বাবুরী আর বাইসানগারের দিকে তাকিয়ে বাবর ক্রুর একটা হাসি হাসে। অবশেষে, প্রায় দু’সপ্তাহ পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত ঘন বনের আড়ালে পশ্চিম দিকে এগিয়ে যাবার পরে তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পেয়েছে। উজবেক দলটা নদী পার হবার কাজে ব্যস্ত থাকবে, ঢাল পিঠে বাঁধা থাকবে আর তীর ধনুক পানির হাত থেকে বাঁচাতে চামড়া দিয়ে মোড়ানো থাকবে। আর তাদের অন্য অস্ত্রগুলো তরবারি, খঞ্জর আর রণকুঠার পানিতে কোনো কাজে আসবে না।
“বাইসানগার অগ্রগামী একটা বাহিনী প্রস্তুত করো।” বাইসানগারের পরামর্শে বাবর নিজের পাঁচশ শ্ৰেষ্ঠ যোদ্ধা নির্বাচিত করে এবং তাদের পঞ্চাশজনের একেকটা দলে বিভক্ত করে প্রতিটা দলকে নেতৃত্ব দেবার জন্য আলাদা আলাদা দলনেতা রয়েছে। উজবেক হানাদারদের মোকাবেলা করার জন্য যথেষ্ট। বাকি সৈন্য আর রসদপত্র এখানেই মজুদ থাকবে অধিকতর সৈন্য মোতায়েন প্রয়োজন না হওয়া পর্যন্ত।
দশ মিনিট পরে, গুপ্তদূত আরেকটা নতুন ঘোড়ায় চড়ে, বাবরের পাশে অগ্রগামী দলটার সাথে ভেড়া চলাচলের একটা ঢালু পথ ধরে পাহাড়ের ভিতর দিয়ে নদীর দিকে এগিয়ে যায়। তাদের কপাল ভালো গত রাতে বৃষ্টি হয়েছে এবং মাটি ভেজা থাকায় আগুয়ান ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনবার জন্য কেউ কান খাড়া করে থাকলেও তার পক্ষেও শব্দ আলাদা করে সনাক্ত করা মুশকিল হবে। আরো খুশির খবর, গুপ্তদূত তাদের উজবেক অবস্থান থেকে কয়েকশ গজ সামনে একটা অশ্বক্ষুরাকৃতি বাঁকের কাছে নিয়ে চলেছে যেখানে অবস্থিত ঘন উইলো গাছের জঙ্গল তাদের উপস্থিতি গোপন রাখবে।
বাবর কাবুলের কামারশালায় তার জন্য বিশেষভাবে তৈরি ইস্পাতের বর্মের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখে। তার ইস্পাতের জালির তৈরি আলখাল্লা মাপমতোই হয়েছে আর কোমরে রয়েছে আলমগীর। সে প্রস্তুত। তার ভিতরে টগবগ করতে থাকা আবেগ কণ্ঠ চিরে বের হয়ে আসতে চায়। যদিও সে জানে সেটা অসম্ভব…অন্তত এখনও সময় হয়নি…
আরো দু’মাইল এগিয়ে যাবার পরে মেঠো পথটা প্রশস্ত হতে শুরু করে- বাবরের ছয়জন অশ্বারোহী সৈন্য এখন পাশাপাশি এগিয়ে যেতে পারছে-কিন্তু আশেপাশে। গাছপালার আড়াল কমে এসেছে। বাবরের ভ্রু কুঁচকে উঠে সে গুপ্তদূতের সাথে। আলাপ করে এবং হাত তুলে নিজের লোকদের থামবার নির্দেশ দেয় এবং সম্প্রতি তার পথসঙ্গীর দায়িত্বে নিয়োগ পাওয়া, তার কিশোর কচিকে ডেকে পাঠায়।
“দ্রুত বহরের শেষপ্রান্তে ঘোড়া নিয়ে যাও। আমার সেনাপতিদের বলবে তীর ধনুক প্রস্তুত রেখে যে কোনো মুহূর্তে রওয়ানার অবস্থায় যেনো নিজেদের অধীনস্ত লোকদের তৈরি রাখে, আর কেউ যেনো কোনো কথা না বলে। আমরা নদীর বাঁকে পৌঁছে যাত্রাবিরতি করবো। আর সেই সময়ে গুপ্তদূতেরা সামনের পরিস্থিতি জরিপ করে আসবে। তারা যদি খবর নিয়ে আসে যে উজবেকরা এখনও নদী অতিক্রম করেনি, আমরা তাহলে হামলা করবো। বুঝতে পেরেছো?” ছেলেটা দ্রুত মাথা নাড়ে এবং ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে যায়।
তারা পুনরায় যাত্রা শুরু করতে বাবরের বুক উত্তেজনায় ধকধক করতে থাকে। সে টের পায় অনুভূতি অপার্থিব ধরণের সজাগ হয়ে উঠছে- ঘাসের ডগায় মোচড়াতে থাকা এক শুয়া পোকার খোঁচা খোঁচা কালো লোম সে খেয়াল করে এবং বেগুনী-গোলাপী রঙের নধর বুকের এক বন্য কবুতর গাছের ডালে বিশ্রামরত অবস্থায় তাকিয়ে রয়েছে। ঘামের গন্ধ- তার নিজের এবং তার ঘোড়ার আর তার আশেপাশের লোকদের আর তাদের ঘোড়ার জীবনের তীব্র নির্যাসের ইঙ্গিতময় একটা মেঘের মতো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। মৃত্যুর সান্নিধ্য ছাড়া বোধহয় একজন মানুষ কখনও নিজেকে এতো বেশি জীবন্ত অনুভব করতে পারে না।
“সুলতান আপনি এখানে বিশ্রাম করেন আমি সেই ফাঁকে রেকী করে আসি।” গুপ্তদৃত বলে। আরো দু’শ গজ এগিয়ে যাবার পরে বুড়ো উইলো গাছের সুঠাম পালকের মতো শোভিত ডালের ফাঁক দিয়ে বাবর প্রথমবারের মতো পানির ঝলক দেখতে পায়।
“বেশ, তবে দ্রুত ফিরে আসবে।”
“হ্যাঁ, সুল-” কালো পালকের তৈরি একটা উজবেক তীর গুপ্তদূতের গালে বিদ্ধ হয় এবং আরেকটা তার কণ্ঠনালী বিদীর্ণ করলে বেচারা আর কিছু বলতে পারে না। তৃতীয় আরেকটা তীর নির্দোষ ভঙ্গিতে এসে মাটিতে আছড়ে পড়ে। বুদবুদের ন্যায় রক্ত বের হয়ে আসলে, লোকটার চোখ থেকে সব ভাব মুছে যায় এবং সে ঘোড়া থেকে উল্টে পড়ে কিন্তু তখনও একটা পা রেকাবে আটকে থাকে।
বাবরের চারপাশে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শোরগোল শুরু হতে, সে ঝুঁকে তার ঘোড়ার গলা আঁকড়ে ধরে। প্রতি মুহূর্তে শত্ৰু তীরের শীতল ফলা নিজের দেহে বিদ্ধ হবার শঙ্কা করে। বাম হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে, ডান হাতে পিঠের উপর থেকে ধাতব পাত দেয়া ঢালটা টেনে নিরাপত্তার জন্য মাথার উপরে ধরে। কিন্তু আর কোনো তীর বাতাস কেটে ভেসে আসে না। বাবর সতর্কতার সাথে মাথা তুলে তাকায়। তার বাম দিকে, দুলতে থাকা সোনালী উইলো গাছের মাঝেযেদিক থেকে তীর ছোঁড়া হয়েছে- সে তিনজন উজবেক অশ্বারোহীকে নদী যেখানে তীক্ষ্ণ একটা বাঁক নিয়েছে তীর বরাবর সেদিকে এগিয়ে যেতে দেখে।
অশ্বারোহী তিনজন সম্ভবত উজবেক গুপ্তদূত, আশেপাশে নজর রাখছে অন্যেরা যখন নদী অতিক্রম করতে ব্যস্ত। সে অশ্বারোহী তিনজনকে ছেড়ে দিতে পারে না। তাহলে তারা ফিরে গিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দেবে। ঘোড়ার পাঁজরে খোঁচা দিয়ে বাবর মাথা পেছনে নিয়ে চিৎকার করে আক্রমণের আদেশ দেয়।
