***
“সুলতান তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।” বাইসানগারের কঠোর মুখের বলিরেখাগুলো আরো গভীর দেখায়। তৈমূরের আংটি নিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে ফারগানা আসা সেই যোদ্ধার বলিষ্ঠতা তার আর নেই। বাবর ভাবে, তাকে গ্রান্ড উজিরের দায়িত্ব দিয়ে সে ভালোই করেছে। যোদ্ধা হিসাবে তার লড়াকু মনোভাব আর বিশ্বস্ত তা এমনই উপযুক্ত প্রতিদান আশা করে এবং মাহামও নিজের পিতাকে এভাবে সম্মানিত হতে দেখে খুশিই হয়েছে।
বাইসানগার কি আজকাল নিজের ভেতরে উঁকি দেয়া হতাশা টের পায়? মুখের উপরে শীতল বাতাসের ঝাপটা অনুভব করতে করতে চন্দ্রালোকিত রাতে পাহাড়ের উপর থেকে শত্রুর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে কি সে এখনও আগ্রহী? বা তারার কিংখাবের নিচে, তরবারি পাশে নিয়ে, যখন আগামীকালের গর্ভে কি আছে তা অজানা। কিন্তু আজকের চেয়েও তা বিপদসঙ্কুল আর অনিশ্চিত হবে সেটা নিশ্চিত জেনে, ঘুমাতে যাওয়া? বাবর জানে অভিযানে বেরিয়ে পড়ার জন্য তার এই হ্যাংলামোর কোনো মানে হয় না। কিন্তু সত্যি কথা হলো সমরকন্দে মাত্র ছয় সপ্তাহ কাটাবার পরেই সে আবার বেরিয়ে পড়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে। সে কাবুলে ফিরে গিয়ে দেখতে চায় সেখানে সবকিছু ঠিক আছে। যদিও সেখানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সে যথেষ্ট সুরক্ষিত করেই এসেছে। সে ফারগানা পুনরুদ্ধার করতে চায়। উজবেকদের নাজেহাল দশা হবার পরে স্থানীয় গোত্রপতিরা, যাদের দলে যোদ্ধার চেয়ে কুকুরের সংখ্যা বেশি, যা নিজেদের ভিতরে সুবিধামত ভাগ করে নিয়েছে। সমরকন্দ ছেড়ে বের হতে পারলে সে একটা মোক্ষম আঘাতে তাদের রাজা হবার শখ মিটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তার আগে তাকে শহরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শহরের অভিজাত নাগরিকদের সে ডেকে পাঠিয়েছিল কিভাবে সমরকন্দ আগামীতে শাসিত হবে, সেটা ঘোষণা করবে বলে এবং এখন তারা তার জন্য অপেক্ষা করছে- কোনো সন্দেহ নেই সবাই দায়িত্ববিহীন পদমর্যাদার পারিশ্রমিকের জন্য মুখিয়ে আছে।
বাবর তার দরবার মহলে প্রবেশ করে মঞ্চে উঠে দাঁড়ায়। বাইসানগারের নির্দেশে অপেক্ষমান প্রজারা সবাই নরম গালিচার উপরে নতজানু হয়ে কুর্নিশ করে। উজবেকরা পালিয়ে যাবার সময়ে তাড়াহুড়োর কারণে গালিচাগুলো নিয়ে যেতে পারেনি। বাবর যান্ত্রিকভাবে তাদের কুর্নিশের জবাব দেয়, অন্য কোনো একটা ভাবনা তার মন আচ্ছন্ন করে রেখেছে। পারস্যের অশ্বারোহী বাহিনীর এতোদিনে দেশে ফিরে যাওয়া উচিত ছিলো। বাবরকে সুলতান হিসাবে স্বীকার করে খুতবা পাঠ শেষ হওয়ামাত্র যদিও বেশিরভাগ সৈন্যই দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলো। সঁইপ্রস্তুতকারকদের দরোজার বাইরে তৃণভূমিতে এখনও হাজারখানেক ঘোড়সওয়ার তাঁবু খাঁটিয়ে অপেক্ষা করছে। সেখানে তাদের সাথে শাহের ব্যক্তিগত মাওলানা মোল্লা হুসেন অবস্থান করছেন। সে যখনই তার কাছে জানতে চেয়েছে পার্সীরা তাদের সেনাপতিকে- শাহের গাট্টাগোট্টা চেহারার কঠোর দর্শন এক চাচাতো ভাই নিয়ে কবে পারস্যে ফিরে যাবে। তাকে প্রতিবারই শুনতে হয়েছে তিনি নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছেন। আদেশ পাওয়ামাত্রই সে তার লোকদের নিয়ে ফিরে যাবে।
বাবর তাদের ফিরে যাবার আদেশ দিতে না পারলেও সমরকন্দের রাস্তায় তারা যাতে চলাফেরা না করে সে বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে। জনগণের বিরূপতা এখনও হ্রাস পায়নি। বাবর শাহের আনুগত্য মেনে নিয়েছে জানাজানি হবার পরে তাদের ভিতরে, সে যেমন আশা করেছিলো যে একজন শক্তিশালী সম্রাটকে মিত্র হিসাবে লাভ করে তারা আশ্বস্ত হবে। উল্টো হয়েছে। একটা সন্দেহ শহরের নাগরিকদের মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছে। শহরের মোল্লারা ইতিমধ্যে কয়েকবার তার সাথে দেখা করে নিশ্চিত হতে চেয়েছে যে শাহ তাদের ধর্মের ব্যাপারে আদৌ নাক গলাবে না। শহরের মাদ্রাসার এক বয়োবৃদ্ধ মোল্লা, যার মুখ তার পরণের আলখাল্লার মতোই ফ্যাকাশে ধূসর, তিনি তো বাবরকে খারেজী পার্সীদের সাথে সন্ধি করায় তাকে রীতিমত তিরস্কার করেন। আর পার্সীদের শহর থেকে বের করে দিতে বলেন। “এমনকি উজবেকরা- যদিও আমাদের শহর তারা লণ্ডভণ্ড করেছে তারা আল্লাহতালার সত্যিকারের অনুসারী অন্তত ছিলো…” তিনি বলেন। “উজবেকরা…” বাবর স্বপ্নেও কল্পনা করেনি তাকে এই কথা কখনও শুনতে হতে পারে। পার্সীদের যেভাবেই হোক ফেরত পাঠাতে হবে।
“সুলতান।” বাইসানগারের কথায় তার চিন্তার জাল ছিন্ন হয়। “আপনার প্রজারা অপেক্ষা করছে আপনার বক্তব্য শোনার জন্য।”
বাবর তার হাতের কাগজের ভাঁজ খুলে যেখানে সর্বশেষ শাহী নিয়োগের তালিকা লেখা রয়েছে- ময়ূরকণ্ঠী নীল রঙের আলখাল্লা পরিহিত এক মোটাসোটা সওদাগর উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু সে যখন কাগজের ভাঁজ খুলছে, তখন মখমল আবৃত গিল্টি করা সিংহাসন যে যাতে উপবিষ্ট সেটা একপাশে হেলে পড়ে। বাবর শেষ মুহূর্তে চেষ্টা করে নিজেকে আর সিংহাসন সোজা করতে কিন্তু তাতে ফল হয় বিপরীত সে আলুর বস্তার মতো সিংহাসন নিয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ে। বাতাসে মড়মড় শব্দ আর দরবারের সবকিছুই যেনো কেঁপে উঠে। উজ্জ্বল। টালিযুক্ত চুনসুড়কির একটা দলা তার পাশে আছড়ে পড়ে।
কটু-স্বাদের ধোঁয়ায় বাতাস আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং বাবর টের পায় তার শ্বাস আটকে আসছে। কিন্তু সে মরীয়া হয়ে নিঃশ্বাস নিতে চেষ্টা করতে মুখ পাথরের কণায় ভরে উঠে। তার চোখ খুলে রাখতেও কষ্ট হয়। দু’হাতে মাথা ঢেকে সে অপেক্ষা করে এই বুঝি আরেক টুকরো চুনসুরকির দলা তার মাথায় ভেঙে পড়লো। কিন্তু উদ্বিগ্ন কয়েক মুহূর্ত কাটাবার পরে যেমন আকস্মিকভাবে কম্পন শুরু হয়েছিলো ঠিক সেভাবেই সব শান্ত হয়ে যায়। তার চারপাশে বাড়তে থাকা গোঙানির শব্দে বাবর সতর্কতার সাথে মাথা তুলে এবং অঝোরে পানি ঝরতে থাকা চোখ কোনোমতে সামান্য ফাঁক করে তাকায়। কয়েক স্থানের পাথর স্থানচ্যুত হলেও কোক সরাইয়ের ছাদ আর দেয়াল ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলে নিয়েছে। তৈমূরের নির্মাতারা দারুণ কাজ করে গিয়েছে। কিন্তু চারপাশে ভালো করে তাকালে সে মেঝেতে বাইসানগারকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তার উজ্জ্বল সবুজ রঙের শাহী আলখাল্লা এখন ধূসর হয়ে গিয়েছে।
