কিন্তু বাবর তাকে শেষ করে দেবার অভিপ্রায়ে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতে নদীর তীরের আঠাল কাদায় তার পা পিছলে যায় এবং মাটিতে আছাড় খেলে হাত থেকে খঞ্জরটা ছিটকে যায়। আর আলমগীর তার দেহের নিচে চাপা পড়ে। আহত উজবেক নিজের টিকে থাকার সুযোগ ঠিকই চিনতে পারে। নিজেকে টেনে তুলে সে তার তরবারি খুঁজে নিয়ে সামনে এগিয়ে আসে আক্রমণ করতে। বাবর নিজেকে রক্ষা করতে বাম হাত উঁচু করে এবং সাথে সাথে তীব্র একটা যন্ত্রণা তাকে আচ্ছন্ন করে। নিচের দিকে তাকালে সে তার কলাচীর নিচের অংশে একটা গভীর ক্ষত দেখতে পায় এবং রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকার কারণে বাম হাত বেগুনী দেখায় আর দপদপ করতে থাকে।
সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে এবং সেটা করতে গিয়ে সে উজবেক যোদ্ধার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চেষ্টা করলে। নিজের ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাতের ফলে দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে উজবেকটা মন্থর ভঙ্গিতে প্রতিক্রিয়া দেখায়। দেখে মনে হয় হাঁটু পর্যন্ত পানিতে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আলমগীর মুক্ত করে, বাবর এবার তরবারিটা গায়ের সব শক্তি দিয়ে উজবেকটার কণ্ঠনালী লক্ষ্য। করে চালায় এবং সেটা তার গলার পিছন দিয়ে বের হয়ে আসে। লোকটার ছিন্ন। হওয়া ধমনী থেকে ফিনকি দিয়ে বের হয়ে আসা রক্ত বাবরের গায়ে ছিটকে এসে তার নিজের রক্তের সাথে মিশে যায়।
বাবর এবার সুযোগ পেয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখে, লড়াই শেষ হয়ে গেছে। উজবেক হানাদার দলটার লোকেরা হয় মৃত বা পালিয়ে গেছে। রক্তপাত হ্রাস করার জন্য বাবর আহত বামহাত মাথার উপরে তুলে ধরে এবং ডান হাতে গলায় জড়ানো একটা সুতির কাপড় খুলে নিয়ে সেটা বাবুরীর হাতে দেয়। তারপরে সে বামহাতটা নিচে নামায় যা ইতিমধ্যে আড়ষ্ট হয়ে উঠতে আরম্ভ করেছে। সে হাতটা তার দিকে এগিয়ে দেয়। “শক্ত করে বাঁধো…আজ আবার আমাদের যুদ্ধ করতে হতে পারে…” তার উল্লাস ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে কিন্তু কেনো। খুব সম্ভবত এজন্য যে সাইবানি খানের কাছে তিনশ লোকের মৃত্যু রাতের বেলা মশার কামড়ের মতো নগণ্য একটা ব্যাপার…পুরো ব্যাপারটা নিষ্পত্তি হবার আগে বাবরকে এখনও অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে…
৩.৪ অনন্য ভৃঙ্গার
১৮. অনন্য ভৃঙ্গার
শুকনো লতাপাতা আর গোবরের আগুন থেকে উদ্ভূত ঝাঁঝালো ধোঁয়া, শিকে বেঁধানো নধর ভেড়ার মাংসের খুশবু, আর গরম পাথরে সেঁকা রুটির পরিচিত গন্ধে বাবর শ্বাস নেয়। সন্ধ্যে শেষে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে, তার চারপাশে, সপ্তাহভর খণ্ডযুদ্ধের শেষে বিশ্রামের অবকাশ পেয়ে পরস্পরের সাথে গালগল্পে মেতে উঠে। রান্নার আয়োজন করে আর নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র পরিষ্কার করে তেল দেয়। তার সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ষোল হাজার হয়েছে ভাবতেই তার মনটা ভালো হয়ে যায়। প্রতিদিনই উজবেকদের দ্বারা বিতাড়িত লোকজন আরও বেশি সংখ্যায় তার বাহিনীতে এসে যোগ দিচ্ছে।
হিরাতের পূর্বদিকে বারো দিনের দূরত্বে, ঘারজিস্তানের পর্বতমালার গহীনে এই তৃণভূমিতে আর বেশিদিন তারা অবস্থান করতে পারবে না। বাবরের গুপ্তদূতদের নিয়ে আসা সংবাদ অনুসারে, সাইবানি খান কয়েক সপ্তাহ আগেই শহর ত্যাগ করেছে। শহর ত্যাগের সঠিক সময় আর বিবরণ যদিও অস্পষ্ট কিন্তু একটা বিষয়ে। সবাই নিশ্চিত যে, কিপচাক তোরণের নীচ দিয়ে একটা বিশাল বাহিনী নিয়ে সে উত্তর-পশ্চিম দিকে রওয়ানা দিয়েছে। হতে পারে পুরোটাই প্রায় অরক্ষিত হিরাত আক্রমণে বাবরকে প্ররোচিত করার একটা টোপ? বা সাইবানি খান উত্তর-পূর্ব দিক থেকে ধেয়ে এসে বাবরকে পাশ থেকে ঘিরে ফেলতে চায়? উজবেক সেনাপতির এতোদিনে জেনে যাওয়া উচিত কাবুল থেকে পশ্চিমে অগ্রসরমান একটা বিশাল বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছে বাবর। তার এটাও জানা উচিত বাবরের বাহিনীকে আচমকা আক্রমণ করে সে সহজে তাকে পরাস্ত করতে পারবে। বা সম্ভবত সে বাবরকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। সম্ভবত সে এখন তার উজবেক বর্বরদের পাহাড়ের ভিতর দিয়ে নেতৃত্ব দিয়ে উত্তর দিকে বাবরের রাজধানী কাবুলের দিকে নিয়ে চলেছে।
বাবর তার তাঁবুর বাইরে ধাতব ঝুড়িতে রাখা জ্বলন্ত কয়লার দিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে সুনির্দিষ্ট সংবাদের অভাব কেমন অশুভ একটা অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে…ব্যাপারটা এমন, যেনো সাইবানি খান বেমালুম গায়েব হয়ে গিয়েছে… সে আগুনের উষ্ণতার উপরে হাত টানটান করে। বাম কব্জি নাড়াতে এখনও কষ্ট হয় দেখে সেদিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তার কনুইয়ের কাছের ক্ষতস্থান দ্রুত আর সুন্দরভাবে সেরে উঠছে- পুরোটাই তার হেকিমের কৃতিত্ব- ক্ষতটা গম্ভীর হবার কারণে এর চারপাশের মাংসপেশী এখনও আড়ষ্ট হয়ে আছে। কব্জি সঞ্চালনে নমনীয়তা হ্রাস পাওয়ায় সে ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠে; এই হাতে সে খঞ্জর ধরে এবং তার কাছে সেটা খুবই গুরুত্ববহ।
সেই রাতে সাইবানি খান বাবরের স্বপ্নে হানা দিলে সে সারা রাত প্রায় নিদ্রাহীন কাটায়। পরদিন খুব ভোরে দিনের আলো বাবরের রাজকীয় তাঁবুর চামড়ার অভ্যন্তরভাগ মৃদু আলোকিত করে তুললে তখনও সে অস্থিরভাবে বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে। এমন সময় অস্থায়ী ছাউনির সীমারেখার কাছ থেকে ভেসে আসা উত্তেজিত কণ্ঠের চিৎকার আর হট্টগোলের শব্দে সে সজাগ হয়ে উঠে। গায়ের উপর থেকে এক ঝটকায় কম্বল সরিয়ে ফেলে সে লাফিয়ে দাঁড়ায় এবং তাঁবুর পর্দা সরিয়ে বের হয়ে আসে।
