উইলোর বনের ভিতর দিয়ে তীব্র বেগে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যাবার সময় চাবুকের মতো উইলোর ডাল তার মুখে আছড়ে পড়তে থাকে এবং ঠোঁট কেটে গেলে সে মুখে রক্তের স্বাদ পায়। নদীর প্রশস্ত তীরে পৌঁছে, সে উজবেক অশ্বারোহীদের বাকের ওপাশে হারিয়ে যেতে দেখে এবং অভিশাপ দেয়। সে লাগাম ছেড়ে দিয়ে কাঁধ থেকে ধনুক নামিয়ে তূণ থেকে একটা তীর তুলে নেয়। রেকাবে অর্ধেক দাঁড়ানো অবস্থায় এবং দুই হাঁটু দিয়ে ঘোড়াটাকে স্থির রেখে সে ধনুকের ছিলায় তীর পরায় এবং গুণটা কান পর্যন্ত টেনে আনে। তীরটা সোজা আর দ্রুত ছুটে গিয়ে এক উজবেক ঘোড়ার পশ্চাদদেশে আমূল বিদ্ধ হয়। বাবর ঘোড়াটাকে চিহি সুরে আর্তনাদ করতে শোনে এবং পিঠের আরোহীসমেত পিছলে নদীতে আছড়ে পড়তে দেখে। বাবুরীও তীর ছুঁড়ে কিন্তু বাকি দুই উজবেক হাওয়ার মতো বেমালুম গায়েব হয়ে যায়।
বাবর আর তাকে ঘিরে থাকা অশ্বারোহী যোদ্ধারা বল্পিত বেগে তীক্ষ্ণ বাঁকটা পার হয়, মাথার চুল বাতাসে উড়তে থাকে এবং তার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠে। বেঁচে যাওয়া দুই উজবেক অশ্বারোহী চিৎকার করে আশপাশ মাথায় তুলে এবং পাগলের মতো হাতপা নাড়তে থাকে কিন্তু উজবেক সহযোদ্ধারা তাদের মরিয়া ভাব খেয়াল করে না। একটা ছোট দল, তখনও দূরবর্তী পাড়ে অবস্থান করছিলো প্রথম কিছু একটা গড়বড় হয়েছে টের পায় এবং নিজেদের অস্ত্রের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে কিন্তু সেসব তখন অধিকাংশই পানিতে। বাকীরা নিজেদের ঘোড়া নিয়ে দ্রুত বহমান স্রোতস্বিনী অতিক্রম করে অন্যপাশে পৌঁছাতে চায়।
পানিতে ভিজে চুপচুপে অবস্থায় কয়েকজন মাত্র এপারে এসে পৌঁছেছে। ঘোড়ায় উপবিষ্ট অবস্থায় বাবর আর তার লোকেরা এক পশলা তীর নিক্ষেপ করলে অনেকে মুথ থুবড়ে পড়ে। বাবর তারপরে তার লোকদের ঘোড়া থেকে নেমে গাছ আর পাথরের আড়াল ব্যবহার করে তীর নিক্ষেপ করা অব্যাহত রাখতে বলে। নদীর অন্য পাড়ে অবস্থানরত অনেক উজবেকও তীরের আঘাতে ভূমিশয্যা নেয় এবং রক্তে লাল হয়ে উঠা নদীর পানিতে মৃত আর মৃতপ্রায় লোক আর তাদের বাহন একটা অনড় স্তূপের জন্ম দেয়, যা নদীর স্রোতও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়।
“সুলতান।” আর্তনাদ আর গোঙানির আওয়াজ ছাপিয়ে বাবুরীর কণ্ঠস্বর পরিষ্কার শোনা যায়।
বাবর চারপাশে তাকালে একেবারে ঠিক সময়মতো দেখে যে সেই দুই অশ্বারোহী উজবেক গুপ্তদূতদের একজন, যাদের কথা সে ভুলে গিয়েছিলো তার দিকে ধেয়ে আসছে। লোকটার হাতে চকচকে কিছু একটা চমকায়-একটা রণকুঠার। লোকটা হাত পেছনে দিয়ে কুঠারটা এমন জোরে ছুঁড়ে মারে যে বাবর যেনো বাতাস কেটে সেটার ছুটে আসবার শব্দ শুনতে পায়। বাবর একপাশে কাত হলে তার ডান কান ছুঁয়ে কুঠারটা প্রচণ্ড বেগে পেছনের কাদামাটিতে গিয়ে আছড়ে পড়ে।
সে মেজাজ খারাপ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে কুঠারটা মাটি থেকে টেনে তুলে এবং ওজন পরখ করে দেখে-বেশ ভালোই ভারসাম্য রয়েছে। উজবেক যোদ্ধাটা এখন আর মাত্র কয়েক গজ দূরে। ইস্পাতের চূড়াকৃতি শিরোস্ত্রাণের নিচে কঠোর অভিব্যক্তি, আর হাতে বাঁকানো তরবারি নিয়ে সে জিনের উপরে ঝুঁকে রয়েছে। বাবুরী এবার সামনের দিকে ধেয়ে আসে।
“না আমার জন্য ছেড়ে দাও।” সে চিৎকার করে উঠে। হাতের ধনুক ফেলে দিয়ে, সে ডান হাতে কুঠারটা নিয়ে দাঁড়িয়ে মোক্ষম সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। তার থেকে যখন মাত্র কয়েক পা দূরে লোকটা, বাবর কুঠারটা তখন ছুঁড়ে মারে। ফলাটা বিদ্ধ না হয়ে কুঠারের হাতলটা গিয়ে তার মুখে আঘাত করে নাকটা থেতলে দেয়। কিন্তু সে তারপরেও কোনোমতে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকে। উজবেক যোদ্ধা তার দিকে ধেয়ে আসতে বাবর তার ঘোড়ার উষ্ণ নিঃশ্বাস টের পায়। সে এবার সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে উজবেকটার বাম পা হাঁটুর কাছে আঁকড়ে ধরে। তার বর্মের ধাতব শৃঙ্খলে বাবরের আঙ্গুল কেটে যায়। কিন্তু তাতে শাপেবর হয় সে আরও জোরে আঁকড়ে ধরে গায়ের সব শক্তি দিয়ে নিজের দিকে টানে। উজবেকটার নাক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছে, উড়ে গিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। কিন্তু কোনোমতে নিজের আগুয়ান ঘোড়ার ক্ষুরের নাগাল থেকে গড়িয়ে সরে যায়।
পায়ের গোড়ালির উপরে মল্লযোদ্ধার মতো দাঁড়িয়ে বাবর আর লোকটা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। আঁচ করতে চেষ্টা করে প্রতিপক্ষের মতিগতি। রক্ত রঞ্জিত উজবেক যোদ্ধা কোনো ব্যথা অনুভব করলেও তার অভিব্যক্তিতে সেটা প্রকাশ পায় না। প্রতিপক্ষকে সে বরং চোখ কুঁচকে মাপতে চেষ্টা করে। বাবরকে তার পরণের পোশাক দেখে সুলতান বলে চেনার কোনো উপায় নেই- উজবেকটা তাকে কেবল। আরেকজন যোদ্ধা বলে ভেবে নিয়েছে।
বাম হাতে খঞ্জর আর ডান হাতে আলমগীর নিয়ে প্যাঁচ খেলার ভঙ্গিতে সামনে এগোবার ভান করে। তারপরে উজবেকটা ফাঁদে পা দিলে লঘু পায়ে লাফিয়ে আবার পেছনে সরে আসে। প্রতিপক্ষের চারপাশে বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে বাবর দ্বিতীয়, তারপরে তৃতীয়বার একই চালাকি করে। উজবেকটা প্রতিবারই প্ররোচিত হয়ে তরবারি চালায় কিন্তু বাবর প্রতিবারই তাকে উত্যক্ত করে সরে আসে। দেহের প্রতিটা পেশী সতর্ক উত্তেজিত অবস্থায়, বাবর চতুর্থবারের মতো সামনে এগিয়ে যাবার ভান করে। উজবেকটা এবার ইতস্তত করে ভাবে এবারও বাবর পিছিয়ে যাবে- যে সে আসলে আক্রমণ করবে না। কিন্তু এবার পিছিয়ে যাবার পরিবর্তে, বাবর লোকটার অরক্ষিত গলা লক্ষ্য করে তরবারি চালিয়ে ডান পায়ে তার দুই উরুর সংযোগস্থলে বেমক্কা একটা লাথি বসিয়ে দেয়। উজবেকটা দুহাতে উরুর মধ্যবর্তী অংশ আঁকড়ে ধরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। গলা দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে।
