“কিন্তু এই জীবনে কোনো মহত্ত্ব নেই। আমার আত্মা আজঅব্দি যে গৌরবের জন্য লালায়িত, সেটা কোথায়? আমার প্রায় দুই কুড়ি বয়স হতে চললো। আর আমিও আমার মরহুম আব্বাজান যেমন ফারগানায় আটকে গিয়েছিলেন ঠিক তেমনই নিয়তি বরণ করতে চলেছি। তার চেয়েও বড় কথা আমাদের চির পরিচিত সেই পুরাতন তৈমূরীয় জগত ধবংস হয়ে গেছে। উজবেক বর্বরের দল চিরতরে তা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। আমার জন্য তার কিছুই আর বেঁচে নেই।” বাবরের কণ্ঠস্বর কেঁপে যায়। সে বাবুরীর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, “আমি জানি আমার কথাগুলো স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞের মতো শোনাচ্ছে… আমি এই কথাগুলো কখনও কাউকে বলিনি, আর তোমাকেও বলাটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না…তুমি সবসময়ে আমার দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুহূর্তগুলো নিয়ে নির্মম রসিকতা করেছো…”
“না, আপনার দ্বিধা নিয়ে রসিকতা করিনি কখনও। কেবল আপনার আত্ম-বঞ্চনার অনুভূতি আমার অসহ্য মনে হয়। কিন্তু বিগত বছরগুলো আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। নিজের মতামতের উপরে আমার অশেষ আস্থা ছিলো, যা ঔদ্ধত্যের পর্যায়ে পড়ে। আমি আপনার চেয়েও অহংকারী ছিলাম। যদিও আপনিই ছিলেন আমাদের সুলতান, আমি নই। এখন আমি বুঝতে পারি…আমি এখন জানি মনেপ্রাণে কিছু কামনা করে সেটা অর্জনের পথ খুঁজে না পেলে কেমন কষ্টকর সেই অভিজ্ঞতা।”
“তুমি আবার কিসের মোহে পড়লে?”
“ফিরে আসবার…”
“তুমি থাকতে এসেছো?”
“হ্যা…একসাথে অন্তত আরেকটা যুদ্ধ লড়াই না করা পর্যন্ত…”
*
বাবুরী পাঁচ ফিট লম্বা একটা ব্রোঞ্জের নলের একপ্রান্তে আলতো করে চাপড় দেয়। “এটাকে ব্যারেল বলে। প্রথমে বারুদ ভর্তি কাপড়ের ব্যাগ আর গোলা এটার ভিতরে ঠেসে ভরা হয়। আর এটা,” সে ব্যারেলের শেষ প্রান্তে ফুলে থাকা একটা জায়গার দিকে ইঙ্গিত করে, “এটাকে বলে ব্রীচ। এই ছোট ফাটলটা খেয়াল করেছেন? তূর্কীরা এটাকে বলে স্পর্শ-র। এখানেই- আগুন দেবার ঠিক আগে গোলন্দাজের দল একটা তীক্ষ্ণ ধাতব শলাকা প্রবিষ্ট করায়- গোঁজ- বারুদের বস্তা ছিঁড়ে দিতে। তারপরে একজন একটা জ্বলন্ত মোম মাখানো শলাকা স্পর্শ-রন্ধ্রে প্রবিষ্ট করে ব্যারেলের ভিতরের মূল বারুদে অগ্নিসংযোগ করতে।”
“একটা গোলা কতদূরে নিক্ষেপ করা সম্ভব?”
“পুরো ব্যাপারটা ব্যারেলের দৈর্ঘ আর গহ্বরের ব্যাসের উপরে- যাকে বোর বলা হয়। ব্যারেল যত লম্বা আর বোর যতো বড় হবে, নিক্ষেপণ পাল্লা ততোবেশি হবে। তূর্কী সুলতানের অনেক কামান আছে যেগুলোর ব্যারেল দশফিট বা তারচেয়ে বেশি লম্বা এবং ওজন বিশ হাজার পাউন্ডের বেশি। কিন্তু ইস্তাম্বুল দখল করার সময়ে সত্তর বছর আগে যে অতিকায় তূর্কী বোমারু ব্যবহার করেছিলেন তার তুলনায় এগুলো সবই দুগ্ধপোষ্য। আপনি যদি সেটা একবার দেখতেন! ত্রিশ ইঞ্চি বোরের সতের ফুট লম্বা ব্যারেল। আর সেটা দিয়ে বারোশো পাউন্ডের গোলা এক মাইল দূরে নিক্ষেপ করা যায়। তারা বলে দশ মাইল দূর থেকে এর আওয়াজ শোনা যায়। কিন্তু সেটা দিয়ে দিনে মাত্র পনের বার গোলাবর্ষণ করা যায় আর দুইশ গোলন্দাজ প্রয়োজন হয় সেটা পরিচালনা করতে। এতই ভারী সেটা যে দশ হাজার লোক মিলে সেটা উত্তোলন করতে পারে এবং সত্তরটা শক্তিশালী আঁড় সেটা স্থানান্তরিত করতে পারে, এগুলোর মতো না।”
“আমাকে এর কেরামতি দেখাও…” বাবর অলৌকিক অস্ত্রটার কারিশমা দেখতে আগ্রহী হয়ে উঠে। তিনশ গজ দূরে বাবরের লোকদের তৈরি করা একটা দশ ফিট উঁচু স্তূপকে নিশানা হিসাবে নির্বাচন করা হয়।
মাথায় এঁটে বসা চামড়ার গোলাকার টুপি, চামড়ার জোব্বা আর চোগা পরিহিত পাঁচজন যোদ্ধাকে বাবুরী আদেশ দেয়। পোলো খেলার ম্যালেটের মতো অনেকটা দেখতে, একটাই পার্থক্য যে এর মাথার দিকটা ভেড়ার চামড়া দিয়ে মোড়া। একটা লম্বা লাঠির সাহায্যে একজন বারুদের থলে ব্যারেলের ভিতরে ঠেসে ভরে। তারপরে অন্য দু’জন হাঁফাতে হাঁফাতে একটা গোলাকার পাথরের খণ্ড উঁচু করে ব্যারেলে প্রবেশ করায় আবার সেই লাঠিটার সাহায্যে- ব্রীচের ভিতর দিয়ে সেটা গড়িয়ে দেয়। এদের কাজ শেষ হতে, চতুর্থ আরেকজন গোঁজ হাতে এগিয়ে আসে বারুদের থলে ফাটাতে সেটা ফাটলের ভিতরে প্রবিষ্ট করায় এবং স্পর্শ-রন্ধ্রের চারপাশে সামান্য আলগা বারুদ ছড়িয়ে দেয়- “নিশ্চিত হবার জন্য,” বাবুরী ব্যাখ্যা করে।
“পেছনে সরে দাঁড়ান।” বাবর নিরাপদ দূরত্বে এসে দাঁড়িয়েছে নিশ্চিত হবার পরেই কেবল সে কামানের দিকে এগিয়ে যায় এবং ব্যারেলের নতি পরীক্ষা করে। সন্তুষ্ট হয়ে সে পিছনে সরে এসে, পঞ্চম গোলন্দাজকে ইশারা করে। তার হাতে একটা অঙ্কুশের মত জিনিস। যেটার সাথে তেলে ভেজানো একটা সুতা লাগানো, যার একপ্রান্তে আগুন জ্বলছে। লোকটা বাবুরীর দিকে তাকায়।
“আগুন দাও!”
লোকটা তার হাতে ধরা প্রজ্জ্বলিত সলতে স্পর্শ-রন্ধ্রে খুঁজে দিয়েই লাফিয়ে পেছনে সরে যায়। মুহূর্ত পরে, একটা বিকট বুম শব্দের সাথে ব্যারেল থেকে পাথরটা নিক্ষিপ্ত হয়ে তৃণভূমির উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আছড়ে পড়ে। একটা ধোঁয়ার মেঘের জন্ম হয় এবং সেটা কেটে যেতে, বাবর তাকিয়ে দেখে পাথরের চূড়াটা এখন একটা ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে।
