“আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের যদি অন্য কোনো বংশে জন্ম হত…”
“মোটেই না। তুমি যদি আবার পছন্দ করার সুযোগ দেয়াও হয়, তুমি তাহলেও অন্য কোনো কিছুই পছন্দ করবে না- তুমি নিজের মনে সেটা খুব ভালো করেই জানো…”
খানজাদার মুখটা আবেগে কেঁপে উঠে।
বাবর হাত বাড়িয়ে বোনের গালের সাদা ক্ষতচিহ্নটা স্পর্শ করতে সেটা তার ত্বকের উপরে ফুলে উঠে। “কিভাবে হয়েছিলো? আমাকে কি বলবে…?”
“সে ছিলো একটা অদ্ভুত লোক। প্রচণ্ড খেয়ালী, অনেক সময় খামোখাই নিষ্ঠুর আচরণ করতো…তার আচরণ মোটেই…মার্জিত ছিলো বলা যাবে না, আর আমাকে আমার পক্ষে অপমানজনক কাজ করতে বাধ্য করতো…আমাকে অপদস্ত করতে, সে বলতো, সে চায় আমি যাতে ভুলে যাই যে আমি তৈমূরের বংশের একজন শাহজাদী। কেবল মনে রাখি যে আমি তার খেয়ালখুশির কাছে নতজানু একজন রমণী…আ-আমি তোমাকে সেসব কথা বলতে পারবো না। কিন্তু আমি খুশি যে সব পর্ব শেষ হয়েছে।” তার কণ্ঠস্বর কাঁপতে থাকে। কিন্তু আমি তার হারেমের অনেক মেয়েদের ভিতরে কেবল একজন ছিলাম। আর আমি ভাগ্যবান যে, সে আমাকে তার স্ত্রীদের একজন করেছিলো। আমাদের সবারই নির্দিষ্ট মর্যাদা ছিলো তার সব স্ত্রীই ছিলো সম্ভ্রান্ত বংশের…শোবার ঘরে সে আমাদের সাথে যতো নিষ্ঠুর আচরণ করুক না কেন ভালো পোশাক-পরিচ্ছদ, অলঙ্কার, ভালো খাবার আর পরিচারিকার কোনো অভাব আমাদের ছিলো না। আমরা ছিলাম তার ক্ষমতা আর বিজয়ের স্মারক…অভিযানে যাবার সময়ে সে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতো না বরং নিরাপদ স্থানে আমাদের রেখে যেতো। কেউ যদি আমাদের বন্দি করে অপমানিত করে তাহলে সেও অপমানিত হবে। শাহের লোকেরা সে কারণেই আমাকে হিরাতে খুঁজে পেয়েছিলো…”
“তার উপপত্নির দল…তাদের সংখ্যা কয়েক’শ হবে…তারা এতটা ভাগ্যবান ছিলো না। অভিযানে যাবার সময়ে সে তাদের ভেতর থেকে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে যেতো রাতের বেলা শিবিরে তার সামনে নাচতে আর যুদ্ধে যারা পারদর্শীতা দেখাতো তাদের মনোরঞ্জনের জন্য। কেউ যদি তাকে অসন্তুষ্ট করতো তবে সে সাথে সাথে তাকে হত্যা করতো। একবার এক অভিযানের সময়ে একটা মেয়ে রাতের বেলা নাচতে গিয়ে হোঁচট খেলে সে তাকে সূর্যের নিচে বালিতে বোগল পর্যন্ত পুতে রেখে দিয়েছিলো। পানি পর্যন্ত পান করতে দেয়নি। সবাই বলে দু’দিন পরে তার বাহিনী শিবির গুটিয়ে চলে যাবার সময়েও মেয়েটা বেঁচে ছিলো। ঠোঁট আর গায়ের ত্বক অবশ্য কালো হয়ে খসে খসে পড়ছিলো…সাইবানি খানের কাছে এসব কিছুই না।”
খানজাদার শান্ত, আবেগহীন কণ্ঠস্বর- সেখানে কোন ক্রোধ বা তিক্ততার ছোঁয়া নেই- বাবরকে অভিভূত করে। সে কোথা থেকে নিজের এই বিপর্যয় মেনে নেবার শক্তি পেয়েছে।
“আমি বুঝতে পারছি না…” সে কথা শুরু করে কিন্তু খানজাদা নিজের ঠোঁটের উপরে আঙ্গুল রেখে তাকে চুপ করতে বলে। যেনো বাবর এখনও তার সেই আদরের ছোট ভাইটাই রয়েছে।
“তোমার যেমন কাজ ছিলো ধৈর্য ধারণ করা। আমার দায়িত্ব ছিলো কোনোমতে বেঁচে থাকা। আর আমি ঠিক সেটাই করেছি। আমি নিজের অনুভূতি আর ভাবনা সব লুকিয়ে রাখতাম। আমি কখনও প্রতিবাদ করতাম না। সবসময়ে আদেশ পালন করতাম- এমনকি কখনও কখনও দায়িত্ববান। মাঝে মাঝে তার প্রতি আমার করুণা হতো। তার ভেতরে কোনো সুখ, কোনো সন্তুষ্টি কাজ করতো না। কেবল চারপাশের পৃথিবীর প্রতি একটা অদম্য প্রতিশোধস্পৃহা যা তার সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করেছে বলে সে মনে করতো…”
“কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই আমাদের পরিবারকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে এমন একটা লোকের সান্নিধ্যে সবসময়ে আতঙ্কিত থাকতে?”
“কখনও কখনও, অবশ্যই। তার মর্জিমতো চলা ছিলো এক কথায় অসম্ভব। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার কাছ থেকে নিজের কোনো ক্ষতির শঙ্কা আমার কমে আসে…”
“তাহলে কে, কার কাছ থেকে…?”
খানজাদা চোখ নামিয়ে নিজের মেহেদী রাঙানো মুষ্টিবদ্ধ হাতের দিকে তাকায়। সে যখন বাচ্চা একটা মেয়ে, তখনও সে হাত আর পায়ে মেহেদী দিতে পছন্দ করতো। “অন্য মেয়েদের। সাইবানি খান যদিও ছিলো লাগামহীন নিষ্ঠুর, কিন্তু তারপরেও ঈর্ষা কাজ করতো। সে ছিল সুদর্শন, ক্ষমতাবান। যারা তাকে প্রীত করতে পারতো সে তাদের প্রতি উদার আচরণ করতো। মেয়েরা তার মনোযোগ পাবার জন্য মরিয়া থাকতো…একজন কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে ঈর্ষা করতো…”
“কে?”
“সমরকন্দের গ্রান্ড উজিরের কন্যা আমাদের চাচাতো ভাই মাহমুদের স্ত্রী হবার জন্য যে তরুণীকে তুমি পাঠিয়েছিলে। সাইবানি খান মাহমুদকে হত্যা করার পরে তাকে সমরকন্দ নিয়ে আসে একজন উপপত্নী হিসাবে। সে চেয়েছিল তার স্ত্রী হতে এবং আমি তার স্ত্রী ছিলাম বলে আমাকে হিংসা করতো। কিন্তু সে আমাকে হিংসা করতো কারণ তুমি তার বাবাকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলে। সাইবানি খান আমাকে বন্দি করার ছয় মাস পরে সে আমাকে ছুরিকাহত করতে চেষ্টা করে…সে আমার চোখে আঘাত করতে চেয়েছিলো কিন্তু হেরেমের প্রহরী সময়মতো দেখে ফেলায় তার নিশানা ব্যর্থ হয়। কিন্তু তারপরেও তার খঞ্জরের ফলা আমার মুখে ঠিকই আঁচড় কাটে।” খানজাদা আলতো করে ক্ষতস্থান স্পর্শ করে।
বাবর কল্পনায় ছিপছিপে, ক্রুদ্ধ চোখের এক মেয়েকে নিজের অপদার্থ বাবার প্রাণ রক্ষার জন্য কাকুতি মিনতি করতে দেখে। “তার ভাগ্যে কি ঘটেছিলো?”
