকড়ে থাকা আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। কিন্তু বাকী অনেকেই হোঁচট খেতে খেতে দৌড়ে গিয়ে দূর্গের পূর্বদিকের দেয়াল টপকে নিচের ঢালে লাফিয়ে পড়ায় বাবরের ম্যাচলকধারী নিশানাবাজদের পক্ষে তাদের সবাইকে ঘায়েল করা সম্ভব হয় না।
“তাদের তাড়া করো!” বাবর তার রক্ষীবাহিনীর একাংশকে আদেশ দেয়। তারপরে, কোষমুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে, সে দূর্গের প্রধান তোরণের ঢাল দিয়ে দুলকিচালে ঘোড়া ছোটায়। যেখানে তার লোকেরা ইতিমধ্যে দ্বাররক্ষীর প্রকোষ্ঠ সাফল্যের সাথে দখল করে নিয়েছে এবং লোহার বেষ্টনী তুলে দিয়েছে। সে প্রবেশপথের নিকটে পৌঁছালে বাবুরী তার সাথে এসে যোগ দিলে তারা একসাথে ভেতরে প্রবেশ করে।
“সুলতানের জয় হোক!” বাবর দূর্গ প্রাঙ্গনে উপস্থিত হলে, ঘামে ভেজা মুখ আর বাম কানের উপরে একটা আঁকাবাঁকা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়া অবস্থায় বাবা ইয়াসাভাল তাদের স্বাগত জানায়। “বাজাউরি’র সুলতান মৃত- দূর্গপ্রাকারের উপর থেকে তিনি গিরিসঙ্কটের অতলে লাফিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন। আমরা অসংখ্য লোককে বন্দি করেছি। আপনার পরবর্তী আদেশ কি?”
“তৈমূর আতঙ্কের সর্বগ্রাসী স্রোত বইয়ে দিয়ে পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতা পর্যদস্ত করতেন…” শব্দগুলো- সম্ভবত নিষ্ঠুর, কিন্তু উদ্দেশ্য দিবালোকের মতো পরিষ্কার বাবরের মস্তিষ্কে অনুরণিত হয়। “শাহী মন্ত্রণা সভার সবাইকে হত্যা করো। তারা আত্মসমর্পণের সুযোগ পেয়েও সেটা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বাকীদের গ্রেফতার করে নারী আর শিশুদেরও- কাবুলে প্রেরণ করো। তারা সেখানে আমার লোকদের দাস হিসাবে কাজ করবে।
“এবার বলেন? আপনার কি মনে হয়? আমরা কেমন দেখিয়েছি?” তারা অধিকৃত দূর্গ আর কামানের গোলায় তার ক্ষতিগ্রস্থ অংশ পর্যবেক্ষণকালে বাবুরী জিজ্ঞেস করে।
বাবর তার মনোভাব প্রকাশ করার মত শব্দ খুঁজে পেতে সময় নেয়। তার নতুন অস্ত্রের বরাভয়ে দূর্গটা কয়েকদিন, বা সপ্তাহ কিংবা মাসের বদলে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় দখল করা সম্ভব হয়েছে। অসীম সম্ভাবনার একটা দ্বার যেনো খুলে গিয়েছে। সে বাবুরীর কাঁধ আঁকড়ে ধরে। “আজ আমরা এমন একটা রীতিতে যুদ্ধ করেছি যা আমার পূর্বপুরুষদের কাছে একেবারেই অজানা ছিলো। যা দেখে তারা হয়তো অভিভূত হতো…”
“বেশ কথা, কিন্তু আপনাকে তাহলে উফুল্ল দেখছি না কেনো?”
“প্রায়ই এমন হয়েছে যে আমি অসীম সম্ভাবনার আলোকে নিজেকে স্নাত করেছি যা কখনও অর্জিত হয়নি। তুমি নিজেও কি সেটা প্রায়শই বলো না? আমি যতোক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছি যে আমরা প্রস্তুত হয়েছি, তার আগে আমি তাড়াহুড়ো করে হিন্দুস্তান আক্রমণ করতে চাই না।”
