প্রাঙ্গনটার এক কোণে, একটা পুরাতন বাড়ির ছাদের প্রান্তভাগের কাছে পুরো বাড়িটাই বিধ্বস্ত হয়েছে- একটার উপরে আরেকটা ছাদ নিখুঁতভাবে ধ্বসে পড়েছে। একটা কুঁয়ো রয়েছে। বাবর দৌড়ে সেখানে যায় এবং চামড়ার মশকটা পানিতে ডুবিয়ে ঈষৎ লোনা পানি আজলা ভরে পান করে। মুখ মুছে সে চারপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। যুদ্ধক্ষেত্রে বা হামলার সময়ে যেমন আত্যন্তিক লক্ষ্যে সবকিছু বিবেচনা করতে থাকে, তেমনিভাবে এখনও তার মস্তিষ্ক কাজ করছে। তার ভাবতে অবাক লাগে বসে থেকে থেকে সে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলো আর কিছু করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলো আর এতো তাড়াতাড়ি তার মনোবাসনা এভাবে পূর্ণ হবে।
তাকে দ্রুত এখান থেকে সরে পড়তে হবে। যেকোনো সময়ে চিৎকার করতে থাকা, ক্রুদ্ধ জনতা- পাশের কিংবা তার পাশের গলিপথ অতিক্রম করে তাকে খুঁজে পাবে। তার ডানপাশে প্রাঙ্গন থেকে একটা সরু গলিপথ এগিয়ে গেছে। সে গলিপথটা ধরে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখে যে ভূমিকম্পের ফলে সেটা ভেঙে পড়া বাড়িঘরের ধবংসস্তূপে একেবারে আটকে আছে।
“ঐ যে ওখানে- হারামজাদা আমাদের সবাইকে খারেজী করতে চেয়েছিলো।” গলির দেয়ালে হেলান দিয়ে বাবর পেছনে প্রাঙ্গনের দিকে ফিরে তাকায়, দেখে আটদশজন লোকের একটা দল, পরণের কাপড় ঘেঁড়া, মুখে রক্ত লেগে আছে। হাতের কাছে লাঠিসোটা যে যা পেয়েছে নিয়ে ছুটে আসছে। নিঃসন্দেহে বেচারারা প্রাণপণে দৌড়ে এসেছে কারণ সবার মুখেই বিক্ষুব্ধতা আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সদ্য খুন করেছে এমন যোদ্ধার অভিব্যক্তি তাদের চোখেমুখে, বাবর বহুবার যা দেখেছে। দোকানদার বা কারখানার কারিগর এই লোকগুলো- যে পেশারই হোক না কেন খুন করেছে আর রক্তের স্বাদ পেয়েছে।
কিন্তু তারা তাকে দেখছে না। বস্তুত পক্ষে সে বুঝতে পারে তারা তাকে দেখেইনি। তারা বাবরের দৃষ্টিসীমার বাইরে এবং উঁচুতে কিছু একটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সতর্কতার সাথে সে প্রাঙ্গনের দিকে পিছিয়ে আসে। তারপরেই সে কেবল দেখতে পায় লোকগুলি কি দেখছে। তারা যে “হারামজাদা”কে ধাওয়া করছে তিনি আর কেউ নন, মোল্লা হুসেন, প্রাঙ্গনের একটা উঁচু অক্ষত ভবনের উপর তলা থেকে তিনি নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার লাল টুপি কোথায় যেনো পড়ে গেছে, কালো চাপদাড়ির উপরে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আছে। কিন্তু ধাওয়াকারীদের দিকে চোখ পড়তেই তার কালো চোখের মণি ঠিকই ঝলসে উঠে।
“সব সুন্নীরাই খারেজী।” সে উপর থেকে গর্জে উঠে। “তোমাদের কেউই বেহেশতে যেতে পারবে না। তোমাদের আত্মা গোবরে পতিত হবে। সাহস থাকলে আমাকে হত্যা করতে পার। আমি শহীদের দর্জা পাব, আর আজ রাতে আমি বেহেশতে আমার শিয়া ভাইদের সাথে মিলিত হবো…”
লোকগুলোকে উসকানোর কোনো প্রয়োজন ছিলো না, তারা ভবনটার কাঠের প্রবেশদ্বারের দিকে এগিয়ে যায়। যা কেউ- সম্ভবত, হুসেন নিজেই বন্ধ করে রেখেছে। লোকগুলো দরজা ভাঙার জন্য যুতসই কিছু খুঁজতে থাকে। বাবর নিজেও মোল্লাকে ঘৃণা করে কিন্তু তারপরেও বেচারাকে সে খুন হতে দিতে পারে না। উপরের দিকে তাকিয়ে, সে দেখে যে চত্বরের দুপাশে যে বাড়িগুলো তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে সেগুলোর ছাদ কাঠের পাটাতন দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত রয়েছে, যার উদ্ভব হয়েছিলো তৈমূরের সময়ে শহরের মেয়েরা যাতে আলো বাতাসে হাঁটবার পাশাপাশি লোকচক্ষুর অন্তরালে পরস্পরের সাথে দেখা করতে পারে।
দেয়ালের টিকে থাকা অংশের কাছাকাছি অবস্থান করে এবং ধবংসস্তূপের উপরে যাতে আছড়ে না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রেখে, হুসেন যে বাড়ির উপরে দাঁড়িয়ে তখনও তড়পানো চালিয়ে গিয়ে তার নিজের কর্মকাণ্ডকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখতে সাহায্য করছে, সেই বাড়ির ত্রিশ গজ দূরে বেড়ে উঠা একটা লম্বা গাছ বেয়ে সে উপরে উঠতে চেষ্টা করে। গাছটার ডানে বামে প্রসারিত ডালপালা সে রাখার অবলম্বন হিসাবে ব্যবহার করে এবং যদিও গাছটার লালচে সোনালী রঙের বেশির ভাগ পাতা ঝরে পড়েছে। তারপরেও যতোটুকু টিকে আছে সেগুলো তাকে ভালোই আড়াল করে রাখে। হাঁসফাঁস করতে করতে বাবর গাছ বেয়ে উঠতে থাকে এবং শীঘ্রই মোল্লা যেখানে দাঁড়িয়ে তখনও সমানে চেঁচিয়ে চলেছে তার পাশের বাড়িটার ছাদে উঠে আসে।
দুটো বাড়িকে যুক্ত করে রাখা কাঠের পাটাতনের উপর দিয়ে দোয়াদুরূদ পড়তে পড়তে যাতে সেটা তার ওজন নিতে পারে। বাবর দুলতে থাকা পাটাতনটা অতিক্রম করে। তারপরে আলতো পায়ে হেঁটে গিয়ে যাতে হুসেন তার উপস্থিতি টের না পায়। সে সামনের কাঠের পাটাতটা টেনে খুলে এবং সতর্কতার সাথে সেটার পেছনে অবস্থিত সংকীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে সাদা রঙ করা একটা ছোট চিলেকোঠায় এসে উপস্থিত হয়। চিলেকোঠার এক কোণে আরেক প্রস্থ চওড়া সিঁড়ি, হুসেন সম্ভবত যেখানে রয়েছে সেদিকে নেমে গেছে। খঞ্জরটা হাতে নিয়ে বাবর বিড়ালের মতো আলতো পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গিয়ে নিচে নামতে থাকে। কয়েক ধাপ নামার পরে, সে নিচের দিকে উঁকি দেয়। মোল্লা বাবাজি একটা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে, ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে হাতপা নাড়ছেন। বাবর সামনে এগিয়ে যায় এবং তার হাতে ধরা খঞ্জরের অগ্রভাগ আলতো করে লোকটার পিঠে ঠেকায়।
