সে বাইরে থেকে কারো কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে শুনে এবং তার একজন প্রহরী তাঁবুর ভেতরে উঁকি দেয়। “অশ্বশালার আধিকারিক আপনার সাথে দেখা করতে চান।” বাবর মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। যুদ্ধ মন্ত্রকের সভা আহ্বান করার পূর্বে বাবুরীর সাথে এ বিষয়ে আলাপ করে নেয়াটা মন্দ না।
“বেশ, দেড়েল ব্যাটা কি চায়?” বাবরের পাশে রাখা একটা কাঠের টুলে বসতে বসতে বাবুরী বলে।
“স্ট্যালিয়নটা আর খানজাদাকে ফেরত পাঠানোটা ছিলো আসলে আমাকে নরম করার একটা কৌশল। পারস্যের শাহ আমাকে একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। সমরকন্দ। থেকে বাকি উজবেকদের বিতাড়িত করতে এবং সেখানে আমার শাসন কায়েম। করতে তিনি আমাকে সৈন্য পাঠিয়ে সাহায্য করতে চান। কেবল তার একটা শর্ত আছে যে, তাকে আমার অধিরাজ হিসাবে মেনে নিতে হবে।”
বাবুরীর ইস্পাত নীল চোখে বিস্ময় ঝলসে উঠে। “সমরকন্দ শাহের এক্তিয়ারের ভিতরে পড়ে না…তার কি অধিকার আছে? আর কিভাবেই বা তিনি আপনাকে আজ্ঞাবাহক সামন্তরাজ হিসাবে আশা করেন?”
“তিনি পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী নৃপতি। তিনি সাইবানি খানের ভবলীলা সাঙ্গ করেছেন…যা করতে আমাদের হয়তো আরো কয়েক বছর লাগতো…যা হয়তো আমরা কখনও সম্পন্নও করতে পারতাম না…” বাবর মৃদু কণ্ঠে বলে।
“আপনি নিশ্চয়ই তার শর্ত মেনে নিতে চাইছেন না?”
“ক্ষতি কি? আমি সবসময়ে সমরকন্দ নিজের করে পেতে চেয়েছি- সবকিছুর চেয়ে তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আর একবার সমরকন্দ অধিকার করতে পারলে ফারগানা অধিকার করা তখন কেবল সময়ে ব্যাপার। সাথে কাবুলের সালতানা যোগ করলে আমি নিজেই নিজের সাম্রাজ্যের ভীত স্থাপন করতে পারবো…যা আমি আমার অনাগত বংশধরদের জন্য রেখে যেতে পারবো…”।
“শালা হাড়হারামী পারসিক বানচোত তার নরম নরম কথা, মিষ্টি মিষ্টি প্রতিশ্রুতি, আর চাটুকারীতা করে আপনাকে নির্ঘাত জাদুটোনা কিছু একটা করেছে। আমরা কি এজন্যই এতো কষ্ট করেছি এতোদিন? বরফাবৃত পাহাড়ে আমাদের পথ পরিক্রমা, ক্ষুধায় পরিশ্রান্ত সেইসব দিন যখন এক টুকরো রান্না করা মাংস অমৃত বলে মনে হয়েছে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা… আমাদের রক্তক্ষরণ…আমাদের বিজয় এসব কি তবে অর্থহীন?”
“সব কিছুর বদলে আমরা কি এখন কিছু প্রতিদান আশা করতে পারি না? বিগত বছরগুলো আমাদের যেনো ঘূর্ণিঝড়ের ভেতরে কেটেছে। আমি যখনই কোথাও থিতু হতে চেষ্টা করেছি আমাকে সেখান থেকেই বিতাড়িত হতে হয়েছে। কিন্তু আমি এখনও বেঁচে আছি- আমার ভাই মাহমুদ খানের মতো আমার চামড়া ছাড়িয়ে ঢোল বানানো হয়নি বা হিরাতে আমার পুরুষ আত্মীয়দের ন্যায় জবাই হইনি, বা ফারগানায় আমার সৎ-ভাইয়ের মতো খুন হয়ে যাইনি…আমি অনুভব করছি অবশেষে সময় হয়েছে…”।
“তাহলে বোকার মতো কিছু করে বসবেন না। আপনার বোনের ফিরে আসার ফলে বোধগম্য কৃতজ্ঞতাবোধ যেনো আপনার বিচারবুদ্ধিকে প্রভাবিত না করে। আপনার এখন একটা সেনাবাহিনী রয়েছে- দক্ষ একটা সেনাবাহিনী। পারসিকদের পারস্যেই থাকতে বলেন। আমরা নিজেদের বাহুবলে সমরকন্দ অধিকার করতে পারবো। ফিরোজা দরোজা দিয়ে আমরা আপনার লোক হিসাবেই সমরকন্দে প্রবেশ করতে চাই অন্যের ভাড়াটে গোলাম হিসাবে না।”
“তুমি বুঝতে পারছো না…” বাবর ক্রমশ ক্রুদ্ধ হতে থাকে। বাবুরী সবসময়েই এমন একগুয়ে।
“আমি বুঝতে পারছি না। আরেকজন তৈমূর হবার উদগ্র আকাক্ষা আপনাকে অন্ধ করে তুলেছে- নির্বোধের মতো আপনি সংক্ষিপ্ত পথে সফল হতে চাইছেন।”
“তুমি সেটা কিভাবে বলছো?”
“কারণ আমি রাস্তা থেকে উঠে এসেছি? আপনি বোধহয় সেটাই বলতে চাইছেন?” বাবুরী উত্তেজনার বশে উঠে দাঁড়িয়ে টুলটা এক লাথিতে উল্টে ফেলেছে। আমি সে কারণেই দিবালোকের মতো স্পষ্ট সবকিছু দেখতে পাচ্ছি আপনার চেয়ে- আহাম্মক কোথাকার। আপনি যদি শাহের প্রস্তাব মেনে নেন, তাহলে ব্যাপারটা হবে অনেকটা কিছু দুবৃত্তের কুপ্রস্তাবে সাড়া দিয়ে আমার কানাগলি দিয়ে এগিয়ে যাবার মতো, যারা আমাকে এর বিনিময়ে পেটভরে খেতে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে…শাহ আপনাকে যে প্রজনন স্ট্যালিয়নটা পাঠিয়েছে, আপনি নিজের অজান্তে তার শাবক উৎপাদনের ঘোটকীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চলেছেন প্রভুর প্রতিটা আজ্ঞা পালন করে তাকে সন্তুষ্ট করতে বাধ্য…আমি কখনও এতোটা বেপরোয়া হতাম না। আপনার এমনটা করা উচিত হবে না…আপনি একবার তার প্রভাবের ভিতরে চলে আসলে সে আরো বড় কোনো শর্ত নিয়ে ফিরে আসবেই…”
“তুমি আহাম্মকের মতো কথা বলছে। আমাকে একলা থাকতে দাও।” বাবর উঠে দাঁড়ায় এবং মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। বাবুরী অন্য আর সবার মতো কেন তার পরিকল্পনায় সায় দিচ্ছে না?
বাবুরী তার আদেশ অমান্য করে। সে চলে যাবার বদলে বাবরের কাঁধ আঁকড়ে ধরে, গনগনে চোখে, তার মুখ নিজের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। আপনি আপনার যে আব্বাজানের কথা এতো বলেন, তিনি বেঁচে থাকলে কি বলতেন? বা আপনার সেই জাদরেল নানীজান ইস্পাতের মতো তীক্ষ্ণ ছিলো যার বিচক্ষণতাবোধ? আপনাকে এতো সহজে কেনা যায় দেখে, অন্য লোকের অধীনস্ত করা যায় দেখে,– প্রভুর ইচ্ছায় পাছার কাপড় তুলে তার মর্জিমত যেকোনো কিছু করতে ইচ্ছুক… তারা মরমে মরে যেতেন।”
