*
“আমি আমার সৈন্যবাহিনী পশ্চিমে আমার নিজের সীমান্ত রক্ষার উদ্দেশ্যে সরিয়ে নিচ্ছি এবং আপনাকে আপনার কাঙ্ক্ষিত সহায়তা করতে অপারগ। বস্তুতপক্ষে আমি আপনাকে কেনই বা সহায়তা করবো? আপনি আমার উদারতার মুখে থুতু নিক্ষেপ করে আমার ধর্মবিশ্বাসকে অপমানিত করেছেন। সমরকন্দে কি হয়েছে মোল্লা হুসেন আমাকে সব খুলে বলেছে-কিভাবে তাকে অপমানিত, লাঞ্ছিত করে সেখানের রাস্তায় কুকুরের মতো তাড়া করা হয়েছে। তাকে আর তার সত্যিকারের ধর্মমত প্রত্যাখ্যান করে আপনি আর আপনার প্রজারা কার্যত আমাকেই প্রত্যাখ্যান করেছে। তার বিরুদ্ধে করা অন্যায়ের জন্য পরম করুণাময় আল্লাহতালা যেনো আপনাকে ক্ষমা করে দেন।”
বাবর শাহ্ ইসমাইলের চিঠির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয় বদ মোল্লাটা শাহকে বলেনি যে বাবর- নিজে ব্যক্তিগতভাবে তার মোটা গর্দানটা রক্ষা করেছে। ধীরে ধীরে, ইচ্ছাকৃতভাবে সে চিঠির নিচের সিংহ চিহ্নিত লাল মোমের শীলমোহরটা ছিঁড়ে নিয়ে শাহের ব্যক্তিগত স্মারক- টুকরো টুকরো করে। তারপরে টুকরোগুলো, শীতকালের মাঝামাঝি শহরের দেয়ালে মাথা কুটতে থাকা তুষারের ঝাপটার হিম ঠাণ্ডা, যা কোক সরাইয়ের পাথুরে দেয়াল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করছে, প্রশমিত করতে তার কক্ষে দিন রাত প্রজ্জ্বলিত কাঠের আগুনের উষ্ণ সবুজ শিখায় ছুঁড়ে দেয়।
“সুলতান, আমরা এমন কিছুই আশা করছিলাম…” বাইসানগার মৃদু কণ্ঠে কথাটা বলে।
“আমি জানি। কিন্তু আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে শাহ্ উজবেকদের হামলার মুখে শহরটা অরক্ষিত রেখে দিচ্ছেন- আমি কল্পনাও করিনি তার জীঘাংসা এতোটা প্রবল হতে পারে…” বাবর তাকিয়ে মোম গলতে দেখে এবং আগুনের ভেতরে কাগজের টুকরো উজ্জ্বল হয়ে দপ করে জ্বলে উঠে তার সাথে সব আশাও ভষ্ম করে দেয়। “তিনি সব সময়ে তার আদেশ পালন হয়েছে দেখতেই অভ্যস্ত। তিনি একবার আপনার আনুগত্য পাবার পরে তাই আশা করেছিলেন আপনিও তার সব আদেশই পালন করবেন।”
“বাবুরী ঠিক এই কথাটাই আমাকে বলেছিলো… এতো সরল ছিলাম আমি। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয়নি শাহের কোনো দুরভিসন্ধি আছে… তিনি একবারও বলেননি আমাকে বা আমার প্রজাদের জোর করে গোত্রান্তরিত করা হবে এবং তার জানা উচিত ছিলো বিনা রক্তপাতে তিনি তার অভীষ্ট সিদ্ধ করতে পারবেন না। মোল্লা হুসেনের ওয়াজের পরে শহরের উত্তেজনা প্রশমিত করতেই আমাদের একমাস সময়। লেগেছিলো।”
‘সুলতান, অন্তত মন্দের ভালো, পার্সীরা বিদায় হয়েছে…”।
“ঠিক আছে, কিন্তু তারা আমাদের বিপদে ফেলে গিয়েছে। আমি সুলতান হবার পরে পরেই তাদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া উচিত ছিলো। আমার প্রজারা তাহলে আমার ব্যাপারে কম সন্দিহান বোধ করতো। কিন্তু আমি সেটা না করে তাদের জামাই খাতির করে সমরকন্দে রেখেছিলাম, যাতে আমার কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং তারপরে ঠিক যখন তাদের সাহায্য আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমরকন্দ রক্ষা করতে তখন তারা দেশে ফিরে গিয়েছে। উজবেকরা ইতিমধ্যে বোখারা আবার দখল করে নিয়েছে। শীতকাল বিদায় নেয়া মাত্র তারা আমাদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমার নিয়োগ করা গুপ্তদূতের দল যদিও খবর নিয়ে এসেছে যে, কাবুল পড়বে। আমার নিয়োগ করা ও আর তার আশেপাশের এলাকা শান্ত রয়েছে। কিন্তু আমি সেখান থেকেও অতিরিক্ত বাহিনী এখানে নিয়ে আসতে পারবো না। তাহলে প্রথমবার সমরকন্দ অধিকার করার পরে না ভেবেই আমি যেনো ফারগানাকে বিপদের মাঝে ঠেলে দিয়েছিলোম এবারও ঠিক সেভাবেই কাবুলকে বিদ্রোহ বা বহিঃশত্রুর আক্রমণের হুমকির ভিতরে ফেলে দেবো। আমি অবশ্য শহরটা সুরক্ষিত আর রসদ মজুদ করতে পারি। কিন্তু শহরের লোক কি আমাকে সমর্থন করে? শহর রক্ষাকারী দেয়ালের ভিতরে আর বাইরে একই সাথে আমি শত্রুর মোকাবেলা করতে পারব না।”
“সুলতান, এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।”
“বাইসানগার, আমি নিজেও এর উত্তর জানি না…”।
*
পেছনে ফিরে তাকিয়ে কি লাভ? সূর্যাস্তের গোলাপী, বেগুনী আর কমলা আভা সমরকন্দের বিস্ময়কর, চমকপ্রদ দৃশ্যপট আড়াল করে ফেলেছে। প্রকৃতিই যেনো তার নিষ্ক্রমনে উল্লাস প্রকাশ করছে। কাল সকালে হয়তো আজকের সূর্যাস্তের মতোই আরেকটা মহিমান্বিত সকাল পাঁচ মাইল দূরে শিবির স্থাপনকারী উজবেকদের স্বাগত জানাতে বিকশিত হবে।
কে ভাবতে পেরেছিলো সাইবানি খান মারা যাবার পরে তারা আরেকজন যোগ্য নেতার অধীনে এতোদ্রুত নিজেদের সংঘটিত করবে? উজবেকরা আসলে পিঁপড়ের মতো একটা জাতি; কেউ যখন পায়ের নিচে পিষে যায় তখন পেছন থেকে অন্যেরা সামনে এগিয়ে আসে এবং তাদের নিরন্তর সামনে এগিয়ে চলার গতি বজায় থাকে…
কেবল শাহই তাকে- খারেজী সুলতানের তকমা দিয়ে সাহায্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেনি, সমরকন্দের লোকদের সে নিজে এরচেয়ে বেশি ক্রুদ্ধ করেছে। প্রায় একমাস আগে, বসন্তের প্রথম দিনে, পারস্যের বাহিনী বোখারার পশ্চিমে শীতকাল অতিবাহিত করার উদ্দেশ্যে স্থাপিত উজবেক শিবিরে হামলা করে। তাদের বন্দি করে পারস্যের বাহিনী প্রমাণ করতে চেয়েছে শাহ্ আর তার সাম্রাজ্যে অতীত আক্রমণের জন্য কেবল না, শিয়া আর সুন্নীদের ভিতরে মতভেদের জন্যও তাদের শাস্তি দিতে তারা এবার বদ্ধপরিকর। শাহ্ ইসমাইলের অনুরোধে, পারস্যের মসজিদে, মোল্লার দল এখন সব সুন্নীকে আল্লাহতালার শত্রু হিসাবে ঘোষণা করছে। আর উজবেকরা- বাবর আর সমরকন্দের অধিবাসীদের মতো সুন্নী মুসলমান। পারস্যের সেন্যবাহিনী বন্দি উজবেকদের শিয়া ধর্মমত গ্রহণের আদেশ দেয় এবং তারা মানতে রাজি না হলে নির্মমভাবে তাদের হত্যা করে।
