মসজিদ থেকে বের হয়ে আসা নামাজীদের সাথে শীঘ্রই কোলাহলের কারণ খুঁজতে আশেপাশের বাড়িঘর থেকে বের হয়ে আসা লোকজন যোগ দেয় এবং কি ঘটছে। জানতে আগ্রহী হয়ে উঠে। তার দেহরক্ষী দলের সর্বাত্মক প্রয়াস সত্ত্বেও এবং বাবরের কর্চির উঁচুতে ধরে থাকা সমরকন্দের সবুজ রঙের শাহী নিশানও। তারা কোক সরাইয়ের উদ্দেশ্যে ফিরতি পথ ধরলে মসজিদের উদ্দেশ্যে আগুয়ান লোকজনের চাপে প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
পুরো পরিস্থিতি একটা দাঙ্গার রূপ নিতে চলেছে। মসজিদের পার্সী গর্দভগুলোকে যেকোনোভাবে রক্ষা করতে হবে নতুবা সমরকন্দ আক্রমণ করতে শাহের কোনো অজুহাতের প্রয়োজন হবে না। “দ্রুত কোক সরাইয়ে গিয়ে বাড়তি লোকবল নিয়ে এসো। এখনই!” বাবর তার দু’জন লোককে আদেশ দেয়। তারপরে তরবারির বাঁটে হাত রেখে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ভীড়ের ভিতর দিয়ে মসজিদের দিকে এগিয়ে যাবার ফাঁকে, বাকিদের তাকে অনুসরণ করতে বলে। মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে সে উপস্থিত ক্রুদ্ধ লোকদের শান্ত করতে একটা বক্তব্য রাখে।
“পবিত্র কোরানের নামে কসম করে আমি বলছি যে একজনও নারী, পুরুষ বা শিশুকে জোর করে গোত্রান্তরিত করা হবে না!” সে গলার সর্বশক্তি দিয়ে বলে। কিন্তু কেউ তার কথায় কান দেয় না। বরং একটা ক্রুদ্ধ চিৎকারে চারপাশ গমগম করে উঠে। বাবর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে, মোল্লা হুসেন মসজিদের প্রবেশ দ্বার দিয়ে বের হয়ে আসছেন, পার্সী দেহরক্ষীর দল উদ্যত তরবারি হাতে তার ঠিক পেছনেই রয়েছে। একটা পচা তরমুজ বাতাসে ভেসে হুসেনের দিকে এগিয়ে গেলে সে সেটা কাটাবার কোনো চেষ্টাই করে না। তরমুজটা তার পায়ের কাছে আছড়ে পড়তে তার আলখাল্লায় কমলা রঙের আঁশ আর বিচি ছিটকে এসে লাগে। এর ঠিক পরপরই কিছু একটা উড়ে যায় যা দেখতে অনেকটা কাঁচা গোবরের মত। লোকদের সাহস বেড়ে গেলে একটা পাথরের টুকরো মোল্লার বাম কান ছুঁয়ে গিয়ে মসজিদের দেয়ালে আছড়ে পড়ে দেয়ালের কারুকাজ করা নীল টালির একটা চটা খসিয়ে দেয়।
লোকজন এবার আরও সাহসী হয়ে উঠে, হাতের কাছে যা পায় তুলে নিয়ে গালিগালাজের তুবড়ি ছুটিয়ে সামনে এগিয়ে আসে এবং ছুঁড়ে মারতে থাকে। ঘৃণায় তাদের মুখগুলো বিকৃত হয়ে আছে, ঠোঁট উল্টান আর চোখ যেনো ছিটকে বের হয়ে আসবে। তরবারি বের করে বাবর তার দেহরক্ষীদের পার্সী আর ক্রুদ্ধ শহরবাসীদের মাঝে একটা দেয়াল সৃষ্টি করতে বলে। তারপরে, তার ঘোড়ার পাজরে খোঁচা দিয়ে কয়েক পা এগিয়ে এসে সে শেষবারের মতো চেষ্টা করে কুদ্ধ জনতাকে শান্ত করতে। কিন্তু তারা ততক্ষণে কোনো কথা শোনার অবস্থায় আর নেই। পার্সীদের পেড়ে ফেলতে বদ্ধপরিকর লোকগুলো তাকে পাত্তা না দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করে। কমলা পাগড়ি পরিহিত বিশালদেহী এক লোক তার ঘোড়ার লাগাম আঁকড়ে ধরে। লোকটা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলো নাকি তাকেই আক্রমণ করতে এসেছিলো বাবর পরিষ্কার বুঝতে পারে না। কিন্তু সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে খঞ্জর বের করে লোকটার বাহুতে আঘাত করে। ব্যাথায় কুঁকড়ে গিয়ে লোকটা লাগাম ছেড়ে দেয় এবং সামনে হোঁচট খেয়ে পড়ে। বাবরের ভীত ঘোড়াটা পেছনের পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠে এবং এক পায়ের খুর দিয়ে লোকটার মুখে ঘুষির মতো আঘাত করে। একটা পাথরের মতো টুপ করে সংজ্ঞাহীন লোকটা মাটিতে আছড়ে পড়ে।
অন্যেরা এতোক্ষণে তার ঘোড়ার লাগাম ধরে টানাটানি শুরু করেছে তাকে ঘোড়াসুদ্ধ মাটিতে আছড়ে ফেলার মতলব। তারা কি জানে তারা কাকে আক্রমণ করেছে? বাবর পাগলের মত চারপাশে তরবারি চালাতে থাকে। নিজের দেহরক্ষী দলের কাছে ফিরে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু তার আক্রমণকারীরা সংখ্যায় অনেক বেশি। তাদের একজনের হাতে কসাইয়ের চাপাতির মতো দেখতে কিছু একটা ঝলসায়। বাবরকে আঘাত করার বদলে সে চাপাতিটা দিয়ে তার ঘোড়ার গলায় একটা মোক্ষম কোপ বসিয়ে দেয়। বিশাল পশুটা সামনের পা মুড়ে একটা বিকট আর্তনাদের মতো থরথর শব্দ করে মাটিতে আছড়ে পড়ে।
বাবর রেকাব থেকে পা বের করে লাফিয়ে পাশে গড়িয়ে যায়। সে অসংখ্য কণ্ঠস্বরকে বলতে শুনে, “বিশ্বাসঘাতক!” এবং “খারেজী; নব্যতান্ত্রিক!” তারপরে লোকদের সাঁড়াশির মতো হাত নিজের দেহে অনুভব করতে সে মোচড় কেটে কোনোমতে পায়ের ভীড়ের ভিতর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে থাকে যতক্ষণ না চারপাশে পায়ের দঙ্গলের চাপ পাতল। হয়ে আসে। বাবর তার দেহরক্ষীদের থেকে ক্রুদ্ধ জনতার চাপে আলাদা হয়ে পড়তে বুঝতে পারে যতো শীঘ্র সম্ভব তাকে কোক সরাইয়ে ফিরে যেতে হবে। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বাবর লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং মাথা নিচু করে দুহাতে উদ্যত অস্ত্র নিয়ে দৌড়াতে শুরু করে।
একটা বাঁক ঘুরে সে একটা ছোট ফাঁকা চত্বরে এসে উপস্থিত হয় এবং সে পেছনে যে হট্টগোল ফেলে এসেছে এখনও যার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে তার তুলনায় জায়গাটা অনেকটা শান্ত দেখায়। ভূমিকম্পের কারণে দু’পাশের বাড়িঘর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে; দোমড়ানে মোচড়ানো কজা থেকে লোহা থেকে বাঁধান দরজাগুলো হাস্যকর ভঙ্গিতে ঝুলছে এবং দেয়ালে ফাটল ধরছে কিছু কিছু এতোটাই বিশাল যে অনায়াসে প্রাপ্তবয়স্ক একজন লোক প্রবেশ করতে পারবে। বাড়ির মালিক তাদের পরিত্যাগ করেছে আর যেসব এখনও বাসযোগ্য অবস্থায় আছে সেগুলোর মালিকও ভয়ের কারণে সেখানে আপাতত বাস করছে না।
