“হ্যাঁ, সুলতান। সাইবানি খানের খুলিই এটা। সিদ্ধ করে মাংস ছাড়িয়ে নিয়ে পানপাত্রে রূপান্তরিত করা হয়েছে। খুলির চামড়াটাও নষ্ট করা হয়নি। আমার প্রভু সেটার ভিতরে খড় ভরে সেটা তার মিত্র অটোমান তুরস্কের সুলতান বায়েজিদকে শুভেচ্ছা স্বরূপ পাঠিয়েছেন।”
বাবরের নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তার চরম শত্রু মারা গেছে এবং সে তার খুলি নিজের দু’হাতের মুঠোয় ধরে রয়েছে। বাবর আবার চোখ নামিয়ে পাত্রটার দিকে তাকায়। কিন্তু এইবার তার উল্লাস কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে। সে নিজ হাতে সাইবানি খানকে হত্যা করতে চেয়েছিলো। একেবারে কাছে থেকে কখনও দেখেনি যে চোখ, সেই শীতল চোখে ভয়ের রেশ জাগিয়ে তুলে হাতের খঞ্জর বা তরবারি তার উদরে আমূল বিদ্ধ করতে করতে খানজাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলো। তার বদলে, অনেক শক্তিশালী, অনেক ধনবান এক শাসক সমস্যাটার সমাধান করেছেন…।
“আমি ইসমাইল খানের কাছে উপহারটার জন্য…কৃতজ্ঞ।”
“আমার প্রভু আপনার জন্য আরো কিছু উপহার পাঠিয়েছেন। বাইরে সেগুলো রাখা আছে। আপনি যদি আমাকে অনুগ্রহ করে অনুমতি দেন আমি তাহলে আপনাকে দেখাতে পারি।”
“চমৎকার, অনুমতি দিলাম।”
বাবরের দেহরক্ষী বাহিনী অস্ত্র প্রস্তুত রাখো, যদি পারসিক দূতের অন্য কোনো মতলব থাকে সেটা সামলাতে সতর্ক। দুপাশে সরে গিয়ে তাদের তাঁবুর বাইরে বের হয়ে আসবার পথ করে দেয়। তাঁবু থেকে তারা বের হয়ে আসলে, পারসিক দূতের আগমন সম্বন্ধে তখনও যারা জানে না-তাদের হাই তুলে, আড়মোড়া ভেঙে প্রাত্যহিক ক্রিয়াকর্ম সারতে দেখা যায়। অস্থায়ী ছাউনির কয়েকশ গজ দূরে, ওক গাছের একটা জটলার মাঝে পারসিক রাজদূতের বাকি লোকেরা অপেক্ষা করছে চমৎকার পোশাক আর অস্ত্রে সজ্জিত সবাই। তাদের পা বাঁধা ঘোড়ার পাল হয় ঘাস খাচ্ছে, বা কাছের স্রোতস্বিনী থেকে পানি পান করছে। অবশ্য, একটা ঘোড়া চকচকে কালো রঙের শক্তিশালী উঁচু একটা স্ট্যালিয়ন- দুই সহিসের মাঝে দাঁড়িয়ে অস্থির ভঙ্গিতে ছটফট করছে, বেচারারা বহু কষ্টে নাক ফুলিয়ে মাথা নাড়তে থাকা আজদাহাটা সামলে রেখেছে। বাবর এতো সুন্দর ঘোড়া আগে কখনও দেখেনি। “সোহরাব, আমার প্রভুর অশ্বশালার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট প্রজনন-স্ট্যালিয়ন, আপনাকে আর কাবুলের প্রজনন-ঘুড়ির জন্য তার একটা উপহার।”
“শাহকে তার উদারতার জন্য আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাবেন।” বাবর বিভ্রান্ত বোধ করে। সাইবানি খানের করোটি পাঠাবার কারণ সে না হয় বুঝতে পারে। কিন্তু শাহ এতো কষ্ট করে তাকে কেন এসব পাঠালেন? তিনি তার কাছে কি চান? পারস্য কেবল পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধশালী সাম্রাজ্যই না, সেখানকার সংস্কৃতির ধারা, কবি আর শিল্পীদের প্রয়াস সবাই কদর করে। সমরকন্দ বা ফারগানা এর সীমান্ত থেকে এতোটাই দূরে অবস্থিত ছিল যে, এর শাসকদের ভিতরে কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সম্ভব ছিলো না। কিন্তু বাবর এখন কাবুলে আর দুটো স্থান পরস্পরের প্রায় প্রতিবেশী। শাহ্ ইসমাইল একজন শক্তিশালী নতুন নৃপতি। যিনি কয়েক বছর আগে পূর্ববর্তী সাম্রাজ্যের উৎখাত করে নিজের সাম্রাজ্য স্থাপন। করেছেন। একজন ধার্মিক মুসলিম, তিনি তার প্রজাদের উপরে শিয়া ধর্মমত জোর করে চাপিয়ে দিয়েছেন। শিয়াদের কেউ কেউ খারেজী বলে থাকে। কারণ শিয়ারা বিশ্বাস করে বেশিরভাগ মুসলমান এমনকি বাবর নিজেও যারা সুন্নী মতাবলম্বী, যার ঘোর বিরোধী যে হয়রত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী তার চাচাতো ভাই আর জামাতা হয়রত আলী (রাঃ)…কিন্তু এসব উপহারের সাথে শাহ্’র উদ্দেশ্যের প্রাসঙ্গিকতা সে বুঝতে পারে না… বাবর নিজেকে কল্পনার মোহাবিষ্টতা থেকে বের করে আনে।
রাজদূত প্রায় রঙ্গময় একটা ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এবং এটাও আমার প্রভুর তরফ থেকে একটা উপহার।” বাবর সোহরাবের পেছনে একটা বিশাল গরুর গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখতে পায়। ছয়টা দুধসাদা ষাড়ের একটা দল গাড়িটা টেনে এনেছে। গাড়িটার চারপাশে উজ্জ্বল হলুদ রঙের পর্দা দেয়া রয়েছে, যার উজ্জ্বলতা ফারগানার কথা মনে করিয়ে দেয়। ফারগানা…
বাবর মন্থর পায়ে গরুর গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। সহসা অজানা আশঙ্কায় তার শ্বাসপ্রশ্বাসের বেগ খাপছাড়া হয়ে উঠেছে। বাতাস শীতল তবুও সে টের পায় কুলকুল করে ঘামছে। সে জানে গাড়িতে কে আছে- বা আশা করে তার ধারণাই সত্যি- কিন্তু তার সাতাশ বছরের জীবনে সে কখনও এমন আতঙ্কিত বোধ করেনি। গাড়িটার ভক্তিভরে নতজানু হয়ে থাকা চালকদের কাছে পৌঁছে বাবর থমকে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে সে পর্দার বাঁধন খোলার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। তারপরে সে আবার থমকে গিয়ে ঘুরে তাকিয়ে তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের দিকে তাকায় তার নিজের লোকেরা, পারস্যের দূতের লোকেরা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে।
“পেছনে সরে যাও সবাই।” সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আদেশ দেয়। সবাই বেশ কয়েক পা পেছনে সরে না যাওয়া পর্যন্ত সে অপেক্ষা করে। তারপরে পর্দার বাঁধন সরিয়ে সে ভেতরে উঁকি দেয়। ছইয়ের একেবারে শেষ প্রান্তে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে একটা ভারী কালো ঘোমটার আড়ালে এক রমণী বসে আছে। সূর্যের আলো এসে তার উপরে পড়তে নেকাবের আড়ালে থাকা রমণী যেনো কেঁপে উঠে। “খানজাদা…?” বাবর অস্ফুট কন্ঠে কোনোমতে বলে।
