“নিচের কেউ যেনো বুঝতে না পারে আমি এখানে রয়েছি।” সে ফিসফিস করে বলে। “ভালো মানুষের মতো জানালার কাছ থেকে সরে এসো- এখনই!” খঞ্জরটা এই উদ্ধত মূখের পাঁজরে আমূল গেঁথে দিতে পারলে বা তাকে নিচের লোকগুলোর মাঝে ছুঁড়ে ফেলে দিলেও তার রাগ কিছুটা কমতো- ব্যাটার সেটাই প্রাপ্য। কিন্তু সমরকন্দের স্বার্থে সেরকম কিছুই সে করতে পারবে না।
বাবরকে বিস্মিত করে হুসেন তার কথামতো জানালা থেকে সরে আসে।
“ঘুরে দাঁড়াও।”
মোল্লা ঘুরে দাঁড়িয়ে বাবরকে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে তার চোখে ক্ষণিকের জন্য স্বস্তি ফুটে উঠে। সম্ভবত একটু আগে শহীদের দর্জা নিয়ে বেহেশতে শিয়া ভাইদের সাথে খানাপিনা করার ব্যাপারে সে হয়তো ঠিক ততোটা উৎসুক না। এমন সময়ে, একটা প্রচণ্ড আঘাতের শব্দ, সাথে বুনো উল্লাস আর উৎসাহী চিৎকার বলে দেয় যে নিচের ক্রুদ্ধ জনতা দরজাটা প্রায় ভেঙে ফেলেছে।
“সিঁড়ি দিয়ে জলদি ছাদে যান- এখনই।”
মোল্লা তার আলখাল্লা সামলে নিয়ে আধা দৌড় আধা হোঁচট খেতে খেতে আদেশ অনুযায়ী কাজ করে।
বাবর তার পরিকরে খঞ্জরটা গুঁজে রাখতে রাখতে বুঝতে পারে মোল্লাকে সামলাতে তার আর কোনো ঝামেলা হবে না, সে তাকে অনুসরণ করে। ছাদে উঠে এসে কাঠের পাটাতন বন্ধ করার ফাঁকে সে চিন্তা করতে চেষ্টা করে কোনদিকে যাবে। গাছ বেয়ে নামবার চেষ্টা করলে আর দেখতে হবে না, আর সে ঠিক বুঝতেও পারে না মোল্লা গাছ বেয়ে নামতে পারবে কিনা।
বাবর ছাদের উপর দিয়ে দৌড়ে আরেক প্রান্তে যায় এবং নিচের দিকে তাকায়। নিচে একটা চওড়া রাস্তার দুপাশে সে সারি দিয়ে কামারশালার মতো কিছু দেখতে পায়- সম্ভবত শহরের অস্ত্রশালা এদিকেই। শুক্রবার হওয়াতে দোকানগুলো বন্ধ আর একেবারে নির্জন। ছাদ থেকে শান বাঁধানো রাস্তা কমপক্ষে পঁচিশ ফিট নিচে আর দুপাশের মাটির দেয়ালেও সে আশাব্যঞ্জক কিছু দেখতে পায় না। কিন্তু নীচ থেকে ভেসে আসা আরেকটা জোরালো আওয়াজ হলে সে বুঝতে পারে ভাববার জন্য তার হাতে বেশি সময় নেই। প্রবেশদ্বার আর বেশিক্ষণ উত্তেজিত জনতাকে আটকে রাখতে পারবে না। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। “আপনার পরিকর খুলেন এখনই।”
চোখ পিটপিট করে, মোল্লা তার কথা মতো কাজ করে। কোমর থেকে প্রায় নয় ফিট লম্বা ভারী জরির কাজ করা রেশমের মোটা পরিকর খুলে দেয়। বাবর এবার নিজের পরিকর থেকে খঞ্জরটা খুলে নিয়ে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা জুতোর ভেতরে খুঁজে রেখে, মোটা, শক্তিশালী উলের তৈরি বেশ ছোট সাত ফুট লম্বা পরিকরটা খুলে নেয়। তাদের এরপরেও লাফ দিতে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সে এরচেয়ে ভালো কিছু উপায় ভাবতে পারছে না…সে পরিকর দুটো একসাথে বেঁধে নিয়ে উলের দিকটা তার কাছে শক্তিশালী মনে হয়েছে- ছাদে স্থাপিত কপিকলের, শস্যদানা বা অন্য রসদ সংরক্ষণের জন্য ছাদে তোলার কাছে ব্যবহৃত, সাথে আটকায়। তারপরে অন্যপ্রান্তটা নিচের দিকে ছুঁড়ে দেয়।
“আপনি প্রথমে নামবেন। আমাদের দুজনের ভিতরে আপনার ওজন বেশি- আমি আপনার ওজন কিছুটা সামলাতে চেষ্টা করবো।”
মোল্লা কোনোরকম ইতস্তত করে না। বাবর কিনারার দিকে পিঠ করিয়ে নিজে দাঁড়ায় এবং পরিকরের অন্য প্রান্তটা ধরে তার পিঠের পেছন দিয়ে ঘুরিয়ে এনে ডান হাতে ধরে এবার শক্ত করে দাঁড়ায়। বাবর ইঙ্গিত করতে হুসেন সতর্কতার সাথে ছাদের কিনারা টপকে নিচে নামতে শুরু করে। জোড়া দেয়া পরিকর যেনো হাল ছেড়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে এবং গিঁটটা যেনো ছিঁড়ে যাবে।
“তাড়াতাড়ি!” বাবর চেঁচিয়ে ওঠে এবং টের পায় তার হাতে ধরা পরিকরটা সহসা ঢিলা হয়ে গিয়েছে। সে নিচের রাস্তায় উঁকি দিয়ে দেখে মোল্লা বাবাজি নিচের লাল আলখাল্লার স্তূপে জবুথবু ভঙ্গিতে পড়ে রয়েছে এবং কাঁধ ডলছে। ক্রুদ্ধ উত্তেজিত চিৎকার আর কাঠের পাটাতন খোলার শব্দ শুনে বাবর বুঝতে পারে তার হাতে আর বেশি সময় নেই। সে আবার পরিকর দুটো গিঁট দিয়ে বেঁধে শক্ত করে ধরে ভাগ্যের উপর ভরসা করে লাফ দেয়…সে লাফিয়ে নামার সময়ে পা দিয়ে দেয়ালের গায়ে ধাক্কা দেয় পতনের বেগ কমাতে চেষ্টা করে কিন্তু সহসা তার হাত পিছলে যায়।
নিচের একটা কাঠের স্তূপ সামান্য হলেও তার পতনের বেগ সামলে নেয়। মোল্লা যেখানে আছড়ে পড়েছিলো সেখানেই পড়ে থেকে কাতরাচ্ছে এবং ছাদের উপর থেকে উঁকি দেয়া মুখ তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। লোকগুলো কুৎসিত ভাষায় গালমন্দ করে চলেছে। যেকোনো মুহূর্তে তারা জোড়াতালি দেয়া দড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করবে। বাবর মোল্লাকে ধরে দাঁড় করাবার ফাঁকে পেছন থেকে ধাবমান ঘোড়ার খুরের আওয়াজ ভেসে আসতে শুনে। এক সারিতে বাবরের দেহরক্ষী বাহিনী রাস্তাটা দিয়ে ছুটে আসে। তাদের মধ্যে দু’জন ইতিমধ্যে ধনুকে তীর সংযোজিত করেছে, ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা আক্রমণকারীদের বাড়াবাড়ি করতে দেখলে ছুঁড়ে মারবে, তারা অবশ্য ততোক্ষণে পেছনে সরে গিয়ে দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেছে।
“সুলতান, বিচ্ছিন্ন হবার পরে থেকেই আমরা আপনাকে পাগলের মতো খুঁজছি। আমাদের দ্রুত করতে হবে। পুরো শহরে ক্রুদ্ধ জনতা পাগলের মতো ঘুরছে…” তার দেহরক্ষীর একজন ঘোড়া থেকে নেমে লাগামটা তার দিকে এগিয়ে দেয়। বাবর ক্লান্ত ভঙ্গিতে টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ায় এবং ঘোড়ায় চেপে বসে। তার দুজন যোদ্ধা একটা ঘোড়ায় চাপে এবং তখনও কাতরাতে থাকা মোল্লা আরেকজনের পিছনে চেপে বসলে ছোট দলটা কোক সরাইয়ের নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে দ্রুত ঘোড়া ছোটায়।
