“সুলতান?”
“বাবুরী- সে চলে গিয়েছে। তাকে খুঁজে ফিরিয়ে নিয়ে আসবার জন্য লোক পাঠান। এখনই পাঠান, এই মুহূর্তে!” বাবর এতোক্ষণে বুঝতে পারে সে চেঁচিয়ে কথা বলছে।
বাইসানগার চমকে উঠে এবং দ্রুত বাবরের কথামতো লোক পাঠাবার জন্য রওয়ানা হলে বাবর বাবুরীর তাঁবুর ভিতরে আবার প্রবেশ করে। সে ভাঙা ধনুকটা মাটি থেকে তুলে নেয়। বাইসানগারের লোকের ঘোড়া নিয়ে তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও কোনো লাভ নেই। বাবুরী যদি হারিয়ে যেতে চায় তবে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
৩.৫ কিজিল-বাশ, টুপিতে লাল সালু
১৯. কিজিল-বাশ, টুপিতে লাল সালু
১৫১১ সালের শরৎকালের সেই উজ্জ্বল সূর্যালোকিত দিনটার কথা বাবর নামায় বিশেষ করে লিখতে হবে। বাবর ভাবে, যখন সে কালো উজবেক নিশানের বদলে ঝিরঝির বাতাসে পতপত করে উড়তে থাকা উজ্জ্বল সবুজ নিশানা সজ্জিত ফিরোজা দরোজার নীচ দিয়ে তার সেনাবাহিনী নিয়ে শহরে প্রবেশ করেছিলো। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ এক তরুণ হিসাবে দশ বছর আগে সে শেষবারেরমতো সমরকন্দে একজন সুলতান হিসাবে প্রবেশ করেছিলো। আজ তার বয়স উনত্রিশ বছর, সেদিনের পর থেকে তার জীবনে যা কিছু ঘটেছে সবকিছুই তাকে অভিজ্ঞ আর পোড়খাওয়া এক যোদ্ধায় পরিণত করেছে।
কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই শহরটার পতন হয়েছে। পারস্যের শাহের অশ্বারোহী বাহিনী এসে যোগ দেবার পরে বাবরের ঘোড়সওয়ারের সংখ্যা বিশ হাজারে উন্নীত হতে দখলদার উজবেকদের যুদ্ধ করার ইচ্ছা বেমালুম উবে গিয়েছিলো। বাবরের শক্তিশালী বাহিনীর মোকাবেলা করার বদলে তারা শহর ছেড়ে উত্তরের পাহাড়ে তাদের শক্তিশালী ঘাঁটি কারসিতে পালিয়ে যাওয়াকেই বাঞ্ছনীয় মনে করে। তাদের পলায়নের সংবাদ শুনে বাবর সাইবানি খানের করোটি রক্ত লাল সুরায় পূর্ণ করে তাতে একটা গভীর চুমুক দিয়ে তার সেনাপতিদের পর্যায়ক্রমে করোটিপাত্র থেকে পান করতে দেয়।
কাড়া-নাকাড়ার গমগমে আওয়াজের মাঝে, ঝকঝক করতে থাকা তোরণদ্বারের নিচে দিয়ে অতিক্রম করার সময়ে সে উৎফুল্ল চিত্তে ভাবে, অবশেষে আমার দিন বদলালো। আজ রাতে সে আর মাহাম- শাহী হারেমের অন্য মেয়েদের সাথে, সোনালী আর সবুজ টোপর দেয়া খচ্চরটানা গাড়িতে ভ্রমণ করছে। অনেক দিন পরে মিলিত হবে। শাহী জ্যোতিষবিদের গণনা অনুসারে, পুত্র সন্তান গর্ভধারণের জন্য গ্রহ-নক্ষত্র আজ তাদের সঠিক অবস্থানে রয়েছে। সে আরো একজন উত্তরাধিকারী লাভ করবে আর মাহামও হুমায়ুনের পরে আর কোনো সন্তান জন্ম। দিতে না পারার দুঃখ থেকে মুক্তি পাবে।
তোরণদ্বারের নিচের আবছা অন্ধকারের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে এসে সে শহরে প্রবেশ করতে, তার প্রজাদের উৎফুল্ল সমর্থন চিৎকারের মহিমায় গর্জে উঠে- উজ্জ্বল আলখাল্লার একটা জীবন্ত রংধনু- তার নাম আর তৈমূরের নাম এমন উদ্দীপনায় ধ্বনিত হয়, যেনো তার মহান পূর্বপুরুষ তার পাশেই রয়েছেন। দূর্গপ্রাসাদ এবং কোক সরাই অভিমুখী প্রশস্ত রাজপথ দিয়ে এগিয়ে যাবার সময়ে সে দেখে পথের দুধারে দোকানদারেরা তাদের দোকান সমরকন্দের বিখ্যাত রক্তলাল মখমল আর ভারী জরির কাজ করা পর্দা দিয়ে সাজিয়েছে। বাড়ির ছাদ আর জানালা থেকে অন্তপুরের মেয়েদের ছুঁড়ে দেয়া গোলাপের শুকনো পাপড়ি গোলাপী তুষারকণার মতো বাতাসে ভাসতে থাকে।
কিন্তু সহসা এই হাস্যোস্ফুল্ল আবহাওয়ায় ছেদ পড়ে। জনগণের ভেতর থেকে কর্কশ, ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে আসে: “কিজিল-বাশ! কিজিল-বাশ!” লালসালু! লালসালু! বাবর ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে ফিরোজা দরোজা দিয়ে প্রবেশ করা পারস্যের অশ্বারোহী বাহিনীর দিকে লোকেরা তাকিয়ে রয়েছে। একটা কণ্ঠস্বরের আওয়াজ এখন অসংখ্য কণ্ঠস্বর আপন করে নিয়েছে। সমবেত জনতা উত্তেজিত ভঙ্গিতে পার্সীদের মাথার চূড়াকৃতি পাগড়ি আর তার পেছনে ঝুলতে থাকা লাল কাপড়ের ফালির দিকে ইঙ্গিত করছে, যার মানে বাবর আর সমরকন্দের লোকদের মতো তারা সুন্নী মুসলমান না, বরং তাদের সম্রাট শাহের মতো তারাও শিয়া।
কোনো ব্যাপার না, বাবর নিজেকে প্রবোধ দিয়ে, গর্বিত ভঙ্গিতে সামনের দিকে তাকায়। সে শীঘই পারসিকদের দেশে ফেরত পাঠাবে আর তার প্রজারা তাহলে বুঝতে পারবে কেবল শিয়া হবার কারণে তাদের ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তারপরেও সে তাদের বিক্ষুব্ধ চিৎকার আর বিড়ালের মাও ডাক ভুলতে পারে না।
তিন ঘণ্টা পরে, কোক সরাইয়ের আম দরবারে চিন্তিত মনে একাকী দাঁড়িয়ে ছাদের আর দেয়ালের চকচকে নীল, ফিরোজা, হলুদ আর সাদা টালির জ্যামিতিক নকশার দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ে, যা প্রথমবার তাকে ভীষণ বিমোহিত করেছিলো, এই নতুন আশঙ্কা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এই মুহূর্তটার জন্য সে অনেকদিন প্রতীক্ষা করেছে, কিন্তু তারপরেও তার মনে হয় ফিরে আসবার গৌরব যেনো অনেকটাই ফিকে হয়েছে, ব্যর্থতার দাগ লেগেছে।
তার চারপাশের এই চমৎকারিত্ব ফিকে হয়ে সেখানে বাবুরীর মুখ ভেসে উঠে। বাবুরীর এখানে এখন নীল চোখে নিরব বিদ্রূপ নিয়ে তাকিয়ে থাকা উচিত ছিলো। কিন্তু সে উপস্থিত থাকলে এই মুহূর্তে কি মন্তব্য করতো? যে সেই আগাগোড়া ঠিক বলেছে, যে বাবর নিজেই এখন আর নিজের ভাগ্যনিয়ন্ত্রক না, অন্য কারো হাতের খেলার পুতুল? সে ভবিষ্যতের কথা ভাবলে যা কতোটাই না মহিমাময় হবে বলে সে ভেবেছিলো, বাবরের এবার সত্যিই নিজেকে একা মনে হয়…
