সে এবার সেদিক থেকে ছয় বছরের আসকারির দিকে দৃষ্টি ফেরায়। বিছুটা একটা চোখা লাঠি নিয়ে তার তিন বছরের সৎ-ভাই হিন্দালকে সমানে খুঁচিয়ে চলেছে। তাদের আয়া লাঠিটা কেড়ে নেবার চেষ্টা করছে এবং বাবর তাকিয়ে দেখে আসকারির টানাটানা ছোট মুখটা অনিচ্ছুক একটা চিৎকারে বেঁকেচুরে যায়, যা কেবল কানে একটা মৃদু টান ডেকে আনতে সে তার অস্ত্র সমর্পনে বাধ্য হয়। আর এবার তারস্বরে চিৎকার শুরু করে। হিন্দাল- তার আয়া তাকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে ভাইয়ের নাকাল অবস্থা বেশ তার নাদুসনুদুস গোলাকার মুখে, উৎসাহের সাথে তাকিয়ে দেখছিলো।
বাবর ভাবে, তাকে ভাগ্যবানই বলা চলে। এতগুলো স্বাস্থ্যবান সন্তানের সে পিতা। এবং একটা সমৃদ্ধ, নিরাপদ সালতানাতের অধিকারী। সমরকন্দ পরিত্যাগের পরে গত দশ বছর, সে একনাগাড়ে কাবুল শাসন করেছে। বিদ্রোহের যেকোনো সম্ভাবনা দ্রুত দমন করে এবং কাবুলের চারপাশে উঁচু, সংকীর্ণ গিরিপথে- কোটাল সওদাগরী কাফেলায় রাহাজানি করে বেড়ানো উপজাতি গোষ্ঠীগুলোকে সাফল্যের সাথে দমন করে সে তার প্রজাদের শ্রদ্ধা অর্জন করেছে। খুগিয়ানী, খিরিজী, তুরী আর ল্যান্ডার ডাকাত গোষ্ঠীর সবাই নাকে খত দিয়ে ডাকাতি ছেড়ে দিয়েছে। গিরিপথে উঁচু দণ্ডের মাথায় সন্নিবিষ্ট তাদের শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা কর্তিত মস্তক অন্যদের জন্য সতর্কবাণী হিসাবে কাজ করেছে আর আগত বণিকদের আশ্বস্ত করেছে যে তারা এমন একটা রাজ্যে প্রবেশ করছে যেখানে সুলতানের শাসন বজায় আছে।
নিরব দক্ষ, বিশ্বস্ত কাশিম- শাহী কোষাগারের রক্ষক হিসাবে বয়স্ক ওয়ালি গুলের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। প্রতি চন্দ্রমাসের শুরুতে গর্বিত ভঙ্গিতে কোষাগারে প্রাচুর্য উপচে পড়ার কথা বাবরের কাছে ঘোষণা করে। কাবুলের ব্যবসায়ীরা, প্রতিবার নিরাপদে বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে ফেরত আসার পরে উটের ঝলসানো মাংস দিয়ে ভূড়িভোজ করে, নিজেদের নিরাপদ আর ধনবান ভাবে। তারা নিজেদের নিয়ে সুখী। কিন্তু সেও কি নিজেকে সুখী দাবি করতে পারে? এসান দৌলত- তাকে সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারতেন যিনি- সহজাত প্রবৃত্তির বশে উত্তরটা ঠিকই টের পেতেন যে সে মোটেই সুখী না।
নিজেদের ছেলেদের দিকে তাকিয়ে, বাবর এতদিন চাপা পড়ে থাকা তার অপূর্ণ আকাক্ষটার খোঁচা আবার নতুন করে অনুভব করে। ভবিষ্যতের গর্ভে তাদের জন্য কি রয়েছে? মানুষের নেতা হিসাবে, একজন যোদ্ধা হিসাবে সে অনেক কিছু শিখেছে। অনেক চড়াই উতরাই অতিক্রম করেছে। কখনও হতাশ না হতে, বিপর্যয়ের কারণে কখনও নিজেকে লক্ষ্যচ্যুত না হতে, তার অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে। আর কাবুলের চেয়ে সেটা অনেক বড় কিছু একটা লক্ষ্য…তার সন্ত নিদের, এবং তাদের সন্তানদের জন্য চমকপ্রদ একটা স্মারক…
“সুলতান, পশ্চিম থেকে একদল আগন্তুক কাবুলের দিকে এগিয়ে আসছে বলে আমরা সংবাদ পেয়েছি।” বাবরের কল্পনাবিলাস বাইসানগারের কথায় ব্যাহত হয়। তাকে বরাবরের মতোই উদ্বিগ্ন দেখায়। ঘুমের ভেতরে বয়োবৃদ্ধ বাহলুল আইয়ুব মারা গেলে, বাবর বাইসানগারকে কাবুলের গ্রান্ড উজিরের পদে নিয়োগ দিতে বিন্দুমাত্র চিন্তা করেনি- ব্যাপারটা ছিলো সমরকন্দের গ্রান্ড উজির হিসাবে তার স্বল্পকালীন নিয়োগের একটা সান্ত্বনা।
“আগন্তুকের দলের পরিচয় জানা গেছে? বণিকের কাফেলা?”।
“সুলতান, আমি নিশ্চিত বলতে পারছি না। তারা কাফেলা চলাচলকারী পথ ধরে এগিয়ে আসছে। কিন্তু দলটার সাথে মালবহনকারী খচ্চরের সংখ্যা অনেক কম অস্থায়ী শিবির স্থাপন করতে প্রয়োজনীয় মালামাল বহনের জন্য যতোগুলো দরকার : ঠিক ততোগুলো। অবশ্য আমাদের গুপ্তদূতের দল বলেছে তাদের সাথে দুটো বিশাল বলদে টানা মালবাহী গাড়ি রয়েছে যা বিচিত্র দর্শন ধাতব অনুষঙ্গে বোঝাই। প্রতিটা গাড়ি ত্রিশটা বলদের পাল টেনে আনছে…”
“দলটাতে লোকজনের সংখ্যা কতো?”
“পঞ্চাশজন হবে সম্ভবত এবং তাদের পরণে রয়েছে বিচিত্ৰদৰ্শন চামড়ার জোব্বা। আর মাথায় উজ্জ্বল কমলা রঙের চূড়াকৃতি পাগড়ি…”
“তারা সম্ভবত ভ্রাম্যমাণ দড়াবাজের দল…”
“সুলতান, আমার কিন্তু তা মনে হয় না।”
“বাইসানগার, আমি ঠাট্টা করছিলাম। তাদের উপরে নজরদারি বজায় রাখেন। তারা কবে নাগাদ এখানে এসে পৌঁছাবে?”
“তিন দিনের ভেতরে, খুব বেশি দেরি হলে চারদিন।”
“তারা পৌঁছালে আমাকে খবর দেবেন।” রাজ্যের লোক কাবুলে এসে ভীড় করে, এখান দিয়ে অতিক্রম করে- রেশমের উপরে জরির কারুকাজ করা জোব্বা আর পিঠে সবুজ চামড়ার তূণীর এবং একই রঙের পর্যান, দুর্বিনীত অহংকারী খোঁচা খোঁচা দাড়ির চীনা বণিকের দল। আফগান উপজাতির লোকদের মতো নাকে মাছি বসতে দিতে নারাজ। আর যেকোনো ছুতোয় লড়াই বাধাতে ওস্তাদ। শ্যামবর্ণের নাদুসনুদুস পার্সী বণিকের দল, আর হিন্দুস্তানের একেবারে ভেতর থেকে মশলা আর চিনির পসরা নিয়ে আগত রঙচঙে পাগড়ী পরিহিত কৃষ্ণবর্ণের বণিক। নতুন আগত এই দলটা যদি কৌতূহল উদ্রেককারী হয়, তবে সে তাদের দূর্গপ্রাসাদে ডেকে পাঠাবে…বহুদূর থেকে আগত আগন্তুকদের দেখে কামরান আর হুমায়ূন হয়তো খুশিই হবে।
বাইসানগারের গণনা কার্যত ভুল প্রমাণিত হয়। দুদিন পরে, ঝিরঝির বৃষ্টির মাঝে, আগন্তুক দলটাকে তাদের রহস্যময় গাড়ির বহর নিয়ে কাবুলের দিকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। তারা শহরের দিকে না গিয়ে দূর্গপ্রাসাদ অভিমুখী খাড়া পথটা বেছে নেয়। বাবর তার ব্যক্তিগত কক্ষের বারান্দা থেকে বৃষ্টির ফলে ধূলোর স্তর থেকে সৃষ্ট কাদায় মালবাহী বিশাল গাড়ি দুটো পিছলে গিয়ে আটকে যেতে দেখে। আবহাওয়ার কারণে গাড়িতে নিয়ে আসা মালামাল মোটা চামড়া দিয়ে ভালো করে মোড়ানো। ভারী কাঠের জোয়ালের নিচে মাথা নিচু করে বলদের পাল প্রাণপণে চেষ্টা করছে গাড়িটা টেনে তুলতে। তাদের পেষল কাঁধ তিরতির করে কাঁপছে।
