বাবর নির্মমতার প্রয়োজনীয়তা বোঝে। মাত্র তিন রাত্রি আগের কথা। রাতের বেলা আকস্মিকভাবে শিবির পরিদর্শনে বের হয়ে সে প্রহরার দায়িত্বে নিয়োজিত পাঁচজনকে ঘুমাতে দেখে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবার আদেশ দেয়। তাদের বাম কান কেটে ফেলা হয় এবং সেটা গলায় ঝুলিয়ে বাবরের বাকি সৈন্যদের সামনে তারা রক্তাক্ত অবস্থায় হেঁটে যায়। কিন্তু তৈমূরের মতো একটা সাম্রাজ্য সৃষ্টি করে টিকিয়ে রাখতে সে যদি সফল হতে চায়, তাহলে তাকে আরো কঠোর হতে হবে। এবং নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সফল করতে হলে দ্বিতীয়বার না ভেবেই তাকে কঠোরতম সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত হতে হবে।
“সুলতান।” বাবরের একজন গুপ্তদূত, শীতের তীব্রতার হাত থেকে বাঁচতে ভেড়ার চামড়া দিয়ে ভালোমতো মোড়ান অবস্থায় তার দিকে এগিয়ে আসে। “আমাদের আগমনের সংবাদ পেয়ে এখান থেকে বিশ মাইল পূর্বদিকে পাহাড়ী এলাকায় বাজাউর নদীর তীরের এক দূর্গে সুলতান তার রাজধানী ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছে।”
“তুমি নিশ্চিত জানো- এটা কোনো ফাঁদ না?”
“আমরা তাকে তার সৈন্যবাহিনী, সাথে শহরের লোকজন আর শিবিরে বসবাসকারীরাও রয়েছে, নিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে পুরোটা পথ অনুসরণ করেছি।”
“আমাকে দূর্গটা কেমন বলো।” বাবর ঘোড়ার পর্যানের উপরে ঝুঁকে বসে, তার গালপাট্টার উপরে দেখা যাওয়া সবুজ চোখ ধকধক করে।
“দূর্গটা একটা বিশাল চতুর্ভূজাকৃতি মাটির তৈরি স্থাপনা। দোতলার সমান উঁচু, নদীর তীরে একটা গিরিসঙ্কটের পাশে অবস্থিত…আমি আপনাকে এঁকে দেখাই।”
গুপ্তদূত তার ঘোড়া থেকে নেমে, পায়ের কাছের মাটি পরিষ্কার করে এবং নিজের খঞ্জরের ডগা দিয়ে উত্তরের গিরিসঙ্কটের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাশে একটা চারকোণা মিনারের নকশা আঁকে। “সুলতান, অনুগ্রহ করে দেখেন। বাকী তিনদিক উঁচু উঁচু করকট গাছের বন দিয়ে ঘেরা। দক্ষিণ দিকের দেয়ালে এই দরজাটাই ভেতরে প্রবেশের বা বাইরে বের হবার একমাত্র পথ…”
বাবর আর বাবুরী নিজেদের ভিতরে দৃষ্টি বিনিময় করে। এর চেয়ে ভালো সংবাদ আর হতে পারে না। সুলতান ভাবছে তিনি একটা দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে অবস্থান নিয়েছেন। আসলে তিনি একটা ফাঁদে আঁকা পড়েছেন।
*
চারদিন পরে, দূর্গ থেকে সামান্য দূরে যে সংক্ষিপ্ত সমতল ভূমি রয়েছে। সেখানে স্থাপিত সামরিক শিবিরে বাবর তার লাল রঙের সেনাপতির তাঁবুতে দাঁড়িয়ে হাতে চামড়ার দাস্তানা পরিধান করে। সে যেমন আশা করেছিলো, আগের দিন সন্ধ্যাবেলা সুলতান তার পাঠানো আত্মসমর্পন আর ক্ষমা ভিক্ষার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এবার সময় হয়েছে তাকে তার অবাধ্যতার জন্য শিক্ষা দেবার। রাতের আঁধারে তার লোকেরা ষাঁড়ের গাড়ির পেছনে বেঁধে নিয়ে আসা চারটা কামান দূর্গের প্রবেশদ্বার থেকে চারশ গজ দূরে স্থাপন করেছে। যতোটা নিরবে সম্ভব, আলী কুলীর লোকেরা মাটির ঢিবি তৈরি করে তাতে কামানগুলো স্থাপিত করে তারপরে সেগুলো লতাপাতা, ঝোপঝাড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছে যতোক্ষণ না আক্রমণের সময় হয়।
আক্রমণ শুরু করার সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে। বাবরের সব সেনাপতিকে আলাদা আলাদা আদেশ দেয়া হয়েছে। দূর্গের দক্ষিণ দিকের সমভূমির উপর দিয়ে মূল বাহিনী এগিয়ে গিয়ে প্রথমেই সামনে থেকে আক্রমণ শুরু করবে। সেই ফাঁকে, ম্যাচলকধারী সৈন্যরা তাদের অনুসরণ করবে, দূর্গপ্রাকারের উপরে অবস্থানরত প্রতিরোধকারীদের নিষ্ক্রিয় করতে। অবশেষে বাবর যখন সময় হয়েছে বলে মনে করবে, সে কামানগুলোকে কার্যকরী করে তুলবে।
ইস্পাতের মতো ধূসর আকাশের নিচে, বাবর আক্রমণ শুরু করার নির্দেশ দেয়। দূর্গের পশ্চিম কোণের তিনশ গজ নিচে অবস্থিত একটা নতুন সুবিধাজনক স্থানের প্রান্তে, বাবর আর বাবুরী পাশাপাশি ঘোড়ায় উপবিষ্ট অবস্থায়, পাথুরে ঢাল বেয়ে দূর্গের দিকে অশ্বারোহী তীরন্দাজদের ছুটে যেতে দেখে। আগুয়ান ঘোড়ার ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে তার ক্রমাগত তীর ছুঁড়ছে। দূর্গের দেয়ালের কাছে পৌঁছে, তারা সাথে নিয়ে আসা মইগুলো দূর্গের প্রবেশপথের বামদিকের দেয়ালে স্থাপন করে। তারা যখন এসব করছে, আলী কুলী আর তার ম্যাচলকধারীর দল দূর্গ প্রাকারের দেয়ালের উপরে প্রতিরোধী যোদ্ধাদের কেউ উঁকি দিলে তাদের লক্ষ্য করে গুলি করে।
দু’জন বাজাউরি যোদ্ধা সাথে সাথে ধরাশায়ী হয়। বাবর যেখানে অবস্থান করছে। সেখান থেকেই সে প্রতিরোধকারীদের হতাশা আর ক্ষোভ অনুভব করতে পারে। আরো অনেক যোদ্ধা ধরাশায়ী হয়। বাজাউরি যোদ্ধার দল যখন বুঝতে পারে গনগনে লাল ধাতব বলগুলো তাদের ঢাল আর বর্ম ভেদ করতে সক্ষম তখন দূর্গ প্রাকারের পেছন থেকে তারা টুপটাপ খসে পড়তে শুরু করে।
বাবরের লোকেরা ততোক্ষণে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশাপাশি দুজন করে মই বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করেছে। মই আর দেয়ালের সাথে যতোটা সম্ভব নিজেদের চেপে ধরে রেখে তারা তাদের গোলাকৃতি ঢাল দিয়ে মাথা ঢেকে রাখে উপর থেকে নিক্ষিপ্ত পাথরের আঘাত থেকে বাঁচতে। আলী কুলী ইতিমধ্যে নিজের লোকদের গুলিবিদ্ধ হবার আশঙ্কায় ম্যাচলকধারীদের গুলি বন্ধ রাখার আদেশ দিয়েছেন। বাবা ইয়াসাভাল, হিরাত থেকে আগত অসীম সাহসী এক যোদ্ধা। প্রথমে দূর্গের ছাদে উঠে দাঁড়ায় এবং দ্বাররক্ষীর প্রকোষ্ঠের দিকে অমিত বিক্রমে এগিয়ে গিয়ে, প্রধান প্রবেশদ্বার আটকে রাখা কালো রঙের ধাতব বেষ্টনী সে তার সাথের যোদ্ধাদের নিয়ে গুটানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মাস্কেটের তাণ্ডব বন্ধ হতে প্রতিরোধকারীরা এবার পুনরায় সাহসী হয়ে উঠে। বাবর তাদের দৌড়ে দূর্গপ্রাকারে উঠে এসে, বাবা ইয়াসাভালের সাথের মুষ্টিমেয় সংখ্যক যোদ্ধাদের উপরে কাঁটাওয়ালা গদা আর রণকুঠার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের দ্বাররক্ষীর প্রকোষ্ঠ থেকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে।
