সে লাফিয়ে গাড়িতে উঠে পর্দা টেনে দেয়। পাতলা রেশমের আবরণ চুঁইয়ে প্রবেশ করা আধোআলোতে সে দেখে মেয়েটা তার দিকে সামান্য এগিয়ে এসেছে। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে বাবর হাত বাড়িয়ে নেকাবটা ধরে এক ঝটকায় সেটা সরিয়ে দেয়। খানজাদার বাদামী চোখ তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে…
*
পনের মিনিট পরে বাবর গাড়ির ভেতর থেকে আবার বের হয়ে আসে। গরুর গাড়ির ছইয়ের আড়াল থাকলেও, এতোগুলো উৎসুক দৃষ্টির সামনে এটা সুখ-দুঃখের আলাপ করার সময় না। বাবর অবশ্য জানেও না যে সে সেটা পারবে কিনা- পুরো ব্যাপারটাই এতো সহসা এতো অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটেছে যে সে এখনও পুরোপুরি ধাতস্থ হয়ে উঠতে পারেনি। সে রাজদূতকে নিজের কাছে ডেকে পাঠায়। “আপনার প্রভু আমার একটা বিরাট উপকার করেছেন।” সে আপাত নির্বিকার কণ্ঠে বলে।
“আমরা আপনার বোনের সাথে একজন শাহজাদীর মতোই আচরণ করেছি। দু’জন পরিচারিকা পুরোটা ভ্রমণে তাকে সঙ্গ দিয়েছে এবং আপনি চাইলে তারা তার সাথেই থাকবে।”
বাবর সম্মতি জানায়। “আপনি আমাদের সম্মানিত মেহমান। আমি আমাদের ছাউনির কেন্দ্রে আমার তাঁবুর পাশেই আপনার আর আপনার লোকদের জন্য তাঁবু টাঙাবার আদেশ দিচ্ছি।”
শাহের সৌজন্যের কারণে বাবর সাথে সাথে খানজাদার সাথে একাকী সময় না কাটিয়ে পারসিক মেহমানদের মেজবানিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার বোন আর পারসিক মেহমানদের জন্য বাসস্থানের বন্দোবস্ত হতেই সে দশটা চামড়ার তাবু দিয়ে একটা বড় শিবির তৈরি করে। সেটার মেঝেতে ভেড়ার চামড়া বিছিয়ে দিতে বলে। যেখানে সে অতিথিদের উদ্দেশ্যে ভোজসভার আয়োজন করতে পারবে। রুচিশীল পারসিকদের চোখে তার আয়োজন নিশ্চিতভাবেই দরিদ্র প্রতিবেশীর আয়োজন বলে মনে হবে। কিন্তু পুরু গালিচা, কারুকার্যময় বাসনকোসন আর ভারী পর্দার অভাব সে তাদের অভিযানের সময় দখল করা নধর ভেড়ার মাংস, আর কড়া ওয়াইনের ব্যারেল দিয়ে ভালই পুষিয়ে দেবে।
ভোজসভা আরম্ভ হবার দু’ঘণ্টা পরে বাবর নিজেকে বাহবা দেয়। রাজদূত, ডালিমের মতো লাল গাল আর চকচক করতে থাকা চোখ বলে দেয় বাবাজির হয়ে গেছে। তার কালো দাড়ির আড়াল থেকে বিড়বিড় করে অনর্গল দ্বিপদী শের বলে চলেছে। শীঘ্রই তার মাথা ঝুঁকে আসতে থাকে, কালো চোখ বন্ধ হয়ে যায় এবং একটা সময়ে সে যে গালিচার উপরে বসে ছিলো সেখানেই গড়িয়ে পড়ে।
পুরো শিবিরে অনেক রাত অব্দি উৎসবের আমেজ বিরাজ করবে। সবার কাছেই উজবেকদের পরাজয় আর তাদের নেতা সাইবানি খানের মৃত্যু একটা স্বস্তির বাতাস বয়ে এনেছে। উজবেকদের প্রতি সাধারণ বিদ্বেষ অনেক বিরূপভাবাপন্ন গোত্রকে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য করেছিলো। কিন্তু বাবর অবশেষে একটা বিষাক্ত শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়েছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাবর তার পেছনে সমবেত হওয়া রক্ষীদলকে হাতের ইশারায় নিরস্ত করে। সে মত্ত মাতাল লোকদের এড়িয়ে আর তাদের সাথে আগুনের পাশে যোগ দেবার উদাত্ত আহবানে কান না দিয়ে শিবিরের মাঝ দিয়ে দৌড়ে যায়।
তার অস্থায়ী শিবিরের একটা নির্জন স্থানে খানজাদার জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ভেতরে প্রবেশ করে সে তাকে একাকী একটা নিচু টেবিলের সামনে আসনসিঁড়ি হয়ে বসে প্রদীপের আলোয় নিমগ্ন চিত্তে কিছু একটা লিখতে দেখে। তাকে ভেতরে দেখামাত্র লেখা ছেড়ে সে উঠে দাঁড়ায়। প্রদীপের কাঁপতে থাকা আলোয় নয় বছর আগের সেই তরুণীর মতোই তাকে মনে হয়। কিন্তু কাছে এগিয়ে আসতে সে তার মুখে বলিরেখার চিহ্ন দেখতে পায়, যার কথা সে স্মরণ করতে পারে না। আর তার ঠোঁটের ডান পাশ থেকে ডান কানের লতি পর্যন্ত উঠে যাওয়া সাদা ক্ষতচিহ্নটাও সে আগে খেয়াল করেনি।
“আমি আমাদের আম্মিজানের কাছে একটা চিঠি লিখছিলাম…এতগুলো বছরে এই প্রথম আমি তার কাছে চিঠি লিখতে পারছি। এসো আমার পাশে এসে বসো…”
“খানজাদা…” সে কতটা অনুতপ্ত বলার জন্য তার বুকটা ফেটে যেতে চায়। এতোগুলো বছর সে যখন অসহায় বন্দির জীবনযাপন করেছে তখনকার তিক্ত অনুভূতির কথা, নিজের অক্ষমতার কারণে অনুভূত অপরাধবোধের কথা সে বলতে চায়…কিন্তু এখন শেষ পর্যন্ত যখন সুযোগ পেয়েছে মনের ভার লাঘব করার, তখন সে কিছুই বলতে পারে না। খানজাদা হাত বাড়িয়ে তার মুখে আলতো করে বুলিয়ে। দিতে সে নিজেকে যেনো ফিরে পায়। “আমি তোমার যথাযোগ্য যত্ন নিতে পারিনি। আমি অপ্রাপ্তবয়স্ক আর উদ্ধত ছিলাম…নিজের মাথা খাটানো আমার উচিত ছিল…আমি তোমার কাছে অপরাধী যে বর্বরটার হাতে আমি তোমাকে তুলে। দিয়েছিলোম…”
“তোমার কিছুই করার ছিলো না। সেটাই ছিলো একমাত্র পথ নতুবা সেখানে সমরকন্দের দেয়ালের সামনে সে আমাদের সবাইকে হত্যা করতো। আমার সবচেয়ে বড় ভয় ছিলো যে, তুমি হয়তো তাই করবে আবেগের বশবর্তী হয়ে, শোচনীয় কিছু একটা করে বসবে…”
“আমার সেটাই করা উচিত ছিলো। তাহলে অন্তত আমি নিজের সম্মান রক্ষা করতে পারতাম।”
“না- তোমার দায়িত্ব ছিল বিচক্ষণতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করা…অপেক্ষা করা…”
“তুমি ঠিক আমাদের নানীজানের মতো কথা বলছো।”
খানজাদার চোখ অশ্রুতে টলটল করতে থাকে। খানজাদা বাবরকে প্রথম সুযোগেই। তাদের আম্মিজান আর নানীজানের কথা জিজ্ঞেস করেছিলো এবং বাবরকে বলতে হয়েছে যে তাদের নানীজান আর ইহজগতে নেই। “আমার কথা যদি তার মতো শোনায়, তবে আমি নিজেকে সম্মানিত মনে করবো। এই পৃথিবীটার রীতিনীতি তিনি ভালোই বুঝতেন- আমরা যেমনটা পছন্দ করি ঠিক সেভাবে না এবং তিনিই শিখিয়েছেন সবাই আমাদের কাছে কেমন আচরণ প্রত্যাশা করে।”
