বিশ মিনিট পরে, জরির কাজ করা সবুজ একটা জোব্বা, কোমরে গাঢ় সবুজ বেণী। করা পশমের পরিকর, আর তার উপরে নরম লোমের আস্তরণ দেয়া আলখাল্লা পরিহিত অবস্থায়, গলায় সোনার কলাই করা একটা কণ্ঠহার, পায়ের হরিণের হলুদ চামড়ার তৈরি নাগরা আর কোমরে আলমগীর ঝুলিয়ে রাজকীয় সাজে সজ্জিত হয়ে বাবর ঘোড়ার চেপে কোক সরাই থেকে বের হয়ে এসে তৈমূরের মসজিদের সুউচ্চ ধনুকাকৃতি খিলান, ইওয়ান, বরাবর এগিয়ে যায়। তার দেহরক্ষীর দল বর্শার ফলা দিয়ে সামনের জনাকীর্ণ সড়ক পরিষ্কার করতে থাকে। কিন্তু জুম্মার নামাজে ব্যস্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে যাওয়া নামাজীদের কলরবের বদলে আজ চারপাশে কেমন একটা নিরানন্দ বিষণ্ণতা বিরাজ করছে।
মসজিদের বাইরে আঙ্গিনায় পৌঁছে গাছের উড়তে থাকা সোনালী ঝরা পাতার মাঝে বাবর ঘোড়ার পিঠ থেকে নামে এবং অনুসরণরত দেহরক্ষী দল নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ইমাম সাহেব- বৃদ্ধলোকটা যিনি পার্সীদের ব্যাপারে তাকে তিরস্কার করতে কোক সরাই গিয়েছিলেন- মেহরাবের কারুকাজ করা মার্বেলের বেদীর একপাশে দাঁড়িয়ে ওয়াজ নসিহত করছেন। মসজিদে নামাজীদের প্রথম সারির ঠিক মধ্যস্থলে সুলতানের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে এবং মাথা নিচু করে সেজদা দেয়। ইমাম সাহেব মানব জীবনের নশ্বরতা নিয়ে আলোচনা করছেন এবং ভূমিকম্পে যারা ক্ষগ্রিস্থ হয়েছে তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। বাবর টের পায়, অসংখ্য চোখ তার দিকে উৎসুক ভঙ্গিতে তাকিয়ে ইমাম সাহেবের কথা শুনছে।
ইমাম সাহেব সহসা কথা বন্ধ করেন। চমকে মাথা তুলে তাকিয়ে বাবর দেখে তিনি মসজিদের প্রবেশ পথের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে সে দরজায় শাহের ব্যক্তিগত মোল্লা ইমাম হুসেনের লম্বা, চাপদাড়িঅলা গাট্টাগোট্টা অবয়বটা দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখতে পায়। তার মাথায় চূড়াকৃতি লাল টুপি আর পরণে শিয়াদের আজানুলম্বিত লাল আলখাল্লা। তার অনুগামী ছয়জন পার্সী অশ্বারোহী সদস্যদের মাথাতেও লাল সালুর সুস্পষ্ট কিজিল-বাশ টুপি। মিম্বারে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক মোল্লার বিস্মিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি তার দিকে এগিয়ে যান চারপাশে ক্রমশ বাড়তে থাকা অসন্তোষের শব্দে কর্ণপাত না করে।
হুসেন সরাসরি বাবরের চোখের দিকে তাকান। “আপনার অতিথি হিসাবে, শিয়া আর সুন্নী, সব মতাবলম্বী বিশ্বাসীদের কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত এই দিনে আমি কি ওয়াজ করতে পারি?”
বহু কষ্টে নিজের ক্রোধ দমন করে যা অনায়াসে প্ররোচণা আর অভব্যতার নিদর্শন। হিসাবে গণ্য হতে পারে। বাবর কাঠখোট্টাভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় এবং বয়স্ক মোল্লাকে মিম্বার থেকে নেমে আসতে ইঙ্গিত করে।
হুসেন তার স্থানে গিয়ে দাঁড়ায়। “আমাকে কথা বলার সুযোগ দেবার জন্য আমি সুলতানের কাছে কৃতজ্ঞ। পরম করুণাময় আল্লাহতালার অপার করুণা তার উপরে বর্ষিত হোক। কয়েকমাস আগে, পৃথিবীর অধিশ্বর পারস্যের শাহ্ ইসমাইলের সহায়তায় আপনারা এক অশুভ শক্তির হাত থেকে রেহাই পেয়েছেন। আপনাদের শত্রু উজবেকরা লেজ তুলে পালিয়েছে এবং আপনারা আপনাদের সুলতানকে ফিরে পেয়েছেন। শাহ্ এজন্য খুবই খুশি হয়েছেন। তিনি আর খুশি হয়েছেন যে মহামান্য সুলতান বাবর শাহ্ ইসমাইলকে অধিরাজ হিসাবে স্বীকার করে নিয়েছেন…শাহ্ আপনাদের সুলতানকে নিজের ভাইয়ের মতো মনে করেন। কিন্তু, সে জন্য অবশ্য, ভাইদের একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হতে হয়। শাহ্ আমাকে আদেশ দিয়েছেন। আপনাদের সুলতানকে একজন বিশ্বাসী শিয়া হিসাবে স্বীকার করে নিতে। যাতে তার প্রজারাও একই বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠতে…” একটা সম্মিলিত আঁতকে উঠার শব্দ মসজিদে ভেসে উঠে…
“না!” বাবর লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। “আমি শাহের প্রতি আমার আনুগত্য ঘোষণা করেছি বটে, কিন্তু আমার ধর্মবিশ্বাস একান্তই আমার নিজস্ব ব্যাপার। আমি কখনও সেটা বদলাবো না বা আমার লোকদেরও জোর করে মত পরিবতনের শিকার হতে দেবো না। বহু শতাব্দি ধরে তৈমূরের বংশধর এখানে শাসক হিসাবে রয়েছে। তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো লাভ হয়নি। আমাকেও হবে না। তোমার প্রভুকে সেটা বলে দেবে…”।
হুসেনের কালো চোখের মণি ঝলসে উঠে, সে মিম্বারের রেলিং আঁকড়ে ধরে। বোঝাই যায়, সে কারো চড়া কণ্ঠস্বর, এমন সেটা সুলতানের হলে, শুনতে অভ্যস্ত না। “আমার প্রভু অনেক উদারতা দেখিয়েছেন। ভুলে যাবেন না আপনি আপনার সালতানাতের জন্য তার কাছে কৃতজ্ঞ।”
বাবর সতর্কতার সাথে তার বাক্য চয়ন করে। “আমি অনেক ব্যাপারেই শাহের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি আরও জানি তিনি একজন বিচক্ষণ মানুষ, যিনি তার বিশ্বস্ত বন্ধুর উপরে অসম্ভব কিছু চাপিয়ে দেবেন না। স্পষ্টতই কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। আমি অবিলম্বে পারস্যে বার্তাবাহক পাঠাবো তা নিরসন করার অভিপ্রায়ে। আমি আপনাকেও পারস্যে ফিরে যাবার পরামর্শ দেবো। আপনার আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনার অভাব তিনি নিশ্চয়ই অনুভব করছেন এবং আপনার অনুপস্থিতির জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন।”
হুসেন তার চাপদাড়িঅলা বিশাল মাথাটা আক্ষেপে এপাশ ওপাশ করে। বাবর ভাবে, অনেক হয়েছে। নিজের দেহরক্ষীদের ইশারায় অনুসরণ করতে বলে সে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসে। মসজিদের উপস্থিত নামাজীরা এতোক্ষণ পর্যন্ত চুপচাপ সব কিছু দেখছিলো আর শুনছিলো। কিন্তু এখন সে তার পেছনে একটা গুঞ্জন শুনতে পায়- ভীমরুলের ক্রুদ্ধ গর্জনের মতো সেটা বাড়তে থাকে। সে হেঁটে আঙ্গিনা অতিক্রম করে ঘোড়ায় চেপে বসতে, লোকজন পিলপিল করে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসতে থাকে। কেউ কেউ শাহ আর তার মোল্লার বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ। কণ্ঠে কিছু বলছে এবং অন্যেরা বাবর বুঝতে পারে তাকে উদ্দেশ্য করে অপমানসূচক মন্তব্য করছে।
