“কিসের এতো আওয়াজ…” সে তাঁবুর বাইরে প্রহরারত এক নিরাপত্তা রক্ষীকে ব্যাপারটা দেখতে আদেশ দেয়। সম্ভবত কিছুই না- ভেড়া বা ছাগলের মালিকানা নিয়ে মামূলি ঝগড়া। গতকালই সে পাঁচজন উপজাতীয় লোককে- দু’জন ঘিলজাইস, বাকী তিনজন পাসাইস- চাবকাতে আদেশ দিয়েছে। কিন্তু আজকেরটা অন্যকিছু। তাঁবুর সারির ভিতর দিয়ে প্রায় দৌড়ে ফিরে আসা প্রহরীর বিস্মিত অভিব্যক্তি দেখে বাবর বুঝতে পারে।
“সুলতান, বিশাল বহর নিয়ে…এক দূত এসেছে।”
“কোথা থেকে?”
“সুলতান, পারস্য, স্বয়ং শাহের তরফ থেকে…”
“তাকে আমার তাঁবুতে নিয়ে এসো।”
দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করে বাবর পোশাক পরে নেয়। কারুকাজ করা কাঠের পাদানির উপরে রাখা একটা ছোট চামড়া দিয়ে মোড়ানো সিন্দুক খুলে ভেতর থেকে একটা পাথরখচিত মালা গলায় দেয়। আর তৈমূরের সোনার ভারী আংটিটা আঙ্গুলে পরে। তার গালে কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি কিন্তু এখন আর সেটার কিছু করা সম্ভব না। যাকগে, সে অভিযানে বের হওয়া এক যোদ্ধা- সে যে অবস্থায় আছে। পারস্যের দূতকে তাকে সেই অবস্থায় মেনে নিতে হবে…
পাঁচ মিনিট পরে, বাবরের দেহরক্ষীর দল রাজদূত আর তার চারজন পরিচারককে পথ দেখিয়ে তাঁবুর ভেতরে নিয়ে আসে। বাবর মুখ তুলে তাকিয়ে মাখন রঙের আলখাল্লা পরিহিত বছর চল্লিশেক বয়সের কালো চাপদাড়ির একজন লোককে দেখে। মাথায় উঁচু করে বাঁধা বেগুনী মখমলের পাগড়িতে সারসের সাদা একটা পালক নীলকান্তমণির কবচ দিয়ে আটকানো থাকায় তাকে স্বাভাবিকের চেয়ে আরো লম্বা মনে হয়। তার চার পরিচারকের পরণে লালচে বেগুনী রঙের জোব্বা এবং তাদের প্রভুর মতো মাথায় উঁচু পাগড়ি। একজন সোনার দড়ি দিয়ে বাঁধা বেগুনী মখমলের একটা বড় থলে ধরে রয়েছে।
রাজদূত সাবলীল ভঙ্গিতে মাথা নত করে সম্ভাষণ জানায়। “আমি পৃথিবীর অধিশ্বর, পারস্যের মহান শাহ্ ইসমাইলের শুভেচ্ছা বাণী আপনার কাছে নিয়ে এসেছি। তিনি আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন।”
বাবর তার মাথা সামান্য কাত করে। “আমি কৃতজ্ঞ এবং আল্লাহতালা যেনো তাকেও দীর্ঘায়ু দান করেন।”
“সুলতান, আপনাকে খুঁজে বের করতেই আমাদের অনেক দেরি হয়েছে।”
বাবর অপেক্ষা করে। পশ্চিমে এতো দূরে থেকে শাহ তার কাছে কি চায়?
“আমার প্রভু আপনার কাবুল ত্যাগ করে অভিযানে প্রবৃত্ত হবার কারণ জানেন। উজবেক বর্বরগুলো তার সাম্রাজ্যের পূর্বদিকের সীমান্ত আক্রমণ করার স্পর্ধা। দেখিয়ে তাকেও ক্রুদ্ধ করে তুলেছে। সাইবানি খান ঔদ্ধত্যপনার চরমে পৌঁছে ছয় সপ্তাহ আগে হিরাত থেকে বের হয়ে এসে আমার প্রভুর ব্যবহারের জন্য আগত মালামালের একটা কাফেলাকে ইয়াজদ শহরের কাছে আক্রমণ করে। শাহ্ ইসমাইল তার মালপত্র ফেরত চাইলে, ক্রমাগত বিজয়ে উন্মাদ উজবেক নেতা তাকে একটা লাঠি আর ভিক্ষাপাত্র পাঠিয়ে দেয়। ভাবটা এমন যেনো আমাদের শাহ একজন ভিক্ষুক। শাহ ইসমাইল প্রত্যুত্তরে কিছু তুলা আর একটা চরকার সাথে একটা বার্তা পাঠান, যার বক্তব্য ছিল সাইবানি খান একজন ভেড়া-চোর। আর তার চেয়ে শ্রেষ্ঠদের অপমান না করে তার উচিত চরকা দিয়ে সূতা কাটা। কিন্তু উজবেকদের অজান্তে, আমার প্রভু এই বার্তা পাঠাবার সাথে সাথেই একদল সৈন্য পাঠান তাকে আরো একটা বার্তা পৌঁছে দেবার জন্য: মুখে ফেনা উঠা অবস্থায় বুনো কুকুর যখন উন্মাদ অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়, তখন সেটার একটাই সমাধান আছে। কুকুরটাকে তখন মেরে ফেলতে হয়। আমার প্রভু, কার্যত যার সৈন্য সংখ্যা অগণিত, বুনো কুকুরটার বিহিত করেছেন আর তিনি সেটা আপনাকে জানাতে চান।”
“সাইবানি খান মৃত?”
“হ্যাঁ, সুলতান। হিরাত ফিরে আসবার সময়ে তার মূল বাহিনীকে পারস্যের সতের হাজার অশ্বারোহী আক্রমণ করে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।”
বাবরের মনে চিন্তার ঝড় বয়ে যায়। কথাটা যদি সত্যি হয়…সে দূতের মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। যার কালো বড় বড় চোখ তাকে আয়েশার গোত্র, মাঙ্গলিঘদের কথা মনে করিয়ে দেয়।
‘সুলতান।” লোকটা মাথা নত করে, কিন্তু বোঝা যায় আরও গুরুত্ত্বপূর্ণ কিছু সে বলতে চায়। আমার প্রভু এই উপহারটা আপনাকে পৌঁছে দিতে বলেছেন।” সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচারকের হাত থেকে বেগুনী মখমলের থলেটা নিয়ে সেটার ভেতর থেকে সোনা দিয়ে মোড়ানো একটা ডিম্বাকৃতি বস্তু বের করে আনে। “আমার প্রভু যতোটা নিখুঁতভাবে এটাকে কারুকার্যখচিত করতে চেয়েছিলেন সময়াভাবে সেটা করতে পারেননি। কিন্তু আপনার কাছে আশা করি উপহারটা গ্রহণযোগ্য বলে। মনে হবে।” সে দু’হাতে যত্ন করে ধরে জিনিসটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে।
বাবর আগ্রহের সাথে সেটা পরখ করে। জিনিসটাকে দেখতে একটা বিশাল, গোলাকার পানপাত্রের মতো মনে হয়। মসৃণ, চকচকে বাইরের দিকটা দেখে মনে হয় যেন গলিত সোনায় সেটা ডোবানো হয়েছিলো এবং নিচের দিকে চারটা ছোট ছোট সোনার পায়া রয়েছে যার উপরে পাত্রটা অবস্থান করতে পারে। পাত্রের ভেতরটা ম্লান ধূসর বর্ণের এবং বাবর ভেতরটা আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করে- শক্ত। সম্ভবত শিং দিয়ে প্রস্তুত। না, শিংএর উষ্ণতা আর পেলবতা নেই পাত্রটার। হাড়ের তৈরি…বাবর আবার খেয়াল করে এর আকৃতি আর আকার দেখে…মানুষের খুলির মত বড়…
