বাবুরীর ভাষাজ্ঞান দেখে ক্রোধে অন্ধ হয়ে বাবর নিজেকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে, একপা পেছনে সরে আসে এবং বাবুরীর অবজ্ঞাপূর্ণ মুখে গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে একটা ঘুষি বসিয়ে দেয়। সে বন্ধুর নাক ভাঙার একটা ভোতা শব্দ শুনতে পায় এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে।
মুহূর্তের জন্য, বাবুরী নিজের খঞ্জর আঁকড়ে ধরে আর বাবরও সহজাত প্রবৃত্তির বশে নিজের খঞ্জরের বাঁট স্পর্শ করে। কিন্তু খঞ্জর থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে সে ডান হাত তুলে নিজের নাক স্পর্শ করে এবং বাবরের চোখ থেকে চোখ না সরিয়ে সে তার বাম হাত দিয়ে রক্তে ভেজা জোব্বার কোমরের চারপাশে জড়ানো পরিকরের শেষপ্রান্তটা খুঁজে নেয়। সেটা খুঁজে পেতে আঁকড়ে ধরে চেষ্টা করে সেটা দিয়ে রক্তপাতের বেগ প্রশমিত করতে।
“বাবুরী…”
মুখ থেকে পরিকরের প্রান্তটা এক পলের জন্য সরিয়ে সে বাবরের পায়ের কাছে থুতু ফেলে। তারপরে ভেড়ার চামড়া দিয়ে মোড়া মেঝেতে চুনির মতো লাল রক্তের। ফোঁটার একটা ধারা ফেলতে ফেলতে সে ঝুঁকে তাঁবুর নিচু পর্দা সরিয়ে বের হয়ে যায়।
বাবর বহুকষ্টে তাকে অনুসরণ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। সে একজন। সুলতান এবং বাবুরীর উচিত ছিলো সেটা মনে রাখা। তাকে আঘাত করাটা তার। উচিত হয়নি কিন্তু বাবুরীও কম যায় না…ব্যাটা একটা মাথা গরম, গাড়ল। বেল্লিকটা ঠাণ্ডা মাথায়, যুক্তি দিয়ে পুরো বিষয়টা- তারমতো- ভাবলে বুঝতে পারবে বাবর। ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে… বাবর মাথা উঁচু করে, কোনোভাবে লজ্জিত না হয়ে ফিরোজা দরোজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করবে।
“প্রহরী!” বাবর চেঁচিয়ে উঠে ডাকে। একটা লোকের মাথা তাঁবুর পর্দা সরিয়ে ভেতরে উঁকি দেয়। “আমার যুদ্ধ মন্ত্রকের সভা আহবান করো।”
*
বাবর পারস্যের রাজদূত আর তার লোকজনকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিদায় জানায়। রাজদূতের ঘোড়ার পর্যানে বাবরের দস্তখত করা একটা চিঠি রয়েছে যেখানে সে শাহের কাছে নিজের বিশ্বস্ততা কবুল করেছে। আজ রাতে তার শিবিরে আরও বড় উৎসবের আয়োজন করা হবে। বাবর তার সেনাপতিদের কাছে আজ রাতে ঘোষণা করবে যে পারস্যের অতিরিক্ত সেনাবাহিনী এসে পৌঁছানো মাত্র তারা উত্তর-পূর্ব দিকে সমরকন্দের দিকে রওয়ানা দেবে। সেখানের উজবেকদের বিতাড়িত করে তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে। তার লোকেরা আরও ধনসম্পদ প্রাপ্তির সম্ভাবনায় চেঁচিয়ে উঠে নিজেদের সম্মতি প্রকাশ করবে। শাহের কাছে সে কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেটা নিয়ে তর্কে যাবার সময় এটা না। শীঘ্রই সে আবার সমরকন্দের নীল-গম্বুজঅলা প্রাসাদ আর মসজিদের প্রভু বলে স্বীকৃত হবে। বিবেচনা করবে কিভাবে তার লোকদের কাছে বিষয়টা উপস্থাপন করবে। আর তারা এসব নিয়ে খামোখা কেন বিব্রত হবে? তৈমূর বংশীয় এক শাহজাদাই তাদের শাসন করছে, কোনো বর্বর পুরুষানুক্রমিক শত্রু না। পারসিকরা তাদের বহুদূরের আবাসস্থলে ফিরে যাবে। আর সেও অফুরন্ত সময় পাবে নিজের পরবর্তী অভিযান নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার।
বাবুরী গাধাটা নিশ্চয় কোথাও একাকী নিজের আহত নাক আর অহমিকার শুশ্রূষা করছে। এখন তার নিজের ক্রোধ প্রশমিত হতে আর চুক্তি সম্পাদিত হয়ে যাবার পরে এবং শাহের প্রতিনিধি দল বিদায় নিতে, বাবর তার বন্ধুর সাথে দেখা করে নিজেদের ভেতরকার ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে ফেলতে তৎপর হয়। বলা হয়নি এমন অনেক কথা আছে যা বলতে হবে। অনেক কিছু সে বলেছে অযথাই কঠোরভাবে… তার পরনে তখনও উজ্জ্বল সবুজ আলখাল্লা- সমরকন্দের স্মরণে সে সকালে পরিধান করেছিলো- যা পরেই সে পারস্যের প্রতিনিধি দলকে বিদায় জানিয়েছে। বাবর আনমনে অস্থায়ী শিবিরের ভিতর দিয়ে বাইসানগারের তাঁবুর দিকে হেঁটে যায় যার পাশেই বাবুরীর তাঁবু।
সে পর্দা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। মেঝেতে রক্তের দাগযুক্ত কাপড়ের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে এবং মামুলি জিনিসপত্র যার বেশিরভাগই কাপড়চোপড় এদিক ওদিক ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, যেনো কেউ তাবু ত্যাগ করার আগে সাথে কি নেবে আর নেবে না সেটা ঠিক তড়িঘড়ি করে ঠিক করেছে। তাঁবুর এককোণে একটা ভাঙা কাঠের মতো দেখতে কিছুর টুকরো পড়ে আছে। বাবর কাছে যেতে বুঝতে পারে সেটা আর কিছু না বাবুরীকে সে যেদিন, কোনো বেগী, ওস্তাদ ধনুর্ধর উপাধিতে ভূষিত করেছিলো সেদিন সে তাকে এই তীর আর সোনার কারুকাজ করা তূণ দিয়েছিলো। তীরটা ভেঙে দু’টুকরো করা এবং তূণটা তোবড়ানো, যেনো কেউ সেটা মাটিতে ফেলে তার উপরে লাফিয়েছে- কারুকাজ করা পাথরগুলো খুলে গিয়েছে। বাবর একটা পাথর মেঝে থেকে কুড়িয়ে নেয়। ছোট গোলাকার পাথরটা শীতল অনুভূত হয়।
বাবর দ্রুত তাঁবু থেকে বের হয়ে আসতে গিয়ে বাজপাখি উড়াবার সময়ে বাবুরীর ব্যবহৃত কালো চামড়ার দাস্তানায় আরেকটু হলে হোঁচট খেয়ে উল্টে পড়তো। বাইসানগার তাঁবুর বাইরে দু’জন প্রহরীকে কি সব নির্দেশ দিচ্ছে।
“বাবুরী কোথায়?”
“সুলতান, আজ সকাল থেকে আমি তাকে দেখিনি।”
“খুঁজে দেখো তার ঘোড়া আছে কিনা?”
বাইসানগার এক উজবেক সর্দারের কাছ থেকে বাবুরীর কেড়ে নেয়া বাদামী রঙের সুন্দর ঘোড়াটার খোঁজে লোক পাঠায়, কিন্তু বাবর ততক্ষণে উত্তর জেনে গিয়েছে। “গাধাটা চলে গেছে…”
