সমরকন্দের অধিবাসীরা বাবরের প্রতি নিজের মনোভাব গোপনের কোনো চেষ্টাই করেনি। উজবেকরা যদি ফিরে আসতে চায় তবে তাদের আসতে দেয়া হোক। ধর্ম বিশ্বাসের শত্রুর চেয়ে রক্তের শত্রু অন্তত মন্দের ভালো। নির্মম সত্যটা হলো তারা শাহের হাত থেকে আর তার শিয়া ধর্মমত থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য উজবেকদের বেশি বিশ্বাস করে- বাবরকে তারা একেবারেই বিশ্বাস করে না। শাহের সাথে পূর্ববর্তী সন্ধির জন্য বাবরকে চরম মূল্য শোধ করতে হয়েছে। বাবর। বৃথাই তাদের সাইবানি খানের নিষ্ঠুরতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন কিন্তু দেখা গেছে তাদের স্মৃতিশক্তি বড়ই দুর্বল। শহরের ভিতরে প্রায় বিদ্রোহী পরিস্থিতি আর শহর ত্যাগ করার জন্য, উত্তরের কারশী এবং অন্যান্য শক্ত ঘাঁটি থেকে ধেয়ে আসা লক্ষাধিক উজবেক সৈন্যের মহড়ার সামনে বিপর্যস্ত বাবর, শহরের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে চরমপত্র ঘোষণা করে: শহর আর আমাদের সভ্যতা এবং সংস্কৃতি রক্ষা করতে আমাকে সাহায্য করো- নতুবা আমাকে কাবুলে ফিরে যেতে হবে।” তার ডাকে শহরবাসী সাড়া দেয়নি।
কাবুলে তার শাসন অন্তত বলবৎ রয়েছে আর তার পরিবারও সেখানে নিরাপদেই আছে। সে মাহাম, গুলরুখ আর তার সন্তানদের, একটা শক্তিশালী অনুগামী দল সহকারে আগেই রওয়ানা করিয়ে দিয়েছে। এবার তারও যাবার সময় হয়ে এসেছে। গত কয়েক সপ্তাহ তার কেবলই বাবুরীর কথা মনে পড়েছে। তার বন্ধু ঠিকই বুঝতে পেরেছিলো। সমরকন্দের জন্য বাবরের মোহ- যা কখনই তার নিজের ছিলো না তাকে অন্ধ করে ফেলেছিলো। তাকে এবার তার নিজের নির্বুদ্ধিতার মূল্য পরিশোধ করতে হবে। সমরকন্দের কথা একেবারে ভুলে গিয়ে কাবুল থেকে অন্যান্য অঞ্চলে তার নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা নিবৃত্ত করার উপায় অনুসন্ধান করতে হবে।
কিন্তু একটা বিষয়ে সে অন্তত সন্তুষ্টিবোধ করতে পারে। সে শাহের প্রজনন স্ট্যালিয়নটা- নির্বীয করে ফেরত পাঠিয়েছে।
৪.১ চতুর্থ খণ্ড – হীরক আর ভষ্মের ভূখণ্ড
চতুর্থ খণ্ড – হীরক আর ভষ্মের ভূখণ্ড
২০. তূর্কী নাচ
১৫২২ সালের গ্রীষ্মকালের এক দাবদাহপূর্ণ দিন। বাবরের ছেলেরা কাবুল শহরের দেয়ালের বাইরে অবস্থিত তৃণভূমিতে খেলা করছে। চৌদ্দ বছরের হুমায়ূন- খুরের কাছে সাদা ফেট্টি দেয়া বাদামী রঙের চকচকে চামড়ার ঘোটকী- লম্বা সোনালী ঘাসের ভিতর দিয়ে দাবড়ে নিয়ে যাবার ফাঁকে পর্যানে বসা অবস্থায় খড়ের একসারি লক্ষ্যবস্তুকে স্থির করে নিশানা মকশো করে। পর্যানের উপরে নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখে সে তূণীর থেকে একটার পরে একটা তীর বের করে হাতের দুই বাঁক বিশিষ্ট ধনুকে সন্নিবেশিত করে এবং বাতাসের বরাভয়ে ভাসিয়ে দেয়। প্রতিটা তীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। কামরান তার ধূসর রঙের টাটুতে বসে চোখে ভক্তি নিয়ে তাকিয়ে দেখে। হুমায়ূন এক ঝটকায় আকাশের দিকে তাকিয়ে এবং কোনো ছন্দপতন না ঘটিয়ে তীর ছুঁড়ে অবলীলায় একটা উড়ন্ত পাখিকে বিদ্ধ করলে বাবর তাকে ঢোক গিলতে দেখে।
বাবর হেসে ফেলে। দূর্গপ্রাকারের এই সুবিধাজনক স্থান থেকে সে হুমায়ুনের ফুর্তি আর-ঘোড়ায় ঋজু ভঙ্গিতে বসে, সুদর্শন মাথাটা দেহের উপরে স্থির রেখে অনায়াসে ঘোড়ার লাগাম ধরে রেখে-নিজেকে জাহির করার প্রবণতা ঠিকই অনুভব করতে পারে। তাকে পুরোদস্তুর একজন শাহজাদা যোদ্ধা মনে হয়, আর সেটা সেও জানে। কিন্তু তার চেয়ে মাত্র পাঁচ মাসের ছোট কামরান বড় হচ্ছে। সৎ-ভাইয়ের মতো সেও লম্বাই হবে এবং তার মতো শক্তিশালী না হলেও সেটা পুষিয়ে দিয়েছে তার দুর্দান্ত সাহস- যার কারণে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার সে বড় ধরণের দুর্ঘটনার হাত থেকে কোনোমতে বেঁচে গেছে।
বাবর কৃতজ্ঞ যে তার আম্মিজান এই দুজনের বড় হওয়া পর্যন্ত আর খানজাদার সাথে মিলিত হওয়ার মত দীর্ঘায়ু মনে মনে তিনি ভালো করে জানতেন যা তাকে প্রায়শই হতাশ করে তুলতো- লাভ করেছিলেন। গ্রীষ্মের খাণ্ডবদাহনের পরে বৃষ্টিপাতে তৃণভূমি যেমন আবার সবুজ হয়ে উঠে, মেয়ে কাবুলে ফিরে আসতে খুতলাঘ নিগার তেমনই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলেন। সাইবানি খানের হাতে অত্যাচারিত হবার ব্যাপারে সে তাদের আম্মিজানকে কি বলেছিলো বাবর সেটা কখনও জানতে পারেনি। মাঝে কেবল তাকে বিষণ্ণ চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে সে দেখেছে। খানজাদারও নিশ্চয়ই সেটা দৃষ্টি এড়ায়নি। সে লক্ষ্য করেছে মায়ের কাছে থাকবার সময়ে খানজাদা ইচ্ছা করেই কেমন উছুল আর প্রাণবন্ত থাকতো। যেনো বোঝাতে চাইতো তার সাথে যাই ঘটে থাকুক, সেসব কিছু তার মানসিকতা বদলে দিতে পারেনি। কেবল একটা ব্যাপারেই সে খুতলাঘ নিগারকে কোনো ধরণের প্রশ্রয় দেয়নি। খুতলাঘ নিগার মনেপ্রাণে চাইতেন অতীতের ঘটনার সমাপ্তির স্মারক হিসাবে খানজাদা যেনো আবার বিয়ে করে। কিন্তু সে তার কোমল অনমনীয় ভঙ্গিতে, পাত্র যতোই ভালো মানুষ বা বংশ যতোই সম্ভ্রান্ত হোক, নাকচ করে দিয়েছে।
সাত বছর আগে খুতলাঘ নিগারও তার নানীজান এসান দৌলতের মতোই আকষ্মিকভাবে ইন্তেকাল করেন। তিনি তার কক্ষে বসে একটা সুতির আলখাল্লার পাড়ে কারুকাজ করছিলেন যখন খানজাদা তার পাশে বসে তাকে পড়ে শোনাচ্ছিল এবং সেই অবস্থায় তিনি একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে ঝুঁকে পড়েন। দেখা যায় সেটাই পৃথিবীর বুকে তার শেষ নিঃশ্বাস ছিলো। তার আত্মা দেহের খাঁচা ত্যাগ করেছে আর হেকিমকে কিছু করার কোনো সুযোগই তিনি দেননি। কয়েক ঘণ্টা পরে, বাবর কান্না দমন করে, কাবুলে প্রথমবার আগমনের পরে সে পাহাড়ের পাদদেশে যে উদ্যানটা তৈরি করেছিলো সেখানে এসান দৌলতের পাশে তাকে সমাহিত করে। সে শপথ নিয়েছে, কিভাবে তার সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন, সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়ে, তার নানীজান আর আম্মিজান কিভাবে তাকে সাহায্য করেছে, পথ দেখিয়েছে, এবং এই দুই নারীর সাহায্য ছাড়া সে আদৌ কোনো সিংহাসনে আসীন হতে পারতো না, এই ব্যাপারগুলো কখনও বিস্মৃত হবে না… তার পরের সন্তানদের তারা দেখে যেতে পারেননি এই বিষয়টা তাকে সবসময়ে বিষণ্ণ করে তোলে।
