“আংশিক, কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা কি ঘটবে আমাদের ভাগ্যে।”
“তুমি কি ভীত?”
“আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আর সেটাও আমাকে ভাবিয়ে তুলছে…আপনি কি ভীত?”
বাবর এবার ভাবুক হয়ে পড়ে। “না, আমি ভীত নই। আমি উদ্বিগ্ন, কিন্তু দুটো এক জিনিস না। আমি চিন্তিত আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে। আমি যে পরিবেশে জন্ম নিয়েছি। আমার বাবা, তার বাবা যে পৃথিবীকে চিনতো- তা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফারগানার কর্তৃত্ব খোয়াবার পরের বছরগুলো, আমি মূলত ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়িয়েছি। এমনকি, এখানে আমি যদিও আবার সালতানাৎ ফিরে পেয়েছি। কিন্তু আমার সবকিছু, আমার সর্বস্ব একটা সুতোর উপরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি যদি সাইবানি খানকে পরাজিত করতে না পারি, তবে আমি এখন পর্যন্ত যা অর্জন করেছি সব নিরর্থক হয়ে পড়বে এবং যা কিছু আমি আগলে রাখতে চাই সেসব কিছুই লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে…”
“আপনি ভীত যে কেউ আপনাকে মনে রাখবে না?”
“না, ব্যাপারটা তারচেয়েও ব্যাপক। আমি উদ্বিগ্ন যে আমি হয়তো মানুষের স্মৃতিতে থাকবার যোগ্য নই…”
অন্ধকার আর গাঢ় হতে বাবর বাবুরীর মুখ দেখতে পায় না। কিন্তু অনুভব করে সে আলতো করে তার কাধ স্পর্শ করেছে। একটা বিরল আচরণ যা তার মস্তিষ্কে সিন্দাবাদের দানোর মতো চেপে বসা বোঝাটা হাল্কা করে দেয়। বাবুরী তাকে যেন বলতে চায় আসন্ন লড়াইয়ে সে নিজেকে একলা পাবে না…
*
বাবর মুখ থেকে ঘাম মুছে এবং রেকাব থেকে পা দুটো বের করে টান টান করে। আজ নিয়ে ছয়দিন তারা টানা ঘোড়ার পিঠে রয়েছে। সাথে যুদ্ধ উপকরণ বহনকারী ভারবাহী পশুর বহরের কারণে তাদের অগ্রসর হবার গতি বেশ শ্লথ ছিলো। শীঘ্রই অবশ্য তারা শিবারতু গিরিপথে প্রবেশ করবে, যা তাদের পাহাড়ের মাঝ দিয়ে। পশ্চিমে খোরাসানের দিকে নিয়ে যাবে। গিরিপথ একবার অতিক্রম করলে তারা যে অঞ্চলে প্রবেশ করবে, সেখানে উজবেক হানাদার বাহিনীর সাথে তাদের সংঘর্ষ, হবার সম্ভাবনা রয়েছে…কিন্তু তাকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। সাইবানি খানের সাথে সম্মুখ সমরে তার জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। নিজের বাহিনীকে প্রথমে আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান করে তুলতে হবে এবং তার বয়ঃসন্ধিক্ষণে পাহাড় থেকে আকস্মিক নেমে এসে ঝটিকা আক্রমণের রণনীতি সাফল্যের সাথে ব্যবহার করে তাকে নতুন নতুন মিত্রের সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে হবে। সে শত্রুবাহিনীর উপরে আচমকা আক্রমণ চালিয়ে তাদের বিপর্যস্ত করে। তারা সংঘটিত হয়ে প্রত্যাক্রমণ করার আগে নিজের বাহিনী নিয়ে পালিয়ে আসবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত দূর্গ দখল করে এবং সেখানে প্রাপ্ত মালামাল আর অস্ত্রশস্ত্র উপঢৌকন হিসাবে ব্যবহার করে অন্যদের বিশ্বস্ততা অর্জন করবে। যতক্ষণ না সে ধীরে ধীরে সাইবানি খানের বিশাল বাহিনীর মোকাবেলা করার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠে।
নিজের ধূসর ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে বাবর থামবার আদেশ দেয়। ঢালু পাহাড়ের পাদদেশে তৃণভূমিতে আজ রাতের মতো তারা যাত্রা বিরতি করবে, পাহাড়ের কারণে সেদিক থেকে আচমকা আক্রমণের কোনো সম্ভাবনা নেই। সে ঘোড়া থেকে নেমে তার যুদ্ধ মন্ত্রকের সভা আহ্বান করে। সভায় আগমনকারী সবাই সমবেত হলে সেটা বিচিত্র একটা সমাবেশে পরিণত হয়-বাইসানগারের ন্যায় পোড়খাওয়া সেনাপতির পাশে এমন অনেক ভেড়ার চামড়ার আচকান পরিহিত উপজাতি সর্দার এসে আসন গ্রহণ করে। যারা কেবল একটা কি দুটো মাটির তৈরি বসতির উপরে কর্তৃত্ব করে থাকে। তার বাহিনীর লোকবল দশ হাজারের চেয়ে কম হওয়ায় সে চায়। তার প্রতিটা লোক যেনো স্বেচ্ছায় তার সাথে এই অভিযানে অংশ নেয়। উচ্ছল উপজাতির সদস্যরাও যেনো বাদ না যায়। আর সে চায় তারা সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যেনো তার উপরে আস্থা রাখতে পারে।
“আর কয়েকদিন, আমরা গিরিপথ অতিক্রম করবো। ভাগ্য ভাল হলে, উজবেক বদমাশগুলো আমাদের উপস্থিতি টের পাবে না। আমরা সেটার উপরেই ভরসা করে আছি। তারা ভাবতে থাকুক কসাইয়ের খোঁয়াড়ে বাঁধা ভেড়ার মত আমরা কাবুলে অসহায়ভাবে তাদের জন্য অপেক্ষা করছি। আমার গুপ্তদূতের দল আর গুপ্তচরেররা আরও তথ্য উপস্থাপন না করা পর্যন্ত হিরাতের দিকে এগিয়ে যাওয়াটা উচিত হবে না। কিন্তু ভুললে চলবে না আমরা পাহাড়ের লড়াকু যোদ্ধার দল, নেকড়ের মতো ধূর্ত যারা হরিণের পালের দিকে অন্ধের মতো ধেয়ে যায় না। আত্মগোপন করে অপেক্ষা করতে থাকে, জানে সে যদি ধৈর্য ধরে তাহলে পালের কমজোরী একটাকে থাবার ভিতরে পেয়ে রক্তের স্বাদ পাবে…আমাদেরও নেকড়ের মতো হতে হবে। তোমরাও তাই নিজেদের লোকদের অস্ত্রে শান দিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলো।”
ঘন ঘন মাথা নাড়া আর উৎসুক দৃষ্টি বিনিময় দেখে সে বুঝতে পারে তার কথা জায়গা মতো পৌঁছেছে। “আর পবিত্র কোরানের বাণী মনে রাখবে: ‘আল্লাহতালা সদয় হলে, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বাহিনীর পক্ষেও বিশাল শক্তিকে পরাস্ত করা সম্ভব।”
*
“সুলতান, প্রায় চারশো উজবেকের একটা দল, এখান থেকে তিন কি চার মাইল দূরে একটা নদীর অপর পাড়ে রয়েছে। দূর থেকে দেখে মনে হয়েছে তারা নদী পার হবে। সেজন্য তাদের ঘোড়া আর মালবাহী গাধার পিঠে মালপত্র সমানভাবে বিন্যস্ত করেছে তাদের এপারে সাঁতরে নিয়ে আসবে বলে…আমরা যদি দ্রুত এগিয়ে যাই তবে নদী অতিক্রম করার মাঝে আমরা তাদের আক্রমণ করতে পারি…” খবর নিয়ে আসা গুপ্তদূত ভীষণভাবে হাঁপাতে থাকে এবং তার খোঁজা করা বাদামী রঙের ঘোড়াটার দেহ ঘামে ভিজে জবজব করছে।
