“কিন্তু আমি ছিলাম আপনার বন্ধু… আমি জানতাম আমাকে আপনার তখন দরকার ছিলো এবং আমি সেটা থাকতে পারিনি। এই লজ্জাটা বিগত বছরগুলোতে আমাকে কুড়েকুড়ে খেয়েছে…” বাবুরীর কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে যায়।
“তুমিই একমাত্র তোক যে সবসময়ে আমার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছো তুমিই আমার সাথে সুলতান হিসাবে না, একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে আচরণ করেছে, আর আমিও যার সাথে অকপটে সবকিছু বলতে পারতাম… আর তোমাকে আমার প্রয়োজন ছিলো। আমি তোমাকে কতো খুঁজেছি… তোমার কথা কখনও ভুলিনি…আমি প্রথমদিকে সবসময়ে ভেবেছি তুমি একদিন ফিরে আসবে। কিন্তু আমার সেই আশা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে…তখন আমার ভয় হতো তুমি বুঝি আর বেঁচে নেই।”
“মাশুলের উপায় না খুঁজে বের করে আমি কিভাবে ফিরে আসি আপনার কাছে?”
বাবর তার কাঁধ ছেড়ে দেয়। “আমি তোমাকে কখনও বুঝতে পারিনি…”
“না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ে আলাদা ছিলো, আর সেরকমই থাকা বাঞ্ছনীয়।”
“তো, বদমাশ এবার বলল এতোদিন পরে হঠাৎ কেন ফিরে আসবার কথা মনে পড়লো?”
“কারণ এতোদিন পরে আপনাকে দেবার উপযুক্ত কিছু একটা আমি খুঁজে পেয়েছি। গত আটটা বছর আমি তুরস্কের সুলতানের সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলাম। সেনাবাহিনীতে আমি অনেক উপরে উঠেছিলাম আর তিনি একটা ব্যাপারে আমার কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন। যুদ্ধে আমি একবার শাহজাদার প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম। তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন কিভাবে তিনি আমাকে পুরস্কৃত করবেন। আর সেই সময়ে আমি বুঝতে পারি এবার আমার ফিরে যাবার সময় হয়েছে। শোনেন…” বাবুরীর চোখ যা একটু আগেও বিষণ্ণ দেখাচ্ছিলো তা এখন চকচক করতে থাকে। “তৃর্কীদের কাছে এমন একটা অস্ত্র আছে, যা আমাদের এই অঞ্চলে একেবারে অপরিচিত। সেই অস্ত্রের সাহায্যে আপনি যা ইচ্ছা করতে পারবেন। যাকে ইচ্ছা পরাজিত করতে পারবেন। আমি আপনার জন্য সেই অস্ত্র নিয়ে এসেছি। আর ভাড়াটে তূর্কী যোদ্ধার দল এসেছে আমার সাথে যারা আমার মতো এই অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। আমরা আপনার সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষিত করে তুলব…যাতে আপনি জগদ্দল পাথরের মতো কাঁধে বয়ে নিয়ে বেড়ানো আপনার সেই নিয়তি পরিপূর্ণ করতে পারেন…” শেষ কথাগুলো বলার সময়ে বাবুরীর চোখেমুখে একটা সেঁতো হাসি ফুটে উঠে। আর বাবর তাকিয়ে দেখে তার কৃরিৎকর্মা বন্ধুর, যার উপস্থিত বুদ্ধির ঝলক দেখতে পারে, যা হতে পারে কাঁটাতারের মতো খোঁচা দেয়, কিন্তু তাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। “তোমার এই হামেহাল অস্ত্রটা আবার কি দ্রব্য?”
“আপনি কি বোমারু বা তারা মাঝে মাঝে যাকে কামান বলে, তার কথা কি শুনেছেন বা নিদেনপক্ষে ম্যাচলক মাস্কেট?”
বাবর মাথা নাড়ে অজ্ঞতা জানাতে।
“অস্ত্রটা এতোটাই শক্তিশালী যে আট বছর আগে আমি সুলতানের বাহিনীতে যোগ দেবার ঠিক আগে আগে- তার সেনাবাহিনী পারস্যের শাহ ইসমাইলের বাহিনীকে চালতানের যুদ্ধে এমন গো-হারান হারায় যে পারস্যের অধিকাংশ এলাকা তার হাতছাড়া হয়। আর সীমান্তের নকশা পর্যন্ত বদলে যায়। সেদিন যারা যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলো আমি তাদের সাথে পরে কথা বলেছি। তারা বলে শাহের কিজিল-বাশ- লাল পাগড়ী পরিহিত অশ্বারোহী বাহিনী সেদিন হাজারে হাজারে স্রেফ কচুকাটা হয়ে গিয়েছিলো। আমরা শহর অবরোধের সময়ে যে কালো গুড়ো ব্যবহার করি শহর রক্ষাকারী দেয়ালের নিচে মাইন স্থাপনের জন্য, এই অস্ত্রে সেই কালো গুড়োই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তূর্কীরা এর একটা ভিন্ন নাম দিয়েছে বারুদ’। আর সেই সাথে ব্যবহারের একটা নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। আপনি দেখলে বিস্মিত হবেন…”
কিন্তু এসব কিছুই বাবর শুনতে পায় না। এতগুলো বছর যে বন্ধুর অভাব সে অনুভব করেছে, তার অপরিবর্তনীয় সহযোদ্ধা সে ফিরে এসেছে, এই ব্যাপারটা এতোক্ষণে যেনো সে ধীরে ধীরে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। বাবুরীর দিকে তাকিয়ে, সুলতানের দায়িত্বের বোঝা, হতাশা আর নিরাশা সব যেনো নিমেষে দূরীভূত হয়। সবকিছু ছাপিয়ে একটা উদ্দাম আবেগ, বুনো উল্লাস তাকে আপুত করে যে, তার মনে হয় তাকে বুঝি শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলবে। বাবুরী কি বলছে বলতে থাকুক, সেটা পরে শুনলেও চলবে…
বাবরের মনের ভাব বুঝতে পেরেই যেনো বাবুরীও কথা বন্ধ করে। কিছুটা সময় তারা নির্বাক ভঙ্গিতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপরে কখন যেনো আধো কান্না আর আধো হাসিতে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। বাবরের আবার নিজেকে তরুণ মনে হয়। বর্তমানের প্রাচুর্যে চঞ্চল আর আগামীকালের কোনো ভাবনা সেখানে ঠাই পায় না।
***
“বাবুরী আমাকে বললো এতোগুলো বছর তোমার কেমন কেটেছে। তুমি কি বিয়ে করেছো…কোনো সন্তান?” সেদিন রাতে বাবরের ব্যক্তিগত কক্ষে একান্তে বসার পরে সে জানতে চায়। তার তখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে সত্যি সত্যি বাবুরীই তার পাশে বসে আছে। তার ভয় হয় যে চোখের পলক পড়লেই বুঝি বাবুরী মরিচীৎকার মতো মিলিয়ে যাবে।
“আমি আপনাকে বহু বছর আগে বলেছিলাম, স্ত্রী বা সন্তানের কোনো আকাঙ্ক্ষা আমার নেই…”
“কিন্তু তুমি কি চাও না যে তোমার পরেও তোমার বংশধরেরা পৃথিবীতে বেঁচে থাকুক? তুমি চলে যাবার পরে কে তোমার কথা স্মরণ করবে?”
“হয়তো, আপনার মত বন্ধুরা। সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট…” বাবুরী কথা শেষ করে না। সে যাই হোক, কেউ যদি বিয়ে করে থিতু হতে চায় তবে তাকে আমার চেয়ে অনেক বেশি সুস্থির হয়ে অবস্থান করতে হবে।”
