“শয্যাসঙ্গিনী হিসাবে ভালো?”
“যথেষ্ট ভালো…”
“এরাই কি আপনার ছোট দুই ছেলের মা?”
“ছয় বছর আগে গুলরুখের গর্ভে কামরানের এক ভাই হয়েছে, পিচ্চি আসকারী। তারপরে তিন বছর পরে, দিলবারের একটা ছেলে হয়েছে।”
“আর মাহাম? তার জন্য এটা অবশ্যই কষ্টকর।”
বাবরের মুখটা শক্ত হয়ে যায়। বহু বছর আগে…নববধূ হিসাবে তার সামনে যখন পুরো জীবনটা পড়ে ছিলো, সে তখন কোনো প্রশ্ন না করেই গুলরুখের সাথে আমার বিয়েটা মেনে নেয়। কিন্তু আমি যখন অন্য স্ত্রী গ্রহণ করি তখন তার বিষাদময়তা অস্বাভাবিক। আমার নবপরিণীতা স্ত্রীরা গর্ভবতী হবার খবর চাউর হলে তার কষ্টের কোনো সীমাপরিসীমা থাকে না। বাইসানগার, তার নিজের বাবা, কিংবা খানজাদা তাকে শান্ত করতে পারেনি। একরাতে সে কাপের ভাঙা টুকরো দিয়ে সে নিজের কব্জি কাটতে চেষ্টা করে। আমার হেকিম মাদকদ্রব্য কামালি আর সুরার সাহায্যে। প্রস্তুত শক্তিশালী মিশ্রণ তৈরি করে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে…”
“আর সে এখনও অসুখী?”
“না…অবশ্য তার একটা কারণ আছে। চার বছর আগে, হিন্দুস্তানের সীমান্তের কাছে আমি একটা অভিযানে যাই, মাহাম তখন আমাকে চিঠি লিখে জানায় যে দিলবার সন্তানসম্ভবা। সে চিঠির শেষে লিখেছিলো, “তার ছেলে কি মেয়ে হবে, আমি জানি না। তার সন্তান আমাকে দিন, আমি নিজের সন্তানের মতো তাকে মানুষ করে আমার দুঃখ ভুলে থাকতে চাই।”
“আপনি কি বলেছিলেন?”
“সিদ্ধান্তটা নেয়াটা কঠিন ছিলো। আমি জানতাম দিলবারের সাথে আমি অন্যায় করছি। কিন্তু মাহাম খুশি হবে এমন কিছু একটা থেকে আমি তাকে কিভাবে না বলি? আমি তাকে লিখে পাঠাই দিলবারের সন্তান এখনও ভূমিষ্ঠ না হলেও, সেটা মাহামেরই সন্তান। আর যেমনটা সবাই ভেবেছিলো, সেবার দিলবারের ছেলেই হয়েছিলো…”।
“তার নাম কি?”
“হিন্দাল।”
বাবুরী বিস্ময়ে চোখ পিটপিট করে। তার মানে হিন্দুস্তানের বিজেতা।”
“মুহূর্তের উত্তেজনার বশে আমি নামটা রেখেছিলাম। আমি অভিযানে থাকাকালীন অবস্থাতেই আমি হিন্দালের জন্মের খবর পাই। হয়তো পুরোটাই আমার কল্পনা ছিলো, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিলো যে সমস্ত সম্পদ আর সম্ভাবনা নিয়ে হিন্দুস্তানেই আমার ভাগ্য নিহিত আছে। কেবল আমি যদি একটা উপায় খুঁজে বের করতে পারি…”
“বহু বছর আগে আমি আর আপনি যখন হিন্দুস্তানের সীমান্তের কাছে অভিযান পরিচালনার সময়ে আলাপ করেছিলাম। আপনার কি সেই অনন্ত আকাশ আর কমলা রঙের তীব্র সূর্যের কথা মনে আছে?”
“অবশ্যই- আর আমাদের দেখা সেই হ্রদের কথা যেখানে লাল ডানার পাখির ঝাঁক দেখে মনে হয়েছিলো কেউ বুঝি সেটা রক্তে রাঙিয়ে দিয়েছে…সেসব স্মৃতি ভুলে যাওয়াটা বেশ কষ্টকর।” বাবর হলুদ জরির কারুকাজ করা তাকিয়ায় হেলান দেয়া অবস্থা থেকে উঠে খোলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। রাতের আঁধারে যেমনটা থাকার কথা, নিচের প্রাঙ্গনের দুপাশের প্রবেশপথে জ্বলতে থাকা মশালের আলোতে সবকিছু থমথম করছে। “কিন্তু মুশকিল হলো হিন্দালের এখন তিন বছর বয়স। আর আমি হিন্দুস্তান বা অন্য কোথাও আমার স্বপ্নের সাম্রাজ্য স্থাপনের কাজ কিছুই আরম্ভ করতে পারিনি…আমি জানি আমার যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। আমার অভিজাত অমার্ত আর সেনাপতিরা যখন আমাকে দেখে- এমনকি বাইসানগার পর্যন্ত যে বহুদিন আমার সাথে রয়েছে আমার মাঝে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত এমন একজন সুলতানকে দেখতে পায় যাকে বিব্রত করার মতো তার কোনো প্রতিপক্ষ নেই। তারা কখনও আমাকে ঘিরে থাকা হতাশা বা অপূর্ণতা টের পায় না। আর তার টের পাবেই বা কিভাবে? আমি কখনও তাদের সেটা বলতে পারবো না…”
“খানজাদা এসব কিছু টের পায় না? আমার ধারণা আপনার বোনের চোখে এসব যাবে না।”
“সে আমার ভিতরের অস্থিরতা টের পায়- আমি নিশ্চিত। কিন্তু তার নিজের সেই ভাগ্য বিপর্যয়ের পরে আমি তাকে আমার আকাশচুম্বী স্বপ্ন আর স্বার্থপর ভাবনার বোঝা তার উপরে চাপিয়ে দিতে চাই না- তার নিজের সহ্য করা মানসিক কষ্টের সাথে এর কোনো তুলনাই চলে না…আর মাহামের সাথেও আমি এসব নিয়ে আলোচনা করতে পারবো না। তাহলে সে এমনই বিষণ্ণ হয়ে উঠবে যে, আমার তখন মনে হবে আমি বুঝি তারই সমালোচনা করছি। শুধু তুমি যদি এখানে থাকতে তাহলে সবকিছু হয়তো আলাদা হতো। তোমাকে আমি বোঝাতে পারবো না যে, আমার জীবনটা কেমন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। আমি নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। এবং প্রাচুর্যের মাঝে জীবন কাটাচ্ছি, কিন্তু কখনও কখনও ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে এই একই ঈর্ষণীয় জীবনযাপন করতে দেখে একে কলুর বলদের মতো জীবনযাপন মনে হয়। মাঝে মাঝে নিজের হতাশার বোঝা লাঘব করতে আমি সুরাপানের আসর আয়োজন করি। সেখানে আমার অমাত্যদের সাথে মিলিত হয়ে আমরা আমার রাজ্যের বিভিন্ন শক্তিশালী সুরার স্বাদ পরখ করি- যেমন এই মুহূর্তে আমরা গজনীর লাল ওয়াইন পান করছি। আমরা ভোর পর্যন্ত পানাহারে মত্ত থাকি। যখন আমার পরিচারকের দল আমাকে বহন করে আমার কক্ষে পৌঁছে দেয় মাথা বিস্মৃতির অতলে ডুবে আছে। কখনও কখনও আমি আফিম আর ভাঙ- গাঁজা সেবন করি। তারা আমাকে একটা উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত সব সম্ভবের দুনিয়ায় নিয়ে যায়।”
“এতে লজ্জিত হবার কিছু নেই।”
