বৃষ্টির কারণে দলটার কালো কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকা, লম্বা চওড়া দেখতে দলপতি। ঘাড় ঘুরিয়ে পরিশ্রান্ত জন্তুগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে। বাবর বারান্দা থেকে খেয়াল করে লোকটা হাত নাড়ছে। কোনো সন্দেহ নেই সে চেঁচিয়ে কিছু একটা বলেছে। কারণ তার আটজন তোক সাথে সাথে ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নামে এবং পেছন থেকে গাড়িটা ধাক্কা দিতে শুরু করে। তাদের একজন পা পিছলে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়।
দলনেতা লোকটা যেনো ধৈর্যের শেষপ্রান্তে পৌঁছে যায়। সে তার ধূসর ঘোড়াটার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে এবং ঢাল বেয়ে উঠার জন্য সেটার পেটে খোঁচা দেয়। দূর্গপ্রাসাদের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত উঠে যাওয়া খাড়া, পাথর দিয়ে বাঁধানো ঢালু পথটায় উঠে সে যেনো তার বাহনকে আরও দ্রুত এগিয়ে যাবার জন্য তাগাদা দেয়। দু’জন। তোরণ রক্ষী লাফিয়ে তার গতিরোধ করতে সে কেবল লাগাম টেনে তার বাহনকে সহসা টলতে টলতে দাঁড় করায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাবর নিচের কোনো কথা শুনতে পায় না। কিন্তু লোকটার সবকিছুই কেবল একটা বিষয়েই ইঙ্গিত করে যে, সে বণিক নয় একজন যোদ্ধা। প্রহরীর প্রশ্নের উত্তর দেবার সময় তার মাথাটা স্পর্ধিত ভঙ্গিতে বাঁকানো থাকে এবং সে অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে তার বৃষ্টিতে ভেজা ঘোড়সওয়ারীর আলখাল্লী ঝটকা দিয়ে কাঁধের পেছনে সরিয়ে দিলে বাবর অদ্ভুত দর্শন ময়ানে কোষবদ্ধ তরবারির বাঁট এক ঝলকের জন্য দেখতে পায়- একধারি তরবারির মতো বাঁকানো কিন্তু আরো অনেক বেশি সরু।
“প্রহরী।” বাবর বারান্দা থেকে ডাক দেয়, “লোকটাকে এখনই আমার কাছে নিয়ে এসো।”
পাঁচ মিনিট পরে, সামনে চারজন আর পেছনে ছয়জন প্রহরী পরিবেষ্টিত অবস্থায় লোকটা তার কক্ষে প্রবেশ করে। তার পরণের আলখাল্লা খুলে নেয়া হয়েছে এবং তার ময়ানও শূন্য- কোমরে একটা সরু ধাতব শিকলের সাহায্যে আটকানো ইস্পাতের বাঁকানো শূন্য খাপটা ঝুলছে। কিন্তু লোকটার মুখের নিম্নাংশ তখনও কাপড় দিয়ে ঢাকা এবং তার মাথার চূড়াকৃতি পাগড়ী টেনে ভুরু পর্যন্ত নামান। প্রহরীরা তাকে বাবরের বিশ ফিটের বেশি কাছে যেতে দেয় না।
“সুলতানের সামনে হাঁটু মুড়ে বসো!”
লোকটা বাবরের সামনে কেবল নতজানুই হয় না সে মেঝেতে পূর্ণাঙ্গ, আনুষ্ঠানিক তৈমূরীয় অভিবাদন রীতি কুর্নিশের ভঙ্গিতে হাত পা ছড়িয়ে নিজেকে প্রণত করে।
“আগন্তুক তুমি এবার উঠে দাঁড়াতে পারো।” বাবর এবার আগের চেয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। যে লোকটা কিছুক্ষণ আগে দূর্গপ্রাসাদে প্রবেশ যেনো তার অধিকার এমন ভঙ্গিতে প্রহরীদের সাথে তর্ক করছিলো, সে নিজে থেকে কেনো এভাবে শ্রদ্ধা প্রকাশ করছে? এবং তার চেয়েও যেটা তাকে কৌতূহলী করে তোলে সেটা হলো এখনও কেন সে মুখ নিচে রেখে, বাহু প্রসারিত করে রেখেছে? সে কি বাবর যা। বলেছে সেটা বুঝতে পারেনি?
বাবরের এক দেহরক্ষী তার হাতের বর্শার হাতলের প্রান্তভাগ দিয়ে আগন্তুক লোকটাকে খোঁচা দিতে যাবে, কিন্তু বাবর তার আগেই হাত তুলে তাকে বিরত করে। হাত দিয়ে খঞ্জরের বাঁট স্পর্শ করে সে ধীরে ধীরে লোকটার দিকে এগিয়ে যায় এবং তার মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। “আমি এবার তোমাকে উঠে দাঁড়াতে আদেশ করছি।”
শায়িত দেহটার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে। এক মুহূর্ত ইতস্তত করে, লোকটা হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে বসে কিন্তু তখনও সে নিচের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তারপরে ধীরে ধীরে সে মুখ তুলে তাকায় এবং নোংরা, ঘামের দাগ লাগা কাপড়টার উপরে বাবর দেখে একজোড়া নীল চোখ তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
“বাবুরী!” এতোবছর পরে তার যেন ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না। সে। নিজে এবার ঝুঁকে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে এবং তাকে টেনে দাঁড় করায়। মুখটায় আগের চেয়ে অনেক বেশি পোড়খাওয়া বলিরেখা দেখা যায়। কিন্তু চোখের নিচের উঁচু হাড়, গাঢ় নীল চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কোনোমতেই ভুলবার মতো না।
বাবর তার দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকলে, বাবুরী তার বৃষ্টিতে ভেজা পাগড়িটা এবার খুললে ধূসর ছোপধরা লম্বা কালো চুল কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসে। “আমাকে ক্ষমা করেন…” শব্দগুলো বলতে বাবুরীর যেনো গলা ভেঙে আসে এবং তার চোখ চকচক করতে থাকে।
বাবর হাত তুলে তাকে বিরত করে। “অপেক্ষা করো…” সে ইঙ্গিতে তার দেহরক্ষীদের যেতে বলে এবং তারা বের হয়ে গিয়ে দুই পাল্লার ভারী ওক কাঠের দরজাটা বন্ধ করার পরে সে তার বিশ্বস্ত বন্ধুর দিকে ঘুরে তাকায়। “আমি তোমার কথা বুঝতে পারিনি…”।
বাবুরীর চোখমুখ লাল হয়ে উঠে। “আমি আপনার কাছে ক্ষমা ভিক্ষার জন্য ফিরে এসেছি। আমাকে যখন আপনার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো আমি সেই সময়ে। আপনাকে পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছিলাম। প্রথম থেকেই আমি এটা জানতাম কিন্তু আমার অহংকার আমাকে ফিরে আসতে বাধা দিয়েছে…”
“না…” বাবর এবার আরো শক্ত করে বাবুরীর বাহু আঁকড়ে ধরে। “আমার উচিত তোমার কাছে ভুল স্বীকার করা। তুমিই ঠিক- তুমি যা বলেছিলে সব ঠিকই বলেছিলে। তুমি নও, আমিই ছিলাম গর্বিত গাধা। আমি ভেবেছিলাম সমরকন্দ আমার, ভেবেছিলাম এটাই আমার নিয়তি, যেকোনো মূল্যে, এমনকি শাহের কাছে নতজানু হয়ে হলেও, শহরটার শাসক হবার জন্য সেটা ধর্তব্যের ভিতরে পড়ে না। তোমার কথা শোনা আমার উচিত ছিলো… আমি এক বছরও শহরটা দখলে রাখতে পারিনি। শহরের লোকেরা আমার চেয়ে বর্বর উজবেকদের স্বাগত জানানটা মেনে নিয়েছিল,..”
