“কাবুল ত্যাগ করার পরে তুমি কোথায় গিয়েছিলে?”
“আমি ধারণা করেছিলাম আপনি আমাকে চোর খোঁজার মতো খুঁজবেন। আর তাই আমি এমন স্থানে গিয়েছিলাম যেখানে আপনি আমাকে খুঁজে পাবেন না। আমি একটা সওদাগরী কাফেলার সাথে পশ্চিমে ইস্পাহানে চলে যাই। সেটা ছিলো একটা দীর্ঘ, কষ্টকর আর কখনও বিপজ্জনক একটা ভ্রমণ- পদে পদে উজবেক আর যাযাবর ডাকাত দলকে আমাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমরা শেষ পর্যন্ত যখন ইস্পাহানে পৌঁছাই ততদিনে বণিক দলের অনেক মারা গিয়েছে। তাদের মালপত্রের একটা ভালো অংশ খোয়া গিয়েছে। কিন্তু যোদ্ধা হিসাবে আমার কুশলতা সবার নজর কেড়েছে। কাফেলা দলের সর্দার উত্তরে তাবরিজে পশম আর রেশমের পসরা নিয়ে যাবে এমন একটা কাফেলার সাথে আমাকে যেতে অনুরোধ করে। আমি সেখানে গিয়ে জানতে পারি আপনি সমরকন্দ হারিয়েছেন। আর পারস্যের শাহ্’র সাথে আপনার মৈত্রীর বন্ধন ঘুচে গিয়েছে। আমি ফিরেই আসতাম কিন্তু কিছু একটা আমাকে ফিরে আসতে বাধা দেয়… সম্ভবত আমি হয়তো ভীত ছিলাম আপনি আমাকে কিভাবে গ্রহণ করবেন সে বিষয়ে…সম্ভবত আমার গর্ব আমাকে ফিরে আসতে বাধা দিয়েছিলো…তারপরে আমার কানে আসে তুরস্কের সুলতান তার সেনাবাহিনীতে ভাল বেতনে লোক নিয়োগ করছে। আমি আমার মতো আরো কিছু ভাগ্যান্বেষীর সাথে যোগ দেই। যাদের কেউ কেউ উত্তরে কাস্পিয়ান হ্রদের তীর থেকে এসেছিলো। আর আমরা একসাথে ইস্তাম্বুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। ‘সুলতানে যুদ্ধযাত্রায় অংশ নেবার জন্য…”
“হ্যাঁ, যদিও আমার এখানে আপনার পাশে থাকা উচিত ছিলো… সমরকন্দ আর শাহের ব্যাপারে আমার ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যেতে ব্যাপারটা আমাকে অস্থির করে তুলেছিলো। আমি প্রায়ই ভাবতাম সমরকন্দ পুনরায় আপনার হাতছাড়া হতে আপনি কতোটা কষ্ট পেয়েছিলেন…”।
“আমার সেটা প্রাপ্য ছিলো…”
তারা মাথা নত করে চুপচাপ বসে থেকে স্মৃতি রোমন্থন করে। তারপরে বাবুরী জোর করে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে এর বাইরে বের করে আনে। “আমি শুনেছি আপনি আরো স্ত্রী গ্রহণ করেছেন এবং হুমায়ুন আর কামরান ছাড়া আরও দুটো স্বাস্থ্যবান সন্তানের জনক হয়েছেন?”
“ঠিকই শুনেছো।”
“আপনি দেখছি পুরোপুরি সংসারী মানুষে পরিণত হয়েছেন। গ্রামের নিষিদ্ধপল্লীতে দু’পায়ের মাঝে আগুন নিয়ে আমি আর আপনি যখন ঘোড়া নিয়ে দাবড়ে বেড়াতাম, সেটা কত যুগ আগের কথা বলে আজ মনে হয়…ইয়াদগারকে আপনার মনে আছে?”
“অবশ্যই।” বাবর মুচকি হেসে বলে। “আমি মাঝে মাঝে ভাবি সে এখন কোথায় আছে? আশা করি উজবেকদের হাতে সে ধরা পড়েনি।”
“মাহাম কি এখনও আগের মতোই সুন্দরী আছে?”
“সে আগের মতোই আছে- একটুও মোটা হয়নি- আর গুলরুখও তেমনই আছে। তুমি কি আশা করেছিলে…? আমি আজও মাহামকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। তাকেই অন্যদের চেয়ে বেশি কামনা করি, কিন্তু…” বাবর ইতস্তত করে “…আমি প্রথমে যেমন আশা করেছিলাম, সে আমার তেমন সহচরীতে পরিণত হতে পারেনি। আমাদের দেহ আর কামনা মিলিত হয়, কিন্তু আমাদের মন সবসময়ে পরস্পরকে স্পর্শ করতে পারে না… আমি আমার নানীজান, আম্মিজান বা খানজাদার কাছে সবকিছু খুলে বলতে পারি- অভিযান, গুরুত্বপূর্ণ শাহী নিয়োগ- কিন্তু মাহামের সাথে না। সে আসলেই এসব কিছুই বোঝে না…মোটেই আগ্রহী নয় এসব নিয়ে…”
“আপনি সম্ভবত একটু বেশিই আশা করছেন। আপনার পরিবারের মেয়েরা এমন পরিস্থিতির মাঝেই বেড়ে উঠেছে।”
“এতো সহজ না ব্যাপারটা।”
“আপনি কি বোঝাতে চাইছেন?”
“মাহাম অসুখী। হুমায়ুনের পরে তার আর কোনো সন্তান বাঁচেনি। পরবর্তীতে তিনবার গর্ভবতী হলেও, দুইবার গর্ভেই সন্তান মারা যায়। আর তৃতীয়বার-সেটাও ছেলে- হাকিম আমাকে মাহামের কক্ষে ডেকে পাঠাবার কয়েক মিনিটের ভিতরে আমার কোলে মারা যায়। মাহাম ক্লান্ত হয়ে শুয়ে ছিল। যে সন্তানের জন্ম আমরা গভীরভাবে কামনা করেছিলাম সে আমাদের দুজনের চোখের সামনে নিঃশ্বাসের জন্য হাঁসফাঁস করতে করতে স্তব্ধ হয়ে গেলে আমি মাহামের চোখ থেকেও ধীরে ধীরে দীপ্তি নিভে যেতে দেখি। আজ পেছনে ফিরে তাকিয়ে আমার মনে হয় সেই মুহূর্তে তার সত্ত্বার একটা অংশও মারা গিয়েছিলো।”
“তার হুমায়ুন বেঁচে আছে…”
“হ্যাঁ, কিন্তু তারপরেও তার মনে হয় সে ব্যর্থ…যদিও সে আমাকে আক্ষরিক অর্থেই ভালবাসে। আর আমিও মাহামকে খাতির করি। কিন্তু আমাদের দুজনের মাঝে এটা একটা অস্পষ্টতার আড়াল তৈরি করেছে।”
“আপনি কি এজন্যই আরও স্ত্রী গ্রহণ করেছেন? সঙ্গীর জন্য? আত্মার-সহচর খুঁজে পেতে?”
“আমার সেরকম কোনো প্রত্যাশা ছিলো না। আমার আবারও বিয়ে করার পেছনে বাস্তব বিষয়বুদ্ধি কাজ করেছে। একজন সুলতানের অনেক উত্তরাধিকারী থাকাটা উত্তম। আর বিশ্বস্ত অনুসারী এবং শক্তিশালী গোত্রের সাথে আত্মীয়তা করার জন্য এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
“আপনার নতুন স্ত্রীরা কে কেমন?”
বাবর কাবুলের কাছে পাহাড়ী এলাকার ইউসুফজাই গোত্রের শক্তিশালী সর্দারের কন্যা দীর্ঘাঙ্গি, তন্বী দেখতে বিবি মুবারকের কথা ভাবে এবং ছোট চ্যাপ্টা নাকের নাদুসনুদুস দিলবার, যার বাবা উজবেক আক্রমণের কারণে হিরাত থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে পালিয়ে কাবুলে এসে নিজের আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন। তুমি যদি জানতে চেয়ে থাকো তবে বলি, তারা কেউই অসাধারণ সুন্দরী না। কিন্তু ভালো মেয়ে…”।
