“সাইবানি খান সমরকন্দের কোক সরাইয়ের ভূগর্ভস্থ কক্ষে তাকে জীবন্ত সমাধিস্ত করেছে। সে বলতে ভালবাসতো যে সেই মানুষের জীবন মৃত্যুর নিয়ন্ত্রাতা। সে বলেছিলো উজির কন্যার ধৃষ্টতার জন্য সে তাকে শাস্তি দিয়েছে…”।
রাত ক্রমশ গম্ভীর হতে থাকে এবং খানজাদা তার অগ্নিপরীক্ষার কথা ধীরে ধীরে বলতে থাকলে, বাবর অল্প অল্প করে বুঝতে পারে সে কিভাবে পাগল না হয়ে বেঁচে থেকেছে। ব্যাপারটা এমন যেনো সে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। নিজেকে আশ্বস্ত করেছে চারপাশে অনভিপ্রেত যা কিছু ঘটছে- তার সাথে ঘটছে সে সবকিছুই অন্য কারো সাথে ঘটছে। অনেকটা আয়েশার মতো মনোভাব। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি যুক্তিগ্রাহ্য, সে মনেপ্রাণে অন্য কোথাও নিজেকে কল্পনা করতে চেয়েছে এবং নিজের মনকে সে সেভাবেই ভাবতে শিখিয়েছে।
খানজাদার মুখের ম্লান হাসি দেখে তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে। কিন্তু একই সাথে তার মানসিক শক্তি তাকে গর্বিত করে তোলে। তার নশ্বর দেহের সাথে যতোই অত্যাচার করা হোক, সেসব তার মনকে নতজানু করতে বা দমাতে পারেনি। এসান দৌলত যদি চেঙ্গিস খানের সত্যিকারের মেয়ে হয়ে থাকেন, তবে খানজাদাও তার যোগ্য উত্তরসুরী…তার অভিজ্ঞতা নিশ্চিতভাবেই ভীতিকর, কিন্তু সেসব তার অস্তি ত্বকে ধবংস করতে পারেনি। তার বয়স এখন প্রায় একত্রিশ বছর। আর জীবনের এক তৃতীয়াংশ সময় সে এক নিষ্ঠুর স্বেচ্ছাচারীর হাতের খেলার পুতুল ছিলো। কিন্তু পোষা বেজীর সাথে খুনসুঁটি করা সেই মেয়েটা কিভাবে যেনো আজও বেঁচে আছে। তার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠতে চাইলে সে বহুকষ্টে নিজেকে প্রশমিত করে। আজ থেকে তার বোনের দুঃখের দিন শেষ….
*
“পৃথিবীর অধিশ্বর একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছেন যা তিনি আশা করেন আপনার কাছে। গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।” উজ্জ্বল কমলা রঙের আরো জৌলুসময় একটা আলখাল্লা আজ পারস্যের রাজদূতের পরণে এবং কালো চাপদাড়ি সুন্দর করে সুগন্ধি দিয়ে আচড়ানো। মাথা ধরার কোনো লক্ষণ তার ভেতরে দেখা যায় না। যদিও বাবর খুব ভালো করেই জানে বেচারার মাথা এই মুহূর্তে যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। রাজদূতের আত্ম-সংযম, মুখের আপাত পৃষ্ঠপোষকতাময় অভিব্যক্তি দেখে বাবর বুঝতে পারে প্রস্তাবটা ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে রুটির টুকরোর মতোই গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে।
বাবর চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকে, অপেক্ষা করে। অবশেষে সময় হয়েছে তাকে প্রীত করতে শাহ কেন এতো কষ্ট স্বীকার করেছে সেটা জানবার।
“শাহ ইসমাইল উজবেক হানাদারদের কোমর ভেঙে দিয়েছেন। তার ইচ্ছা ন্যায়সঙ্গত সুলতানরা এবার তাদের সালতানাতে ফিরে যাক, যাতে তার মহান। সাম্রাজ্যের সীমান্ত এলাকায় আরো একবার শান্তি ফিরে আসে। তৈমূরের বংশের জীবিত শেষ শাহজাদা হিসাবে তিনি আপনাকে সমরকন্দের শাসনভার নিতে অনুরোধ করেছেন…”
বাবর টের পায় তার পেটের ভেতর হঠাৎ শক্ত হয়ে উঠেছে। সমরকন্দ তার স্বপ্নের শহর, তৈ নূরের রাজধানী। “আপনার প্রভুর উদারতা অতুলনীয়।” সে সর্তকতার সাথে কথাটা বলে চুপ করে থাকে। তার আব্বাজানের মৃত্যুর পরে সে যদি কিছু শিখে থাকে তবে সেটা হলো ধৈর্য ধারণ করা। নিরবতা ভঙ্গ করার দায়িত্ব অন্যরা পালন করুক…
রাজদূত একটু কেশে উঠে গলা পরিষ্কার করে। বাবর ভাবে, ব্যাটা এইবার আসল। কথাটা বলবে।
“সাইবানি খানকে যদিও পরাস্ত আর হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু সমরকন্দ এখনও তার লোকেরা দখল করে রেখেছে। আমার সুলতান আপনার বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পারস্যের সেনাবাহিনী দিয়ে সহায়তা করতে চান।”
“এবং তারপরে?”
“আমার প্রভু আপনাকে শ্রদ্ধা করেন। তিনি ভালো করেই জানেন আপনার ধমনীতে বিজয়ীর রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন আপনি তার অধীনস্ত একজন সামন্তপ্রভু হিসাবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবেন।”
“অধীনস্ত সামন্ত প্রভু?” বাবর হতবাক হয়ে রাজদূতের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
রাজদূতও বাবরের অভিব্যক্তি পড়তে পেরেছে বোঝা যায়। আপনাকে কোনো রাজস্ব প্রদান করতে হবে না। আর আপনিই সমরকন্দের শাসকের দায়িত্ব পালন করবেন। আমার প্রভু কেবল আশা করেন আপনি তাকে আপনার অধিরাজ বলে মেনে নেবেন।”
“আর সমরকন্দ বিজয় সম্পন্ন হওয়ামাত্র পারস্যের সেনাবাহিনী দেশে ফিরে যাবে?”
“অবশ্যই।”
“এবং এর সাথে আর কোনো শর্ত নেই? “
“না, সুলতান।”
“আমি প্রস্তাবটা বিবেচনা করে দেখবো এবং আপনাকে সময়মতো আমার সিদ্ধান্ত জানাবো।”
রাজদূত আরো একবার মাথা নত করে অভিবাদন জানিয়ে তাঁবু থেকে বের হয়ে যায়। বোঝা গেলো দেড়েলটা কেন নিভৃত কক্ষে তার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছিলো। তার প্রস্তাবটা একেবারেই নজিরবিহীন। তৈমূরের বংশের কোনো সুলতান কোনো দিন পারস্যের অধীনতা স্বীকার করেনি…কিন্তু প্রস্তাবটা একই সাথে শাহ্ আর তার নিজের জন্য সুরক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করবে। শাহের সীমান্ত বাবরের বন্ধুভাবাপন্ন। প্ৰাবর-সালতানাতের এলাকা দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে এবং বাবর তার স্বপ্নের সমরকন্দ ফিরে পাবে। সেখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, বাবর নিজের সেনাবাহিনী প্রস্তুতের সাথে সাথে অনুকূল সময়ের জন্য অপেক্ষা করবে। ভবিষ্যত অভিযানের সুযোগের প্রতিক্ষা করবে, আর সম্ভবত যখন সময় হবে এই অধীনস্ত সামন্তরাজের ভূমিকা জলাঞ্জলি দেবে।
