“প্রহরী!” বাবর চিৎকার করে। কিন্তু বুঝতে পারে না সাড়া দেবার মতো অবস্থায় কেউ আছে কিনা। অবশ্য তার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করে সাথে সাথে সে ধাবমান পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। পাশের কক্ষে দায়িত্বরত দেহরক্ষী দলের দুজনকে সে উড়তে থাকা ধূলোর ভিতর দিয়ে দৌড়ে আসতে দেখে। “আমার ব্যক্তিগত হেকিমকে ডেকে পাঠাও। আর অন্য কাউকে খুঁজে পেলে তাকেও নিয়ে এসো। গ্রান্ড উজির সাথে আরও অনেকে আহত হয়েছেন।” বাবর নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এবং টলোমলো পায়ে বাইসানগারের পাশে গিয়ে বসে তার গলার পাশে আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে বহুবার আহত সহযোদ্ধার গলায় সে এভাবে হাত রেখেছে। হ্যাঁ, গ্রান্ড উজির জীবিত- সে তার রক্তের ক্ষীণ কিন্তু ছন্দোবদ্ধ ধারা অনুভব করতে পারে। তার কপালে একটা বিশাল কালশিটে দাগ বেগুনী বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। বাইসানগারের চোখ পিটপিট করে এবং সে চোখ খুলে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে বাবরের দিকে তাকায়।
“ভূমিকম্প হয়েছিলো… হেকিম আসছে।” বাবর তার আলখাল্লার বাইরের অংশ ছিঁড়ে সেটা গোল করে মুড়ে একটা বালিশের মতো করে সেটা বাইসানগারের মাথার নিচে গুঁজে দেয়। “আমি জেনানামহলের অবস্থা দেখতে যাচ্ছি।”
দরবার কক্ষে তার চারপাশে বিভ্রান্ত লোকেরা উঠে দাঁড়িয়ে অপরকে দাঁড়াতে সাহায্য করছে। কিন্তু অনেকেই তখনও অনড় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চুনসুড়কির দলার উপর দিয়ে হড়বড় করতে করতে বাবর বের হয়ে এসে চওড়া সিঁড়ি দিয়ে উপরে জেনানামহলের দিকে দৌড়াতে শুরু করে। একেকবারে দুটো করে ধাপ টপকে যাবার ফাঁকে সে কালো পাথরের গায়ে চওড়া ফাটল খেয়াল করে এবং মশালসমূহ তাদের নির্ধারিত স্থান থেকে পড়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে- সে লাথি। মেরে তাদের একপাশে সরিয়ে দেয়। কিন্তু তৈমূরের দেয়াল এখানেও ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলে নিয়েছে।
সিঁড়ির শেষ প্রান্তে সে লম্বা দ্বৈতদরোজা দেখতে পায়- কিশোর বয়সে বাবর আর তার লোকেরা দরজাটা ভাঙার পরে পুনরায় নতুন করে রূপার আস্তরণ আর টালি দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে- অক্ষতই দাঁড়িয়ে আছে। যদিও দরজার উপরের পাথরের সরদলে একটা ফাটল দেখা দিয়েছে এবং কারুকার্যময় টালির ছাদের অংশ বিশেষ খসে মেঝেতে প্রজাপতির ডানার মতো উজ্জ্বল টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। বাইরে অবস্থানরত পরিচারক দলের কাউকেই সে দেখতে পায় না। দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য সে পরে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেবে ভাবতে ভাবতে বাবর কাঁধ দিয়ে দরজার পাল্লায় ধাক্কা দেয় এবং খুলে ভেতরে প্রবেশ করে।
সে ভেতরে যে মুখটা প্রথম দেখতে পায় সেটা মাহামের, কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল মাথার চারপাশে আলুথালু হয়ে ঝুলে আছে। বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে সে কামরার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে, উল্টে পড়া আসবাবপত্র, ভাঙা বাসনকোসন আর ছিটকে পড়া খাবার ছাড়া পুরো কামরাটা অক্ষতই আছে বলা চলে। ফোঁপাতে থাকা হুমায়ুনকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে মাহাম চকচকে চোখে তাকিয়ে রয়েছে।
“হুমায়ূন দেখেছো? আমি বলেছিলাম না, ভয় পাবার কিছু নেই… এক বোকা দৈত্য কেবল পা দাপিয়ে আমাদের ভয় দেখাতে চেষ্টা করেছিলো…আমি বলেছিলাম না তোমার আব্বাজান ঠিকই আসবেন।” বাবর মাহামের কপালে আলতো করে চুমু খায় এবং হুমায়ূনকে তার কোল থেকে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে তার দেহের উষ্ণতা অনুভব করে। তিন বছর বয়স হবার কারণে বেচারার নাদুসনুদুস ভাব অনেকটাই কমে এসেছে। ছেলেটার বাদামী চোখ- একেবারে তার মায়ের মতোই- বাবরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবী সুলতান কান্না থামিয়ে জুলজুল চোখে বাবরের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে।
*
“ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কততটা ভয়াবহ?”
“বেশ ভালোই ক্ষতি হয়েছে। অনেক বাসস্থান আর শস্যগোলার ক্ষতি হয়েছে, সুলতান। কোক সরাইয়ের মতো শক্ত ছিলো না সেগুলো। প্রায় একশজন মতো লোক ধবংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে এবং আরও তিনশ জন লোক আহত হয়েছে।” বাইসানগারের মাথার বিশাল উজিরের পাগড়ির নিচে, তার মুখ এখনও বিশ্রীভাবে ফুলে রয়েছে যদিও সে দ্রুতই আরোগ্য লাভ করছে।
“পুনর্গঠনের জন্য শাহী কোষাগার থেকে সব ধরণের সুবিধা দেয়া হবে শহরবাসীদের সেভাবেই জানিয়ে দাও- আর কারো প্রয়োজন হলে তাকে আমাদের শস্যভাণ্ডার থেকে সাহায্য দাও…শীতকাল এসে পড়েছে। আমি চাই না আমার লোকেরা এসময় অভুক্ত থাকুক।”
“হ্যাঁ, সুলতান।”
বাইসানগার বিদায় নিতে বাবর তার অষ্টভূজাকৃতি সোনার পানি দিয়ে কারুকাজ করা ব্যক্তিগত সাক্ষাতের জন্য ব্যবহৃত কক্ষে চুপচাপ বসে থাকে। নিজেকে তার ভাগ্যবান বলে মনে হয়। তার দুই বেগমই- মাহাম আর গুলরুখ- আর তার দুই নয়নের মণি হুমায়ূন এবং কামরান সুস্থ আছে। খানজাদা, কাবুলে খুতলাঘ নিগারের সাথে নিরাপদে রয়েছে। কিন্তু তার শাসনকালের প্রারম্ভে এমন বিপর্যয় একটা অশুভ সংকেত হিসাবে বিবেচিত হবে। শহরের লোকজন ইতিমধ্যে ভূমিকম্পের জন্য পার্সীদের উপস্থিতিকে দায়ী করতে শুরু করেছে। জুম্মার নামাজের জন্য মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি বাবরের বিষণ্ণ ভাবনার জাল বারবার ছিন্ন করে। সে ভুলেই। গিয়েছিলো আজ শুক্রবার এবং বড় মসজিদে সবার সাথে তাকে নামাজ আদায় করতে হবে। শহরের লোকেরা এতে প্রীত হবে। আর সেও খানিকটা আধ্যাত্মিক স্বস্তি খুঁজে পাবে, যা হয়তো তার অস্থিরতা আর অস্বস্তি কাটাতে সাহায্য করবে।
