মহত্ত্বের স্বপ্ন দেখা সহজ। সেটা অর্জন করা কঠিন। কাবুলে নিয়ে আসা কামান আর মাস্কেট চালনায় দক্ষ একদল সৈন্যবাহিনী গঠনে বাবুরী আর তার ভাড়াটে তুর্কী যযাদ্ধাদের ছয় মাস লেগে যায়। ইত্যবসরে কাবুলের অধিবাসীরা যখন ধীরে ধীরে কামানের গর্জন আর মাস্কেটের তীক্ষ্ণ আলোর ঝলকানির সাথে পরিচিত হয়ে উঠছে তখন বাবর বাবুরীর একটা চিঠি আর স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে তার ব্যক্তিগত দূত তুরস্কের সুলতানের কাছে পাঠায় ইস্তাম্বুলের বন্দুক-নির্মাতা আর ঢালাই কারখানা থেকে আরো চারশ মাস্কেট আর ছয়টা কামান পাঠাবার অনুরোধ জানিয়ে।
বাবরের জন্য আরো সুখবর অপেক্ষা করছিলো। সে জানতে পারে বাবুরীর সাথে কাবুলে আসা ধূসর দাড়ি শোভিত ওস্তাদ তূর্কী গোলন্দাজ আলী কুলীর দক্ষ নির্দেশনায় তার নিজস্ব অস্ত্র নির্মাতারা নতুন অস্ত্র নির্মাণে দ্রুত কুশলতা অর্জন করছে। মাস্কেট আর কামানের ব্যাপারে তার অসাধারণ দক্ষতা- বিশেষ করে পাঁচ বছর আগে, ম্যাচলকের চিড় ধরা ব্যারেল বিস্ফোরিত হয়ে তার ডান হাতের দুটো আঙ্গুল উড়ে গিয়েছে।
রাতের পর রাত, বাবর বাবুরীর সাথে বসে কথা বলেছে, তাকে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে কামান আর ম্যাচলক ব্যবহৃত হয়েছে এমন সব যুদ্ধের ব্যাপারে সম্ভাব্য সবকিছু জানতে চেষ্টা করেছে। কোনো পরিস্থিতিতে এই আয়ুধ সবচেয়ে বেশি কার্যকর? সম্মুখ সমরে নাকি অবরোধ প্রয়াসে? ঘোড়সওয়ার বাহিনী আর তীরন্দাজদের হাত থেকে ম্যাচলক বন্দুকধারী আর গোলন্দাজদের কিভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব? সনাতন আক্রমণের ধারায় এই অস্ত্র কি পরিবর্তন এনেছে? যুদ্ধে এই অস্ত্র ব্যবহারের আগে সে এদের বিষয়ে সবকিছু ভালোমতো জেনে নিতে চায়।
শহরের বিশাল খিলানাকৃতি সরাইখানা। যেখানে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বণিকের দল খোলা প্রাঙ্গণের মাঝে অবস্থিত উঁচু পাথরের মঞ্চে পসরা সাজিয়ে বিক্রি করার পাশাপাশি গল্পগুজব করে থাকে। সেখানে বাবর তার লোকদের খবর সংগ্রহের জন্য পাঠায়। বাবরের লোকেরা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে কখনও কখনও বিচ্ছিন্ন প্রশ্ন করে। হিন্দুস্তান থেকে আগত বণিকদের কাছ থেকে ইবরাহিম লোদীর দরবারের জৌলুস, গোলাপী বেলেপাথর দিয়ে সজ্জিত বিশাল প্রাসাস নিয়ে বারফট্টাই করতে শোনা যায়। কিন্তু তিনি- বা হিন্দুস্তানের অন্য কোনো শাসক কামান বা ম্যাচলকের অধিকারী সে বিষয়ে তাদের কাছ থেকে সামান্যতম গল্পও তারা বের করতে পারে না।
কিন্তু, এখন জানুয়ারি মাসের এক ঝকঝকে শীতল দিনে, বাবর অবশেষে এসব অস্ত্রের ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ এমন শত্রুর বিপক্ষে এর প্রতিক্রিয়া নিজের চোখে দেখবার জন্য বাবর একটা অভিযানে বের হয়। কাবুলের করদ রাজ্য, বাজারের নতুন সুলতানকে সে শত্রু হিসাবে বেছে নেয়। যে নতুন রাজত্ব পেয়ে যৌবনের উদ্দীপনায় বাবরকে প্রথা অনুসারে বাৎসরিক শস্য, ষাঁড় আর ভেড়ার পাল উপঢৌকন হিসাবে দিতে অসম্মতি জানিয়েছে।
পাহাড়ের অনেক উঁচুতে ওক, জলপাই আর সোমরাজ গাছের ঘন অরণ্যে, ময়না পাখির কলরবে মুখরিত স্থানে বসবাসরত, বাজাউরীরা বিচিত্র ধর্মবিশ্বাসের অধিকারী পৌত্তলিক সম্প্রদায়। কোনো বাজাউর রমণী মারা গেলে, তারা তার শবদেহ একটা খাঁটিয়ায় শুইয়ে দিয়ে সেটার চার পায়া ধরে উঁচুতে তুলে। মৃত রমণী যদি আচারনিষ্ঠ জীবনযাপন করে থাকে, বাজাউররা বিশ্বাস করে তাহলে লোকদের উঁচুতে তুলে ধরা খাঁটিয়া এমন ভীষণভাবে কেঁপে উঠবে যে শবদেহ মাটিতে নিক্ষিপ্ত হবে। তখনই কেবল তারা শোকের কালো লেবাস পরিধান করে বিলাপ করা শুরু করবে। কিন্তু যদি, মৃত রমণীর শবদেহ কোনো ধরণের কম্পন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। তারা সেটাকে অশুভ জীবনের ইঙ্গিত বলে বিবেচনা করে এবং মৃতদেহটা তখন দায়সারা ভঙ্গিতে আগুনে নিক্ষেপ করা হয় পুড়ে ছাই হবার জন্য।
অদ্ভুত এসব লোকদের শাসক তাকে একটা মোক্ষম সুযোগ দিয়েছে। বাবুরীকে পাশে নিয়ে, পদাতিক আর গোলন্দাজ বহরের একটা চৌকষ দলের নেতৃত্ব দিয়ে কাবুল থেকে বের হয়ে আসবার সময়ে বাবর ভাবে, সদ্য প্রশিক্ষিত দলটাতে ম্যাচলকধারী সৈন্য আর গোলন্দাজরা রয়েছে। যাদের প্রত্যেককে আলী কুলী নিজে আজকের অভিযানের জন্য মনোনীত করেছে। আর চারটা কামান রয়েছে। তারা উত্তরদিকে বাঁক নিয়ে পাহাড়ী এলাকার ভিতর দিয়ে বাজাউরের দিকে এগিয়ে যায়। আগেকার দিনে, এধরণের হামলার সময়ে বাবর আর তার অনুগত বাহিনী দ্রুত নির্মম ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে অতর্কিতে শত্রুর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়তো। কিন্তু যাঁড়ের গাড়ির পেছনে বেঁধে গড়িয়ে নেয়া কামানের কারণে তাদের অগ্রসর হবার গতি হ্রাস পেয়েছে যা পর্যবেক্ষকদের সতর্ক সংকেত পাঠাবার সুযোগ খামোখাই বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাবর ঘোড়ার পিঠে এগিয়ে যাবার সময়ে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যায়। মুখের উপরে এসে আছড়ে পড়া শীতল বাতাসে তার কোনো ভাবান্তর ঘটে না। কাবুল ত্যাগ করার ঠিক আগে আগে একটা দিনপঞ্জিকায় পাঠ করা অনুচ্ছেদের কথা তার মনে ঘুরপাক খেতে থাকে: “তৈমূর সাহসী আর পরাক্রমশালী যোদ্ধাদের বিশেষ খাতির করতেন। যাদের সাহায্যে তিনি আতঙ্ক আর বিভীষিকার ঝড় বইয়ে দিতেন এবং সিংহের মতো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতেন প্রতিপক্ষকে এবং এইসব যোদ্ধা আর যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের নৈপূণ্য ব্যবহার করে তিনি পর্বতপ্রমাণ প্রতিবন্ধকতা অনায়াসে টপকে যেতেন…” অনুচ্ছেদটায় কাপুরুষদের জন্য তৈমূরের তিরস্কারের কথাও বলা হয়েছে। কোনো যোদ্ধা, তার পদমর্যাদা যাই হোক, যুদ্ধ ক্ষেত্রে কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে তিনি তাদের মাথা মুড়িয়ে পুরো দেহ লাল রঙে রাঙিয়ে দিতেন। তারপরে তাদের মেয়েদের কাপড় পরিয়ে বেধড়ক পিটাতে পিটাতে সহযোদ্ধাদের গালিগালাজের মাঝে অস্থায়ী শিবিরের ভিতর দিয়ে টেনে হিঁচড়ে বধ্যভূমির দিকে নিয়ে যাওয়া হতো। তৈমূর ক্ষমা করতে জানতেন না।
