“নমুনাটা একবার দেখুন!” বাবুরী গর্বিত কণ্ঠে বলে। “চালতানে, সুলতান সেলিম ঠিক এধরণের একসারি কামান, গরুর গাড়ির বহরের দ্বারা সুরক্ষিত অবস্থায়, ব্যবহার করেছিলেন ফলে পারস্যের সেনাবাহিনীর কিছুই করার ছিলো না…এরপরে তূর্কী পদাতিক সামনে এগিয়ে গিয়ে হাতের ম্যাচলক দিয়ে তখন প্রতিরোধ গড়তে ইচ্ছুক বাকী পার্সী সৈন্যদের ধরাশায়ী করে…”
বাবুরী হাততালি দিতে তার লোকেরা একটা লম্বা সরু কাঠের বাক্স বয়ে এসে তার পায়ের কাছে নামিয়ে রাখে। “আপনি বহুদিন আগে আমাকে তীরন্দাজির প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। আপনি আমাকে ওস্তাদ ধনুর্ধর, কোর বেগি, বানিয়েছিলেন। আমি এবার আপনাকে এটার সাহায্যে নিশানাভেদ করতে শেখাবো।” বাবুরী ঝুঁকে পড়ে বাক্স থেকে একটা লম্বা ধাতব বস্তু তুলে নেয়। “সর্বোৎকৃষ্ট ইস্পাত দিয়ে এটা নির্মাণ করা হয়েছে।”
“আকৃতি দেখে ছোট কামান বলে মনে হচ্ছে।”
“ঠিক তাই। এটাকে বলে মাস্কেট- ক্ষুদ্রাকৃতি কামান। ভাল করে খেয়াল করে দেখেন এর একটা লম্বা ব্যারেল রয়েছে ধাতব গোলা নিক্ষেপ করার জন্য। এর ম্যাচলক যান্ত্রিক ব্যবস্থা, এই নামেই এটাকে অভিহিত করা হয়। এটা অনেকটা এভাবে কাজ করে। আপনি এখানে বারুদ দেবেন, এই পাত্রে, তারপরে একটুকরো পাতলা দড়ির প্রান্তে অগ্নি সংযোগ করবেন। আগুনের শিখা বারুদ স্পর্শ করে সেটাকে প্রজ্জ্বলিত করবে এবং উৎপন্ন শক্তি ব্যারেল থেকে ক্ষুদ্র গোলকটা প্রচণ্ড বেগে নিক্ষেপে সাহায্য করবে।”
“কতো দূরে?”
“কমবেশি দুইশ গজ দূরত্বে। কিন্তু পঞ্চাশ গজের ভিতরে সবচেয়ে কার্যকরী এর নিশানা। পরীক্ষা করে দেখেন!”
তূর্কীদের একজন একটা দণ্ডের মাথায় লক্ষ্যবস্তু হিসাবে তরমুজ স্থাপন করতে, বাবুরী পাত্রে বারুদ ঢেলে গুলিটা ব্যারেলে প্রবেশ করায়। “ওজনের কারণে সৃষ্ট অসুবিধা নিশানা স্থির করার সময়ে এই হাতলের উপর আপনি ব্যারেলটা স্থাপন করবেন। বাবুরী চারফিট লম্বা একটা ধাতব দণ্ডের দিকে, যার মাথার দিকটা দুভাগ হয়ে অনেকটা অঙ্কুশের আকার নিয়েছে, সেদিকে ইঙ্গিত করে। দণ্ডটার একপ্রান্ত মাটিতে প্রোথিত করে সে বাবরকে দেখায় কিভাবে ব্যারেলটা সেটায় স্থাপন করতে হবে। “ব্যারেলের উপর দিয়ে সোজা নিশানার দিকে তাকান, এবং মনে রাখবেন যখন গুলি করবেন তখন একটা ধাক্কা অনুভব করবেন তাই সেজন্য প্রস্তুত থাকবেন।”
বাবর মাস্কেটটা নিয়ে সেটার বাট নিজের কাঁধে স্থাপন করে বাম চোখ বন্ধ করে ডান চোখে চকচকে ব্যারেলটা বরাবর তাকায়। সে তরমুজটা দৃশ্যপটে দেখতে পেয়েছে বোঝার পরে মাথা নেড়ে ইঙ্গিত করে। বাবুরী দড়ির প্রান্তে অগ্নিসংযোগ করে যা নিমেষে জুলতে শুরু করে।
“মাস্কেটটা স্থির রাখবেন…” বাবুরীর কথা শেষ হবার আগেই একটা তীক্ষ্ণ শব্দে ধাতব বলটা নিক্ষিপ্ত হয় এবং তরমুজের উধ্বাংশ নিমেষে কমলা রঙের ছাতুতে পরিণত হয়… “দারুণ। কিন্তু আমার অভিজ্ঞ বন্দুকবাজরা এর সাহায্যে কি ভেল্কি দেখাতে পারে সেটা আপনাকে দেখাই…” সে আরেকপ্রস্ত লক্ষ্যবস্তুর দিকে ইঙ্গিত করে: পঞ্চাশ গজ দূরে একটা কাঠের পায়ার উপরে স্থাপিত টেবিলে রাখা পনেরটা খড়ের পুতুল। বাবুরীর সমান সংখ্যক বন্দুকবাজ সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে নিশানা স্থির করে। মাস্কেটে বারুদ ভরে এবং একের পর এক নিখুঁত দক্ষতায় লক্ষ্যভেদ করে। তারপরে পিছিয়ে এসে চটপটে ভঙ্গিতে মাস্কেটে বারুদ ভরে এবং সাবধান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পনের জনের বারুদ ভরা শেষ হতে তারা একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে দাঁড়িয়ে হাতলের উপরে ব্যারেল স্থাপন করে আরো দূরে স্থাপিত মাটির পাত্র লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এবারও প্রতিটা লোকই লক্ষ্যভেদ করে।
“অবশ্য যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝে, আঙ্গুল কাঁপতে পারে, লক্ষ্যবস্তু নড়াচড়া করে কিন্তু আমি এই বন্দুক দিয়ে আগুয়ান সৈন্যদের সারি ছিন্ন ভিন্ন করতে দেখেছি।”
তার বন্ধুর প্রদর্শিত এই অলৌকিক অস্ত্রের ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করে বাবরের মনে ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে থাকা ভাবনা কথায় প্রকাশ করতে গিয়ে সে বাবুরীর কাঁধ জড়িয়ে ধরে নিজের শব্দ সতর্কতার সাথে নির্ধারণ করে। তার আর তার সাম্রাজ্যের উপরে যেনো আরো একবার উজ্জ্বল গনগনে ক্যানোপাস মেঘের আড়াল সরিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে।
“তুমি কেবলই আমার বন্ধু নও। তুমি আমার প্রেরণা। তুমি অস্ত্রের চেয়েও বেশি কিছু আমার জন্য নিয়ে এসেছো…এখন পর্যন্ত, আমার, হিন্দুস্তানে একটা পুরোদস্তুর আক্রমণের আকাক্ষার কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল না। আমার না ছিলো লোকবল, না ছিলো কোনো বাড়তি সুবিধা। প্রতিপক্ষ ছিলো অগণিত আর শক্তিশালী। তাদের অধিরাজ দিল্লীর গর্বিত, অহংকারী ইবরাহিম লোদি। হিন্দুস্তান দখল করতে হলে আমাকে তার বিশাল সেনাবাহিনী আর যুদ্ধবাজ হাতির বহরকে পরাস্ত করতে হবে। এই নতুন অস্ত্রের সাহায্যে আমি দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি কিভাবে তাকে পরাজিত করা সম্ভব। আমার জন্মস্থানে আমি হয়তো তৈমূরের মতো মহান সম্রাটে পরিণত হতে পারবো না। কিন্তু এই কামান আর বন্দুকের সাহায্যে আমি তার সিন্ধু থেকে দিল্লী অভিযানের মাত্রা ছাপিয়ে যেতে পারবো। এতোগুলো বছর আমরা যে স্বপ্ন দেখেছি এবার সেটা পূর্ণ হবে।”
৪.২ রক্ত আর বজ্রের হুঙ্কার
২১. রক্ত আর বজ্রের হুঙ্কার
